“খিদের কাছে সব পরাজিত হয়। সবার আগে পরাজিত হয় স্বাদ-রুচি, তারপর যুক্তি-বুদ্ধি, সভ্যতা, মানবিকতা।”

ওপরের কথাটি একটি বাংলাদেশি থ্রিলার বই থেকে নিয়েছি। বইটি সম্পর্কে বলবো, তবে তার আগে একটি ঘটনা বলবো। যে ঘটনায় খিদের কাছে পরাজিত হয়েছে জাগতিক সব মানবিকতা।

আন্দিজ পর্বতমালা, একে বলা হয় পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরে বলিভিয়া থেকে চিলির দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগর সমুদ্রতট সমান্তরালে অবস্থিত এই পর্বতমালা। শুভ্র বরফে ঢাকা সুবিশাল পর্বতেরা যেন সারি সারি করে দাঁড়িয়ে আছে এখানে।

১৯৪৭ এর এক দিনে পর্বতের আকাশে উড়ে যাচ্ছিলো ব্রিটিশ সাউথ এমেরিকান এয়ারওয়েজের এক বিমান। ১১ জন যাত্রী নিয়ে সেই বিমানটি নিখোঁজ হয়ে যায়। এই বিমানটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেও। কীভাবে বিধ্বস্ত হয় কিংবা কী করে দূর্ঘটনা ঘটে অথবা যাত্রীদের কী পরিণতি, তা জানা যায় না। তবে ১৯৯৮ সালে দুইজন আর্জেন্টাইন পর্বতারোহী ইঞ্জিনের ধ্বংসাবশেষ পান, ধারণা করা হয় এটি এই বিমানেরই ইঞ্জিন ছিল। এই একই পথে আরো বেশ কটি বিমান নিখোঁজ এবং দূর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন হয়েছিল যে ঘটনা নিয়ে তা ১৯৭২ সালের। যে ঘটনা নিয়ে লেখা হয়েছিলো মুভি, ডকুমেন্টারি, লেখা হয়েছিল বইপত্র।

সে বিমানের নাম “ফেয়ারচাইল্ড এফএইচ-২২৭ডি”

ফ্লাইট নাম্বার ৫৭১। উরুগুইয়ান এয়ারফোর্সের এই বিমানটি বেশ কিছু যাত্রী ও ক্রু নিয়ে অন্যান্য দিনের মতো রওনা হলো। দিনটি ছিল ১৩ই অক্টোবর। লোকে বলে ১৩ নাকি আনলাকি সংখ্যা! কে জানে! কিন্তু এটা তো জানা কথা যে, বিপদের কোনো বাপ-মা নেই। নাহলে কে জানতো যে একটু পর নেমে আসবে অকল্পনীয় এক মুহুর্ত। ঝিরঝির করে তুষার পড়ছে আন্দিজে। আবহাওয়া এতটা খারাপ নয়। পাখির মতো ভেসে বেড়াচ্ছে উড়োজাহাজ। গন্তব্য চিলি।

হঠাৎ কি যেন হলো। তুমুল কাঁপুনি। কিছুক্ষণ আগেও তো এমন আবহাওয়া ছিলো না। এখন তো রীতিমতো তুষারঝড়। যাত্রীরা ভয়ে চিৎকার শুরু করছেন, কেউ কেউ বিকট আর্তনাদ। সবাই বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা হতে যাচ্ছে। ভয়ে সবাই কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন। বিমান আর তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলো না। হাওয়ায় বরফে মাখামাখি হয়ে আকুলি বিকুলি হয়ে পাক খেতে খেতে ধুম করে আঁচড়ে পড়লো পাহাড়ের মধ্যে। পাহাড়ে এখানে সেখানে ধাক্কা খেতে খেতে বিমান যখন শান্ত হলো তখন অনেক কিছুই আর আগের মতো থাকলো না। শান্ত হয়ে গেলো মানুষগুলোর দেহ, আঁচড়ে পড়লো বিমানভর্তি কিছুক্ষণ আগেও তাজা থাকা জীবনগুলো।

বিধ্বস্ত হবার পরে বিমানের অবস্থা

বিমান বিধ্বস্ত হবার পরের মুহূর্ত 

চারিদিকে শুধু থেঁতলে যাওয়া লাশের ভিড়। তাদের লাশ এর এমনই অবস্থা যে বেঁচে থাকতে কার কি পদবি ছিলো তা এই মুহুর্তে সনাক্ত করা সম্ভব নয়। কে কতটা সুন্দর তা নিয়েও কথা বলার অবস্থা নেই। দেখে মনে হয়, এই শান্ত থেতলে যাওয়া মাংস সরে যাওয়া বিকৃত লাশগুলো মেনে নিয়েছে সবকিছু। এই মহাকালের যাত্রায় নিয়ে যাওয়া বিমানের উপর তাদের কোনো ক্ষোভ নেই। কিন্তু ক্ষোভ আছে জীবিতদের। হ্যাঁ, এত ভয়ংকর ঘটনায় কেউ বেঁচে থাকবে সে আশা করা ঠিক নয়। তবে, তারা বোধহয় বেঁচে গিয়েছিলেন মৃত্যু দেখার গল্প করবেন বলে। কাটা ধানের মতো কতগুলি মানবশরীর পড়ে আছে বিমানের আশেপাশে। ওরা মরেনি তখনও। বেঁচে আছে। বেঁচে আছে বলেই হয়তো তারা বেশি আতঙ্কিত। কারণ, এই তীব্র বরফ ঠান্ডায় কতক্ষণ বাঁচা সম্ভব হবে তারা জানে না।

বিমানের বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী

পেদ্রো। তারও একই অবস্থা। সে এই বিমানের যাত্রী। বেচারা তাকিয়ে দেখতে পেলো তার পাশের যাত্রীটা ততক্ষণে মৃত। সে কোনোভাবে রক্ত ভেজা লাশগুলোকে সরিয়ে প্লেনের ভাঙা দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়েছে। সঙ্গে তারই আরও কয়েকজন সৌভাগ্যবান অথবা দূর্ভাগা যাত্রী। কারণ, শেষ পর্যন্ত অনেকেই টিকে থাকতে পারবে না। আশংকাজনক অবস্থায় ঝুলে আছে তারা মৃত্যু এবং জীবনের মধ্যিখানে! এখন কী হবে? এই মুহুর্তে দরকার এই বরফ শীতল জায়গা থেকে নিরাপদ জায়গায় যাওয়া। কিন্তু উদ্ধারটা করবে কে? 

হঠাৎই একজন আশার মশাল জ্বালালেন। বললেন, “চিন্তা নেই বন্ধুরা। এতক্ষণে ক্র্যাশের খবর নিশ্চিত চিলি পৌঁছাইছে। সেখান থেকে রেসকিউ টিম নিশ্চয়ই আসবে!” কিন্তু রেসকিউ টিম কোথায়? কোথাও কেউ নেই। কয়েক দিন কেটে গেলো। কারো কোনো নাম গন্ধ নেই। তুষারঝড়ের তীব্রতায় বেঁচে থাকাদের মধ্যে কয়েকজন মরে গেলো। যারা বেঁচে আছে তারা নিজ চোখে দেখছে কীভাবে পাশের মানুষটা মরে যাচ্ছে। এদিকে ঠান্ডা হাওয়ার তেজ খুবই বেড়ে গেছে। কাটা কাটা হাওয়া যেন করাতের মতো আঘাত করে চলেছে শরীরটাকে। তবু আশা ছাড়তে চাচ্ছে না কেউ। বাঁচতে হবেই! এই ঠান্ডাকে হার না মানাতে পারলে যে মৃত্যু নিশ্চিত।

তারপর মৃত্যুর বিরুদ্ধে যেভাবে মৃত্যু দিয়ে লড়াই 

কমছে মজুত খাদ্য আর জল। কী হবে এবার? ঠান্ডা না মারুক, ক্ষিদে ঠিক মারবেই মারবে। ভাংগা বিমানের ভেতরে থাকা খাবারের শেষ টুকরাটাও শেষ। আর কোনো খাবার নেই। ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন চলে গেলো। কোনো রেসকিউ টিমেরও খবর নেই। এই অবস্থায় খাবার ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। কিন্তু খাবার তো নেই। আশে পাশে শুধু মরে থাকা নিথর কয়েকটা লাশ। তারা নিজেরা যুক্তিতর্ক করলেন। কি খাবার খাওয়া যায়! একজন বললো, আমরা লাশ থেকে মাংস নিয়ে খেতে পারি। বাকি সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলো তার দিকে।

বরফের বুকে চলছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম

কিন্তু একটা পর্যায়ে আর পারা গেলো না। কারণ, তাদের মধ্যে মৃত্যু ভয় তীব্রভাবে ঝাঁকিয়ে বসলো। সব সংস্কার বাদ দিয়ে তারা শেষ পর্যন্ত লাশ থেকে মাংস কেটে খেলেন। প্রথমটায় বমি করে ফেলেছিল বেশিরভাগই। তারপর ক্ষিদের চোটে পাগলের মতো মানুষের মাংস খাওয়া শুরু করেছিল সবাই। পেদ্রোর ভাগ্যে জুটেছিল এক মৃত বন্ধুর কাটা হাত আর থাই। কামড়ে কামড়ে খাচ্ছিল সে। মানুষের দাঁত কি মানুষের মাংস খেতে পারে? কিন্তু সেদিন পেরেছিল ওরা। বাঁচার তাগিদে সেদিন যেন মৃত্যু থেকে বাঁচতে মৃত্যু দিয়েই তারা লড়াই করেছিলেন।

অবশেষে ৮ ডিসেম্বর!

বাহাত্তর দিন! পাক্কা ৭২ দিন পরে অবশেষে উদ্ধারকারী একটি দল আসে। তারা এসে জীবিত পায় ১৬ জনকে। এই ১৬ জন যে এত দিন ওই পাহাড় বরফ হিমাংকের নিচে জীবিত ছিলেন, এটাই তো অলৌকিক ব্যাপার!

ইনটু দ্য মাউনটেইন 

ঘটনার ২৫ বছর পেদ্রো এই ঘটনার উপর একটা বই লিখেছিলেন। ‘ইনটু দ্য মাউনটেইন’- নামের এই বইয়ে তিনি লোমহর্ষক ঘটনার বর্ননা লিখেন। লিখেছেন, “আজও যখন সেই দিনটার দিকে ফিরে তাকাই মনে হয়, যদি ওই কাজটা না করতাম সেদিন, তাহলে বোধহয় আজকের দিনটা দেখতে পেতাম না।” কি আশ্বর্য না? পেদ্রোর বন্ধুর মৃত লাশের টুকরা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলো ওই সময়ে।

যিশুর শরীর ভেবে 

পেদ্রো বলেন, “সেদিন কেউ এটা ভাবেনি যে তারা মানুষের মাংস খাচ্ছে। সবার মনে হয়েছিল তাদের বন্ধুরা মরে গিয়েও তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। মাথার উপর কালো মেঘ। অঝোরে হতে থাকা তুষারপাত আর মাইনাস সেন্টিগ্রেডের মাঝে বেঁচে থাকাটাই সে সময় শেষ কথা ছিল। তাই তো মৃতদের শরীরকে স্বয়ং যিশুর শরীর ভেবে তারা গ্রহণ করছিল সেদিন।”

বিধ্বস্ত বিমান, পাশে বেঁচে থাকা যাত্রীরা

রবার্ত কানেসা, আরেক বেঁচে যাওয়া যাত্রী 

উরুগুয়ের মন্টেভিডিও মেডিকেল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রবার্ত। সেই বিমান দূর্ঘটনায় ছিলেন তিনিও। এত বছর পর এসে তিনিও কনফেস করলেন সেই সময়কার ঘটনা। পেশায় চিকিৎসক রবার্তের সেই অভিজ্ঞতাও বই হিসেবে উঠে এসেছে পাঠকের হাতে। বইয়ের নাম ‘আই হ্যাড টু রেসকিউ- হাউ প্লেন ক্রাশ ইন দি আন্দিজ ইন্সপায়ার্ড মাই কলিং টু সেভ লাইফ’। রাগবি খেলার জন্য চিলি যাচ্ছিলেন রবার্ত। সঙ্গে বন্ধুবান্ধব নিয়ে গান-গল্প, হইহুল্লোড় করে ভালোই সময় কাটছিল তার। কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা হতে যাচ্ছে, টের পেল রবার্ত, “বুঝতে পারছিলাম আমরা আকাশ থেকে অনেকটা নিচে দিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হলো, বিমানের ডানা দুটো যেন বরফে ঢাকা আন্দিজের চূড়ার খুব কাছে।” দূর্ঘটনার পর রবার্ত বুঝতে পারছিলেন না তিনি কি আদৌ বেঁচে আছেন কিনা। সহযাত্রীদের কান্না আর আর্তনাদে আশপাশের বাতাস ভারী। বিমানের অধিকাংশ অংশই ভেঙে পড়েছে। বরফে সাদা পাহাড়ের অংশ দিব্যি দেখা যাচ্ছে আশপাশে। হিম শীতল হাওয়া এসে ধাক্কা দিচ্ছে। বাইরে তখন তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রির নিচে। রাত বাড়ছে। তিনি লিখেন, “ওই মুহূর্তটায় প্রথম বুঝলাম, বেঁচে থাকার তীব্র টান আসলে কাকে বলে। যেন ওই রাতটাই আমাদের জীবনের শেষ রাত। দুঃস্বপ্নের ভেতর যেন জেগে রয়েছি বাস্তবটাকে জানব বলে।” দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেছে, কেউ গুরুতর আহত, কেউ কোমায়। খুব সামান্য কিছু খাবার ভাগ করে নিয়েছিলেন ওই বেঁচে থাকা ২৭ জন সহযাত্রী। কিন্তু খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। রবার্তের ভাষায়, “মনে হচ্ছিল আমরা যেন অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী। তখন একটাই উদ্দেশ্য, যে কোনোভাবে বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের খাবার ততদিনে প্রায় শূন্য।” কোনোমতে বেঁচে থাকার জন্যে রবার্তও খেয়েছিলেন মৃত গলিত লাশের মাংস। টুকরা করে কেটে ধাতব পাতে রেখে কোনোমতে মাংসগুলোকে ঝলসিয়ে খেয়েছিলেন তারা সবাই। রবার্ত বলেন, “সে সময় এমন কাজ করেছি, যা হয়তো মানুষের পক্ষে দুঃসহ।”

অন্ধকার দিক 

মৃতদের মাঝে সবাই প্লেন ক্র্যাশেই মারা যায়নি। তীব্র ঠান্ডা ও খাদ্যাভাবেও মারা যায় অনেকে। এমনকি কথিত আছে, বেঁচে থাকার জন্যে সেখানে খুনের ঘটনাও ঘটেছিলো। কারণ, লাশ খাবার কারণে, সবাই সবাইকে সন্দেহ করতে থাকে। খাদ্যের অভাবে এমন অবস্থা হয়েছিলো যে কেউ কেউ নাকি নতুন মৃতদেহের অপেক্ষাও করতো। যখন খাদ্যভাব চরমে, তখন মুমুর্ষ কোনো জীবিতকে মেরে তার লাশ খাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রচলিত আছে। এই ঘটনার উপর ভিত্তি করে ১৯৯৩ সালে ‘Alive’ নামে একটি সিনেমাও নির্মিত হয়। বাংলাদেশি থ্রিলার লেখক মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন এই ঘটনার উপর থিম করে একটি অনবদ্য থ্রিলার রচনা করেন। থ্রিলারটির নাম, “রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেন নি”। থ্রিলার থেকে নেয়া শুরুর উক্তি দিয়েই শেষ করি এই সারভাইবালের গল্প-

“খিদের কাছে সব পরাজিত হয়। সবার আগে পরাজিত হয় স্বাদ-রুচি, তারপর যুক্তিবুদ্ধি, সভ্যতা, মানবিকতা।”

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা