১৫ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণের পর খুন করা হয়েছিল, সাহায্যের জন্য ফোন করলেও তাকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। আর সেটার মূল্য দিতে হয়েছে দেশটির পুলিশ প্রধান এবং দুই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করে। না, দেশটার নাম বাংলাদেশ নয়...

১৪ই জুলাই ২০২০, সন্ধ্যা নামবে কিছুক্ষণের মধ্যে। ১৫ বছর বয়স্ক রোমানিয়ান কিশোরী আলেকজান্দ্রা মাসেসানু দাঁড়িয়ে আছে দোবরোসলোভেনি শহরের রাস্তায়। বাড়ি ফেরার বাসের জন্য অপেক্ষা করছে সে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারনে মানুষজন খুব একটা নেই রাস্তায়, জরুরি দরকার না থাকলে মাসেসানু নিজেও বের হতো না। গাড়িঘোড়া নেই বললেই চলে। বাসের আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে লিফট পাওয়া যায় কিনা সেই চেষ্টা করতে লাগলো মাসেসানু। শহর পর্যন্ত যেতে পারলেই হবে। 

কয়েকটা গাড়ি তার বাড়িয়ে ধরা হাতকে উপেক্ষা করে ছুটে চলে গেলেও, একটা গাড়ি থামলো। জানালার কাঁচের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো বৃদ্ধ একটা চেহারা, চালকের আসনে বসা লোকটার বয়স ষাটের কম হবে না। মাসেসানুর বাবার চেয়েও বেশি। কথোপকথনে জানা গেল, গাড়িটাও মাসেসানুর গন্তব্যের দিকেই যাচ্ছে। হাসিমুখেই গাড়িতে চড়ে বসলো কিশোরী মেয়েটা, নিজেকে অনিরাপদ ভাবার কোন কারনই ছিল না তার। মাসেসানু জানতো না, এই যাত্রাই তার শেষযাত্রা হতে যাচ্ছে। জানলে কি আর লিফটটা নিতো সে? 

রাতে মেয়ে বাড়ি না ফেরায় পুলিশের কাছে রিপোর্ট করে মাসেসানুর পরিবার। যেখানে সে কাজে গিয়েছিল, সেখানে যোগাযোগ করে জানা যায়, কাজ শেষ করে বিকেলেই বেরিয়ে গেছে মাসেসানু। তাহলে মেয়েটা গেল কোথায়? কোন তথ্য নেই পুলিশের হাতে। মাসেসানুর কোন বয়ফ্রেন্ড নেই, তার পরিবারের সাথে কারো শত্রুতা নেই। তাহলে মাসেসানুর হলোটা কি? এই ভেবে পুলিশ যখন হয়রান, তখন জরুরি সেবা সার্ভিসের হটলাইন নাম্বারে একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন এলো। মাসেসানুর ফোন ছিল সেটা। 

কিশোরী আলেকজান্দ্রা মাসেসানু

ফোনে কান্নাভেজা গলায় মাসেসানু জানালো, তাকে অপহরণ করা হয়েছে, কারন কি সে জানে না। যে গাড়িতে সে লিফট নিয়েছিল, সেটার মালিকই অপহরণ করে বাড়ির বেজমেন্টে আটকে রেখেছে তাকে। অথচ এই লোককে গতকালের আগে কখনও দেখেনি মাসেসানু। কল অপারেটরের প্রশ্নের জবাবে গাড়ির নাম্বার বলতে পারলো না মেয়েটা, শুধু আবছা বর্ণনা দিতে পারলো গাড়ি আর তার মালিকের। কোথায় তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে সেই সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই মাসেসানুর, কারন গাড়িতেই ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলা হয়েছিল তাকে। 

কয়েক মিনিটের কথোপকথনের পর ফোনটা কেটে গিয়েছিল। সেদিনই আরও দুবার হেল্পলাইনে ফোন করেছিল মাসেসানু, তাকে এখান থেকে উদ্ধারের আর্জি জানিয়েছিল সে। পুলিশ তখন মাসেসানুর বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে গাড়ি আর গাড়ির মালিককে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে, আরেকটা দল সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই বাছাই করছে। কিন্ত মাসেসানুর হাতে সময় ছিল না। অপহরণকারী তাকে নৃশংসভাবে খুন করে। অপহরণের পরে অন্তত বিশ ঘন্টা বেঁচে ছিল মেয়েটা, কিন্ত এরমধ্যে তাকে উদ্ধার করা যায়নি সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করেও। 

মাসেসানু যে বন্দি অবস্থায় পুলিশকে তিনবার ফোন করেছিল, সেটা চাপা থাকেনি। খবরটা প্রকাশিত হতেই যেন দাবানল ছড়িয়ে পড়লো রোমানিয়ার সর্বত্র! পরদিন যখন মাসেসানুর লাশ উদ্ধার করা হলো, তখন হাজার হাজার প্রতিবাদী জনতা নেমে এলো রাস্তায়, করোনার সংক্রমণের ভয়কে উপেক্ষা করেই। তাদের একটাই বক্তব্য- পুলিশের গাফেলতির কারনেই এই হত্যাকান্ড ঘটেছে, সময়মতো পুলিশ মাসেসানুকে উদ্ধার করতে পারেনি। আন্দোলনের মুখে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যার নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করে সেই নিকোলাই মোগা পদত্যাগ করলেন। সেদিনই বরখাস্ত করা হলো পুলিশপ্রধান আয়ন বুদাকেও। 

রোমানিয়ার মানুষ নেমে এসেছিল রাস্তায়

পুলিশ যখন মাসেসানু হত্যাকান্ডের রহস্য প্রায় সমাধান করে এনেছে, তখন আরেকটা ঘটনা ঘটলো। এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গিয়ে রোমানিয়ার শিক্ষামন্ত্রী ইকেতেরিনা আন্দ্রোনেস্কুও পুলিশের ব্যর্থতা এড়াতে চাইলেন,বরং মাসেসানুর ওপরেই দোষ চাপিয়ে বললেন, ‘অপরিচিত ব্যক্তির গাড়িতে উঠতে নেই- কিশোরী মাসেসানুকে তার পরিবার এই শিক্ষা যথাযথভাবে দেয়নি।' 

আর যায় কোথায়! আগুনে যেন ঘি এসে পড়লো এবার! এমনিতেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষ ক্ষেপে ছিল, শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যে সেই ক্ষোভ কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রশ্ন উঠতে থাকলো, এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ কি করে একটা দেশের মন্ত্রী হয়! রোমানিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভিওরিকা দানচিলাও এই মন্তব্যকে একদমই ভালোভাবে নেননি। হোক না ইকেতেরিনা আন্দ্রোনেস্কু তারই দলের নেতা, তার ক্যাবিনেটের মন্ত্রী; তাই বলে এমন মন্তব্য তো গ্রহণযোগ্য নয়। অপহরণ ও খুনের পর শিক্ষামন্ত্রীর এমন মন্তব্যকে ‘বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন দানচিলা। শিক্ষামন্ত্রী আন্দ্রোনেস্কু ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, এমন মন্তব্যও করেছিলেন তিনি।

ইকেতেরিনা আন্দ্রোনেস্কু অবশ্য নিজের পক্ষে কয়েক দফা সাফাই গেয়েছেন, তার বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন। কিন্ত রোমানিয়ার লোকজন তো আর উগান্ডার জনগনের মতো মোটা চামড়ার নন। তাদের প্রতিবাদ অব্যহত রইলো। অবস্থা বেগতিক দেখে ইকেতেরিনা আন্দ্রোনেস্কুকে শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এর আগে এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশ প্রধান পদ হারিয়েছিলেন। একটা অপহরণের ও খুনের ঘটনা রোমানিয়াকে এভাবেই নাড়িয়ে দিয়েছিল দেড় মাস আগে। 

আলেকজান্দ্রা মাসেসানুর হত্যাকারী গিওর্গি দিনকা

পুলিশ অবশ্য খুব দ্রুতই রহস্যভেদ করেছে, খুনীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৬৫ বছর বয়সী গিওর্গি দিনকা, যার গাড়িতে মাসেসানু লিফট নিয়েছিল, সেই লোকটাই অপহরণের পর খুন করেছে মাসেসানুকে। দিনকার বাড়ি থেকে কিশোরী মাসেসানুর ডিএনএ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। দিনকা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খুনের ঘটনা স্বীকার করে নিয়েছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে, মাসেসানুই দিনকার প্রথম শিকার নয়; এর আগে ১৮ বছর বয়সী আরেক কিশোরী লুইজা মেলেনকুকে হত্যার কথাও জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে এই খুনী। পুলিশের হেফাজতে নিজের অপরাধ স্বীকারও করে নিয়েছে সে। 

মাসেসানুর ঘটনাটা একটা প্রতীকি বার্তা। যেটা উন্নত দেশগুলোতে হরহামেশা দেখা যায়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পদ ছেড়ে দেন, সেটা চক্ষুলজ্জার খাতিরেই করেন তারা। কিন্ত সভ্য সমাজের উদাহরণ তো বাংলাদেশে আশা করে লাভ নেই। এখানে যে সেক্টরে অপরাধ যত বেশি, সেই সেক্টরের দায়িত্বশীলদের গলা তত উঁচুতে থাকে? পদত্যাগ বলে কোন শব্দ তো এদেশের নেতাদের অভিধানে নেই! সাগর-রুনী হত্যা থেকে স্বাস্থ্য খাতের সীমাহীন দুর্নীতি বা এমসি কলেজের ধর্ষণকাণ্ড- যতকিছুই ঘটুক, কেউ পদ ছাড়বে না, কারন এটাই এদেশের সংস্কৃতি, আমাদের নেতা-মন্ত্রী-ভিসিরা তো রোমানিয়ার মন্ত্রীদের মতো বোকা নন!

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- বিবিসি, স্কাই নিউজ, রোমানিয়া ইনসাইডার, প্রথম আলো। 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা