শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন কাটানো আলফনসো ডেভিস আর কয়েক ঘন্টা পরেই নামবেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জেতার মিশনে। রিফিউজি ক্যাম্পের ভাঙাচোরা হাট থেকে লিসবনের আলো ঝলমলে রাত- ডেভিসের জীবনের গল্পটা তো উপন্যাস বা সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়!

কয়েক দিন আগেই চ্যাম্পিয়নস লীগের কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখের কাছে বার্সালোনার লজ্জাজনক ও রেকর্ড হারের সাক্ষী হয়ে আছে গোটা ফুটবল বিশ্বইঅন্তত ইউরোপের মহামঞ্চে হাল আমলে এমন ম্যাচ তো আর দেখা যায়নি, আর তাছাড়া বার্সালোনা মতো দলের এমন পর্যদুস্ত হওয়া হতবাক করেছে ফুটবলপ্রেমীতবে সেই ম্যাচের পঞ্চম গোলটির কথা মনে আছে কি? মনে থাকারই কথা অবশ্যকারণ বার্সার রাইটব্যাক নেলসন সেমেদোকে ড্রিবলিং ও গতির পারদে বোকা বানিয়ে বাইলাইন থেকে কাট করে যেভাবে বার্সার বক্সে বায়ার্নের তরুণ লেফটব্যাক আলফনসো ডেভিস ঢুকে গিয়েছিলেন, এমন চোখ ধাঁধানো মুহুর্ত ইদানীং হরহামেশাই হয় না৷ সেটি চমৎকার পূর্ণতা পেলো যখন সুন্দর ভাবে কিমিচকে ফিনিশিং পাসটা দিলেন দারুণ পজিশনিং সেন্সকে কাজে লাগিয়ে জশুয়া কিমিচ গোলটা করেছিলেন বটে, কিন্তু দর্শকরা বুদ হয়ে রইলো ডেভিস ম্যাজিকেই!

কানাডিয়ান আলফনসো ডেভিস, মেজর লীগ সকারের ইতিহাসে রেকর্ড ট্রান্সফার অর্থে জার্মানিতে পাড়ি জমিয়েছিলেনবয়সে তরুণ, কিন্তু প্রতিভা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেইতাছাড়া কানাডিয়ান মিডিয়া তাকে এযাবৎকালে কানাডার সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলায়াড় হিসেবেই দাবী করে আসছিলোবার্সালোনা ম্যাচের আগে অবশ্য ডেভিস বিশেষ দৃষ্টি পেয়েছিলেন মেসির কারণেই৷ ব্যাপারটা শিরোনামে এসেছিল এভাবে, বিশ্বসেরা মেসিকে রাইট ফ্ল্যাংকে কিভাবে আটকাবেন অনভিজ্ঞ ডেভিস! নিজের স্বপ্নের তারকার মুখোমুখি হবেন সেই উত্তেজনার পারদ সামলাতে না পেরে নাকি বাবাকেও ফোন দিয়েছিলেন ডেভিসছেলের উত্তেজনায় একচোট হাসলেন বাবা, ফিরতি জবাবে হাসলেন ডেভিসওহয়তো দুজনই ফিরে গিয়েছিলেন প্রায় বিশ বছর আগের দুঃসহ অতীতে! কিভাবে এই দুঃসাধ্য সফরের পরিণতি এতটুকু হলো, সেই আবেগেই হয়তো একাকার হচ্ছিলেন বাবা-ছেলে

নব্বই দশকের শেষে আফ্রিকার দেশগুলোতে চলছে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দামামাযুদ্ধের হাওয়া এসে লেগেছিলো লাইবেরিয়া নামক দেশেও৷ সেই সংঘাত ও বিপর্যস্ত জীবন থেকে পালিয়ে গোটা হাজার পঞ্চাশেক শরণার্থীদের সাথে প্রতিবেশী দেশ ঘানার বুদুবুরাম অঞ্চলের এক শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয় ডিভিয়া ও টেরেসা দম্পতিবছর খানেক পরে, সেই ক্যাম্পেই চতুর্থ সন্তানের জন্ম দেন তারাসদ্য জন্মানো ছেলে শিশুর নাম রাখা হয়, আলফনসো ডেভিসকিন্তু ক্যাম্পের পরিবেশ ছিল যাচ্ছেতাই, লোকজনে ঠাসাআর প্রবল খাদ্য সংকট ছিল নিত্তনৈমিত্তিক বিষয়এমতাবস্থায় দম্পতিও ভেবে পান না কিভাবে কি করবেন! তাছাড়া দেশে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই, সামান্য বর্ডার পার করে খাদ্যের প্রয়োজনে লাইবেরিয়ায় প্রবেশ করলেই দেখতে পাওয়া যেত লাশের স্তুপ৷

শরণার্থী শিবির থেকে উঠে এসেছেন আলফনসো ডেভিস

এদিকে খাবারই জুটছে না, আর বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর সুযোগ তো নেই বললেই চলেসুতরাং কঠিন সংগ্রাম মধ্যেই তাদের জীবন অতিবাহিত হতে থাকেসেই ঘানার ক্যাম্পে নিদারুণ কষ্টের কথা অনেকভাবেই উঠে আসে ডেভিসের মা-বাবার দুঃস্মৃতির বর্ণনায়ডেভিসের বাবার ভাষ্যমতে, 'এটা সত্য ক্যাম্পে আমাদের ওপর কোনোরকমের টর্চার হতো না, হয়রানির স্বীকারও হতে হয়নিতাই আমরা বেশ নিরাপদে ছিলামকিন্তু তা ছাপিয়ে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো, টাকার প্রচন্ড অভাবএজন্য আমাদের সেখানে টিকে থাকাটা একপ্রকার অসম্ভবই ছিলএমনকি পানির জন্য পর্যন্ত টাকা দেয়া লাগতো৷' কখনো কখনো, ক্যাম্পের বাইরে খাবারের খোঁজে বের হতে হলে, নিরাপত্তার খাতিরে বন্দুক রাখা লাগতো৷ তাই ডেভিসের বাবার মতে, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখেই যেকোনো উপায়ে তারা সেখান থেকে পালাতে চেয়েছিলেনঅতঃপর একধরনের শরণার্থী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হলে, ডেভিসের বাবা দ্রুতই কানাডার জন্য ফর্ম পূরণ করেপরবর্তীতে ইন্টারভিউসহ যাবতীয় সকল ধাপ অতিক্রম করে ডেভিস ও তার পরিবারের গন্তব্য হয় কানাডাডেভিসের বয়স তখন সবে পাঁচ বছর

কানাডা পৌঁছালেও, জীবনের নবযাত্রা একদম শূন্য থেকেই শুরু হয়৷ কারণ সেখানেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠার লড়াইটা এতো সহজ ছিল না৷ বাবা-মা সারাদিন ব্যস্ত থাকতো কাজেতাই বড় ভাই বোনদের দেখভালেই কেটেছে শান্তশিষ্ট ডেভিসের ছোটবেলা, তাদের মাধ্যমেই হাতেখড়ি হয়েছে ফুটবলেরঅবশ্য ডেভিসের খেলাকেন্দ্রিক প্রতিভার প্রথম সন্ধান পান 'মাদার তেরেসা ক্যাথলিক স্কুল' এর স্পোর্টস শিক্ষক ম্যালিসা গুজ্জো৷ তাঁর মতে ফুটবল তো বটেই, ট্র্যাক, ব্যাস্কেটবল সবধরনের খেলাতেই সে বাচ্চা হলেও ছিল অদম্যফলে ধীরে ধীরে গুজ্জোর তৎপরতায় ডেভিস শহরের নানা টুর্নামেন্টে খেললে, সেখানে 'ফ্রি ফুটি' নামক একটি ক্রীড়া সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা টিম এডামের নজর কাড়েনপরে টিম এডাম তাঁকে একটি স্থানীয় একাডেমী কোচ মার্কো বসিও-র হাতে তুলে দেন

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ডেভিসকেমিডিয়ায় সাংবাদিকদের খোঁজে সম্ভাবনাময় আগামীর ভবিষ্যতের তকমা পাওয়ার পর, পশ্চিম কানাডার জনপ্রিয় ক্লাব (যারা নিয়মিত মেজর লীগ সকারেও অংশগ্রহণ করে) ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপস এর কতৃপক্ষ তাকে নিজেদের স্থানীয় একাডেমীতে নিয়ে আসেপ্রথমে পরিবারের অমত থাকলেও, তা ক্লাবের নির্ভরতায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নিএবার মনমতো পরিবেশ পেয়ে নিজেকে কেবল পুরোদমে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার পালা ছিল ডেভিসের

কিন্তু খানিকটা বিপত্তি শুরু হয় অন্যভাবেপ্রতিভার ছাপ দেখে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবের স্কাউটরা ডেভিসের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, আসতে থাকে নানান উপহার ও উপঢৌকনএজন্য সেই বয়সে অগত্যা কৈশোরের কোচ হুর্সেইকে ছেলের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় ডেভিসের বাবা-মাবলে রাখা ভালো, হুর্সেই এখনো এজেন্ট হিসেবে ডেভিসের সাথেই আছেনপথিমধ্যে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের তৎকালীন ম্যানেজার হোসে মরিনহো তাকে ক্লাবে চানএজন্য ক্লাবে ট্রায়ালের অফারও দেয়া হয়েছিলোকিন্তু তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ডেভিস ও ক্লাব কতৃপক্ষ, যুক্তি ছিল সে এখনো প্রস্তুত নয়বছর দুয়েক পর মাত্র পনেরো বছর বয়সে মেজর লীগ সকারে অভিষেক ঘটে ডেভিসের, যা তাকে অভিষেক বিবেচনায় লীগ ইতিহাসের কনিষ্ঠতম খেলোয়াড়ের তকমা পাইয়ে দেয়৷ আর এদিকে মাঠে চমৎকার কারসাজি ও অপ্রতিরোধ্য মনোভাবে ডেভিস হয়ে উঠলেন অনন্য

বায়ার্ন সতীর্থ কৌতিনহোর সঙ্গে

সাধারণত বামে খেললেও, ডানদিকেও তিনি সমান পারদর্শী ও বিপদজ্জনক! সবুজ ঘাসে ছড়ানো মুগ্ধতায় যেন কোনো লাগাম নেইএদিকে বায়ার্ন মিউনিখের স্কাউটরা ডেভিসকে নিয়ে নির্দিষ্টভাবে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও ভাবনার কথা জানায়যা এক পর্যায়ে ডেভিস ও তার এজেন্টকে বায়ার্নের প্রতি উৎসাহিত করতে বাধ্য হয়অবশেষে ২০১৯ সালের জানুয়ারির শীতকালীন ট্রান্সফারে প্রায় বারো মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে যোগ দেন ইউরোপিয়ান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখেমূলত বায়ার্নে এসেই উইঙ্গার থেকে ফুলব্যাক পজিশনে যান যা অবশ্য তার সহজাত খেলার ধরনকেই আরো বেশি পরিস্ফুটিত করে

বার্সালোনা ও বায়ার্ন মিউনিখের ম্যাচের পর এখন সর্বত্রই ডেভিস বন্দনা চলছে। আর হবেই না কেন, এযেন সাক্ষাত রূপকথার গল্পএ যেন রিফিউজি ক্যাম্পে জন্ম নেয়া এক অসহায় শিশুর গল্প, যে নিজের আকাশচুম্বী স্বপ্নকে একপ্রকার অতিক্রম করার সুবিশাল কীর্তি গড়েছে! আজও ইন্টারনেটে খানিকটা ঘেটে দেখলে শরণার্থী ক্যাম্পের সেই ভাঙাচোরা ক্ষুদ্র হাটটির দেখা মিলে, যেখানে জন্মের পর প্রায় পাঁচটি বছর কেটেছে ডেভিস ও তার পরিবারেরনিজের বাবা মায়ের অবিরাম সংগ্রামের প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞ ডেভিস মনে করেন, বাবা-মা ছাড়া এই পথচলা কখনো এমন পরিণতি লাভ করতো না৷ হয়তো ফুটবলারই হয়ে উঠা হতো না কখনো

এক অনিশ্চিত জীবনের বিন্দু থেকে উঠে আসা ডেভিস মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল খেলতে নামবেনইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে না হোক, অন্তত ডেভিসের জীবনের পাতায় সমৃদ্ধির আরো একটি পালক যুক্ত হবে এমনটাই আশা ফুটবলপ্রেমীদেরও

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা