বাংলাদেশের ঢাকায় যেমন আরমানিটোলা আছে, তেমনই আর্মেনিয়াতে আছে বাংলাদেশ! রাজধানী ইয়েরভানের একটি জেলার নাম ‘বাংলাদেশ’! কাগজে কলমে জায়গাটির নাম ‘মালাতিয়া সেবাস্তিয়া’ হলেও স্থানীয় লোকে জায়গাটিকে ডাকে বাংলাদেশ নামে!

বিশ্ব মানচিত্রে আর্মেনিয়াকে খুঁজে পেতে হয়ত কিছুটা সময় লাগবে। সেভাবে হয়ত পরিচিতও নয় এই দেশটি, তবে বাংলাদেশের সাথে আর্মেনিয়ার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে৷ একটা সময় আর্মেনিয়ানরা প্রচুর পরিমাণে বাংলাদেশে এসেছিলেন, ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে, ধর্ম প্রচারের কাজে। পারস্যের সাফাভি শাসকরা ষোড়শ শতকে পূর্ব ইউরোপের পাহাড়ি দেশ আরমানিয়া দখল করবে, এমন প্রেক্ষাপটে আর্মেনিয়ানরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়। 

বাংলাদেশেও মোঘল আমলের সময়টাতে আর্মেনিয়ানরা আসেন, তারা অল্পদিনেই বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। যারা নিজেরা শ্রেণীবদ্ধ হয়ে যে জায়গাটায় থাকতেন সেই জায়গার নামই হয়ে যায় আরমানিটোলা। সুতরাং, আর্মেনিয়ানরা বাংলাদেশিদের জন্য খুব বেশি অপরিচিত নয় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, তবে বর্তমান আধুনিক আর্মেনিয়া কিছুটা অপরিচিতই বটে। আর্মেনিয়াকে বলা হয়, ‘Land of Free Water’ বা মুক্ত জলের দেশ।

আপনি আর্মেনিয়ার পথে ঘাটে হাঁটতে হাঁটতে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। জলের ফোয়ারার মতো দেখতে মুক্ত পানির অসংখ্য কল দেখা যাবে আর্মেনিয়াতে। কোনো ফোয়ারা যদি খেয়াল করে থাকেন সেখানে দেখে থাকবেন পানি গুলো উপরে ছড়িয়ে যাচ্ছে, এই পানি গুলোই রিসাইকেল হয়ে আবার ফোয়ারার ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে যায় উপরে। আর্মেনিয়ানরা এই সাধারণ ট্রিক কাজে লাগিয়ে পুরো দেশের পানির ব্যবস্থাকেই পাল্টে দিয়েছে। আর্মেনিয়ার এই জল অত্যন্ত সুপেয় এবং মিষ্টি। যে দেশটিতে একসময় পানির সংকট হতে যাচ্ছিলো, এখন সেখানেই চারদিকে মুক্ত জলের ফোয়ারা। যে যার খুশি মতো সেখানে মুখ লাগিয়ে পানি পান করছে। 

আর্মেনিয়ার মুক্ত জলের ফোয়ারা

দৃশ্যটা দেখে প্রথমে অদ্ভুত মনে হলেও পরে ঠিকই আপনি তাদের বুদ্ধির প্রশংসাই করবেন। এই পদ্ধতির কারণে কোথাও কোনো পানির অপচয় নেই। পথে ঘাটে প্লাস্টিকের বোতল চোখে পড়বে না। বোতল বন্দী পানির যে দৃশ্য দেখে আপনি অভ্যস্থ আর্মেনিয়া আপনার সেই ধারণা একেবারে বদলে দেবে৷ 

আর্মেনিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি। পুরুষের চেয়ে নারী বেশি এরকম দেশের তালিকায় আর্মেনিয়ার অবস্থান সপ্তম। ৪৪০০০ হাজার আমেরিকান পুরুষ আর্মেনিয়ান নারীদের পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আবেদনময়ী নারী হিসেবে ভোট দিয়েছে। তাই যারা নিঃসঙ্গতায় ভুগেন তারা কিছুদিন আর্মেনিয়ায় গিয়ে সঙ্গী খোঁজার চেষ্টা নিতে পারেন। অবশ্য আর্মেনিয়ান কন্যাদের আত্মসম্মানবোধ প্রবল এবং তারা সবসময়ই কোনো না কোনো কাজের ভেতর ডুবে থাকেন।

আর্মেনিয়ার স্কুলগুলোতে গিয়ে আরো মজার ব্যাপার দেখা যায়। ছেলেমেয়েরা বসে বসে দাবা খেলছে। প্রত্যেক স্কুলেই একই ব্যাপার৷ আসলে দাবা খেলাকে স্কুলে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে আর্মেনিয়াতে, এমনকি দাবা খেলার উপরে পরীক্ষাও নেয়া হয়। আর্মেনিয়ানরা মনে করে দাবা খেলা একজন ছাত্রকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান হিসেবে গড়ে তুলবে। এছাড়া গান, নাচ, আর্ট এই বিষয়গুলোও আর্মেনিয়ার স্কুলগুলো একদম ফ্রি শেখানো হয়। 

আর্মেনিয়ানরা পৃথিবীর প্রথম জাতি যারা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। খ্রিস্টানদের সবচেয়ে প্রাচীন চার্চের অবস্থানও আর্মেনিয়াতে! আপনি যদি বিশ্বভ্রমণে বের হন আর্মেনিয়া আপনার জন্য খুব ভালো জায়গা হতে পারে। কারণ, আর্মেনিয়ানরা ট্যুরিস্টদের সাথে স্থানীয়দের পার্থক্য করে না। সব পর্যটন স্পটেই টিকেটের দাম থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচ সবার জন্যেই সমান। আর আর্মেনিয়ান চার্চগুলোকে উন্মুক্তই রাখা হয় ট্যুরিস্টদের জন্যে, কোনো এন্ট্রি ফ্রি ছাড়াই!

ট্যুরিস্টদের জন্য স্বর্গ বলা যায় আর্মেনিয়াকে

আর্মেনিয়া একটি অতি পুরানো সভ্যতা এমনকি রোম থেকেও! তাদের বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। বিভিন্ন জাতিস্বত্তার যেমন মেলবন্ধন হয়েছে আর্মেনিয়াতে, তেমনি তারাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। আর্মেনিয়ানরা প্রতি রাতেই টাউনের মেইন স্কয়ারে নেমে আসে কৃত্তিম পানির ফোয়ারার সামনে, আলোকজ্জল পানির ছন্দময় ফোয়ারার সামনে শহরের লোকেরা আনন্দময় সময় কাটায়। এ যেনো একটা একান্নবর্তী শহর! 

বাংলাদেশের সাথে আর্মেনিয়ার যে একটি ঐতিহাসিক যোগাযোগ আছে সেটির চিহ্ন শুধু বাংলাদেশে নয়, আর্মেনিয়াতেও আছে। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরভান। এই রাজধানীরই একটি জেলার নাম ‘বাংলাদেশ’! কাগজে কলমে জায়গাটির নাম ‘মালাতিয়া সেবাস্তিয়া’ হলেও স্থানীয় লোকে জায়গাটিকে বলছে বাংলাদেশ। গাড়ির ড্রাইভার থেকে পুলিশ সবাই জায়গাটিকে বলছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ নামকরণের সঠিক কারণ নিয়ে কয়েকটি মত আছে। কেউ বলে থাকেন, অষ্টাদশ শতকে যারা বাণিজ্যের কাজে বাংলাদেশ থেকে আর্মেনিয়াতে যাতায়াত করত তারাই এই নামটি রেখেছে৷ আরেকটি মত হল, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিপীড়িত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই জায়গার নাম বাংলাদেশ নামকরণ করা হয়েছিল।

সব মিলিয়ে আর্মেনিয়া দেশটি আসলে এক কৌতুহলের বিষয়, সময়ের সাথে সাথে একে যত জানবেন, তত মুগ্ধতা বেড়ে যাবে।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা