তিনজন মানুষের বিনিয়োগে গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। একজন যাত্রা শুরুর বারোদিনের মধ্যেই সরে দাঁড়ান। বাকি দুইজন শক্ত করে হাল ধরেন। সেই প্রতিষ্ঠানটিই আজ বিশ্বের সবচেয়ে দামী প্রতিষ্ঠান!

প্রযুক্তি নিয়ে যাদের অল্প হলেও মাতামাতি আছে, তাদের কেন যেন আধখাওয়া আপেলের ছবিওয়ালা ব্রান্ডের পন্য বেশি পছন্দ। উত্থানের পর থেকেই যারা দেখাচ্ছে একের পর এক টুইস্ট। যাদের জয়রথ চলছে অনেকদিন আগে থেকেই। মহামারির মধ্যে সবার ব্যবসায় ক্রমশ ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিলেও তারা আছেন বহাল তবিয়তে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই 'অ্যাপল কর্পোরেশন ইঙ্ক' যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সারা পৃথিবীতেই ব্যাপক ব্যবসা করে যাচ্ছে। খুব শীঘ্রই বিশ্বের প্রথম দুই লাখ কোটি ডলারের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার মাইলফলকও ছুঁতে চলেছে এই অ্যাপল। এখানে উল্লেখ্য, দুই বছর আগেই কোম্পানিটি অর্জন করেছিল বিশ্বের প্রথম এক লাখ কোটি ডলারের কোম্পানি হওয়ার বিরল রেকর্ড! 

অ্যাপলের এই অর্জনের গল্পে স্মরণ করতে হবে প্রথমদিকের কিছু মানুষের কথা। যাদের হাত ধরেই অ্যাপলের যাত্রা শুরু।  প্রথমেই আসবে স্টিভ জবসের কথা। অ্যাপল এবং স্টিভ জবস'কে হরিহর আত্মাই ধরা যায়! তবে যারা অ্যাপলের শুরুর দিকে গল্প জানেন, তারা নিশ্চয়ই খুব ভালো করেই জেনে থাকবেন- স্টিভ জবস শুধু একা না। তাঁর সাথে স্টিভ ওজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়েন- এই তিনজন একত্রিত হয়ে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্টিভ জবসের বাড়ির গ্যারেজে শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামী প্রতিষ্ঠানের যাত্রা। তবে যাত্রা শুরুর বারো দিনের মধ্যেই অ্যাপল ছাড়েন রোনাল্ড ওয়েন। যাকে ধরা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগাদের একজন। তিনি ভেবেছিলেন, এই কোম্পানির ভবিষ্যৎ নেই । তাই নিজের শেয়ারটুকু জবস এবং ওজনিয়াক কে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি মাত্র তেইশশো ডলার নিয়ে চলে গিয়েছিলেন অ্যাপল ছেড়ে।

অ্যাপল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন স্টিভ জবসও। এমনিতেই রগচটা মানুষ তিনি, হুট করে একবার কী হলো, কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরদের সাথে রাগারাগি করে বের হয়ে গেলেন অ্যাপল ছেড়ে এবং পরবর্তীতে নেক্সট কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করলেন।  স্টিভ জবস ছাড়া অ্যাপল যে খুবই অচল, এটা বোঝা গেলো জবসের চলে যাওয়ার পরেই। অ্যাপলের ব্যবসা পড়ে গেলো মারাত্মকভাবে। শুধুমাত্র স্টিভ জবসকে ফিরে পাওয়ার জন্যেই অ্যাপল কম্পিউটার কিনে নিলো নেক্সট কম্পিউটারকে। ঘরের ছেলে হয়ে ঘরে ফিরলেন স্টিভ জবসও। এবং ফিরে এসেই হরেক রকম সব পণ্যের আইডিয়া বাস্তবায়ন করতে থাকলেন তিনি। 

অ্যাপলের বাজার তখন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। স্টিভ জবস অ্যাপলের আগের কারিশমা ফিরিয়ে আনার জন্যে কিছু প্রক্রিয়া হাতে নিলেন। অ্যাপলের নিজস্ব রিটেল স্টোর খোলা হলো, অনেকগুলো সফটওয়্যার কোম্পানিকে কিনে ফেলা হলো, কম্পিউটারের  হার্ডওয়্যারেও পরিবর্তন আনা হলো। এই কাজগুলো বেশ গেম চেঞ্জিং হিসেবে কাজ করলো।  মানুষ আবারও পছন্দ করা শুরু করলো অ্যাপল'কে। ২০০৭ এর জানুয়ারিতে এসে জবস জানালেন- অ্যাপল কম্পিউটার ইনকর্পোরেটেড নাম পাল্টাচ্ছে। নতুন নাম - অ্যাপল ইনকর্পোরেটেড। সে সাথে ঘোষণা দিলেন এমন একটি প্রোডাক্টের যা এখনও বুঁদ করে রেখেছে সারা প্রথিবীর প্রযুক্তিপ্রিয় অজস্র মানুষকে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, আইফোনের ঘোষণা দিলেন তিনি। এবং বাকিটা ইতিহাস। আইফোন বাজারে আসার পর থেকে আর অ্যাপলকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়না। হু হু করে বাড়তে থাকে বিক্রি। অ্যাপলের 'হল অব ফেম' এ উঠে যান জবস। মৃত্যুর দুই মাস আগে শারিরীক অসুস্থতার জন্যে অ্যাপল ছাড়েন স্টিভ জবস। এর আগের পুরোটা সময় অ্যাপলের সাথেই ছিলেন তিনি। 

যদি শুধু স্টিভ জবসের কথা বলে এ লেখা শেষ করি, তাহলে সেটা ঠিক হবেনা। দ্বিতীয় যে মানুষটির কথা বলতে হবে, তিনি স্টিভ ওজনিয়াক। যিনি ছিলেন অ্যাপলের আরেকজন একনিষ্ঠ কর্মী। মূলত দুই 'স্টিভ' বন্ধু  মিলেই গতিশীলতা এনে দেয় এই কোম্পানিকে। অ্যাপলের প্রথম পন্য, অ্যাপল-১ নামের কম্পিউটার তৈরী করেছিলেন স্টিভ ওজনিয়াক। সেটার প্রোগ্রামিংও তৈরী করেছিলেন তিনি। এছাড়াও আরো কিছু অ্যাপল প্রোডাক্টের আইডিয়াও তাঁর। ১৯৮১ সালে মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনায় স্মৃতিশক্তি হারান ওজনিয়াক।এরপর ১৯৮৭ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপল ছেড়ে দেন।

স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াকের রয়েছে তীব্র ভূমিকা অ্যাপলের সাফল্যের পেছনে। সেটা একবাক্যে স্বীকারও করেন সবাই। এই দুই মানুষের সযত্নে লালিত এ প্রতিষ্ঠানই আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে টেক জায়ান্টদের লিডার।

অ্যাপল কেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী,  এমন প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই যেটা বলার- এরা  বরাবরই নজর দিয়েছে প্রোডাক্টের স্ট্যাবিলিটির দিকে। দেখতে চমকদার কিন্তু কাজ হবেনা, এরকম পন্য তারা কখনোই বানাননি। এবং ভাবলে অবাক লাগে, কতকিছুই না বানিয়েছেন তারা। হার্ডওয়্যারের মধ্যে আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাকবুক, আইপড, অ্যাপল ওয়াচ , অ্যাপল টিভি তো রয়েছেই। সফটওয়্যারের মধ্যে রয়েছে ম্যাক ওএস এবং আইওএস অপারেটিং সিস্টেম, আইটিউন্স মিডিয়া প্লেয়ার, সাফারি ওয়েব ব্রাউজার, এবং আইলাইফ ও আইওয়ার্ক, ফাইনাল কাট প্রো, লজিক প্রো, এবং এক্সকোড। এত এত সব প্রোডাক্ট তাদের, কিন্ত কোনো প্রোডাক্ট এরকম নেই যা ক্রেতাদের অখুশি করেছে। এসব কারণ মিলিয়েই এত বছর ধরে সাফল্যের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। আশা করা যায়, সামনেও তাদের এই ঈর্ষণীয় অবস্থান বজায় থাকবে। মাত্র তো তারা দুই লাখ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠান। সামনে আরো অনেকটা দূর যাওয়ার বাকি তাদের।

পরিস্থিতিও সেটাই বলে! 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা