যে বাংলাদেশে আহমদ শফীদের এতটা গুরুত্ব দেয়া হয়, সেই বাংলাদেশ যে সাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই, সেটা বুঝে নিতে আমাদের কষ্ট হয় না!

হেফাজতের আমির আহমেদ শফী নারীকে তুলনা করেন তেঁতুলের সঙ্গে। তেঁতুল দেখলে যেমন জিভে জল আসে, সেরকমই নারীকে দেখলেও নাকি পুরুষের লালা গড়ায়! নারী শিক্ষার ঘোর বিরোধী তিনি, মেয়েদের ক্লাস ফাইভের বেশি না পড়ানোর ফতোয়াও জারী করেছিলেন তিনি। এবার নতুন ফর্মূলা নিয়ে এসে তিনি বলেছেন, স্কুল-কলেজে পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা নাকি জেনা করে বেড়ায়, দেশের স্কুল-কলেজগুলো জেনার বাজার হয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেছেন শফী!

আমার মাথায় ঢোকে না, এই লোকের সমস্যাটা আসলে কোন জায়গায়? মেয়েরা স্কুল কলেজে যাবে, পড়ালেখা করবে, চাকরি করবে, সেসব নিয়ে তার কেন এত মাথাব্যথা? তার চোখে গার্মেন্টসে কাজ করা নারীরা নাকি জেনাকারী! নারী ঘরের বাইরে কাজ করবে, এটা তিনি মানতেই পারেন না। অথচ এই ধর্মান্ধ মানুষটার লাখ লাখ অন্ধভক্ত আছে এদেশে, যারা তার অযৌক্তিক কথাবার্তা বা ফতোয়াগুলোকে জায়েজ করার প্রাণপন চেষ্টা করে যায়।

এর আগে একবার তিনি দাবী তুলেছিলেন, স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে আর মেয়েদের আলাদা আলাদা ক্লাস নেয়ার জন্যে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্যে নারী শিক্ষিকা থাকবেন, কোন পুরুষ শিক্ষক মেয়েদের ক্লাস নিতে পারবেন না- এরকম অদ্ভুত আবদারও শোনা গিয়েছিল তার মুখে। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, মেয়েদের জন্যে নারী শিক্ষিকার ব্যবস্থা করা হলে নাকি ধর্ষনের পরিমাণ কমে যাবে।

নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে বরাবরই স্বোচ্চার আহমদ শফী

আহমদ শফিকে আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, মাদ্রাসাগুলোতে যে ছেলে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসার হুজুরদের দ্বারা ধর্ষিত হয়, যে ঘটনাকে আমাদের মিডিয়া আদর করে ‘বলাৎকার’ নামে ডাকে, সেই ব্যাপারে তার কী অভিমত? ছেলেদের পর্দার বিষয়ে তিনি কী কোন ফতোয়া দেবেন? এই যে প্রতিদিন পত্রিকায় ছাত্র ধর্ষনের খবর আসে, সেগুলোর ব্যাপারে তিনি কেন কোন প্রতিবাদ করেন না? সেখানে তো পর্দার ব্যাপার স্যাপার নেই, তাহলে ছেলে শিক্ষার্থীরা কেন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে মাদ্রাসার হুজুরদের হাতে- এর ব্যাখ্যা কী আহমদ শফী দেবেন?

তার কাছে এটার কোন ব্যাখ্যা নেই, থাকার কথাও না। নারীদের পোষাকের কথা বলে, জেনার নাম নিয়ে, ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তিনি নারীদের ঘরের ভেতরে বন্দি করে রাখতে চান। নারী শিক্ষিত হলে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়ে গেলে তো তাকে দমিয়ে রাখা যাবে না। সেকারণেই আহমদ শফীরা ধর্ষনের কারণ হিসেবে নারীর পোষাককে দায়ী করেন ঠিকই, কিন্ত মাদ্রাসার হুজুরের হাতে ছাত্র নিপীড়ন হলে তারা চুপ থাকেন। নুসরাতেরা যখন হিজাব-বোরখা পরেও মাদ্রাসার অধ্যক্ষের কাছে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, তখন সেটার প্রতিবাদ করার জন্যে আহমদ শফিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

কিছুদিন আগে হাটহাজারীতে এক মাহফিলে আহমদ শফী উপস্থিত জনতাকে শপথ করিয়েছেন, তারা যেন মেয়েদেরকে ক্লাস ফাইভের বেশি পড়ালেখা না করান! শিরোনামটা দেখে প্রথমে বিশ্বাস হতে চায়নি, কিন্ত ঘটনাটা বাস্তবেই ঘটেছে, কোন কমেডি সিনেমার দৃশ্য ছিল না এটা। মেয়েদের পড়ালেখা না করানোর পেছনে আহমেদ শফীর যুক্তি ছিল- "মেয়েকে বেশি যদি পড়ান, ক্লাস এইট, নাইন, টেন, এমএ, বিএ পর্যন্ত পড়ালে ওই মেয়ে আপনার মেয়ে থাকবে না। অন্য কেহ নিয়ে যাবে। পত্রপত্রিকায় এ রকম ঘটনা আছে কিনা বলেন?" ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ানোর কারণ হিসেবে শফী বলেছেন, বিয়ে দিলে স্বামীর টাকা পয়সা হিসেব করতে হবে, তাকে চিঠি লিখতে হবে। এজন্যে অক্ষরজ্ঞান থাকাটা প্রয়োজন!

মেয়েদের ক্লাস ফাইভের বেশি না পড়ানোর ওয়াদা করিয়েছেন আহমদ শফি

হাটহাজারীরই আরেক মাহফিলে তিনি বলেছেন- ‘শিক্ষকরা এখন জেনা করছে। ছাত্র-ছাত্রীরা তো জেনা করেই। হাসিনাকে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) জানাই, হাসিনা তুমি যেভাবে লেখাপড়া করেছো সেভাবে আমাদের মেয়েদেরও, মহিলাদেরও ওইভাবে লেখাপড়া করার জন্য আদেশ দাও। আমি মহিলাদের শিক্ষিত হওয়ার জন্য বাধা দিচ্ছি না। মহিলা আলাদা, পুরুষ আলাদা-এমন করলে ভালো হবে না খারাপ হবে? এখন তো রাস্তাঘাটে একজন মহিলা, একজন পুরুষ, একজন মহিলা, একজন পুরুষ-কেমন? এরা চোখের জেনা করে। চলাফেরা করে। এখন স্কুল-কলেজে জেনার বাজার হয়ে গেছে!’

সমস্যাটা কোথায় জানেন? আহমদ শফিরা ছেলে আর মেয়েকে একসাথে দেখলেই ভাবে এই দুজন বুঝি প্রেম করছে, জেনা করছে! এদের মাথায় সর্বক্ষণ কুচিন্তা ঘোরে, নারীদেরকে ভোগ্য পণ্য ছাড়া আর কিছু এরা ভাবতে শেখেনি, আর তাই সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি পরিহিত নারী দেখলেও এদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ধর্ষণের পেছনে ধর্ষকের কুৎসিত মানসিকতাটা এদের চোখে পড়ে না, এরা দেখে ধর্ষিতা তরুণীর পরনে কি পোষাক ছিল, তারপর সেটা নিয়ে ইস্যু তৈরীতে নেমে পড়ে।

মাদ্রাসায় ছাত্র ধর্ষনের বিরুদ্ধে কখনও মুখ খোলেননি আহমদ শফি

নারীকে ঘরের অন্ধকারে বন্দী করে ভোগ করাতেই এদের বিমলানন্দ, নারী তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোক- এটা তারা চায় না। তাদের চোখে নারী মানেই সংসার করবে, স্বামীর একান্ত অনুগত হিয়ে থাকবে, তার কাজ সন্তান পালন করা, স্বামীর টাকাপয়সার হিসেব রাখা- সোজা কথায় স্বামীর দাসী হয়ে থাকা। এজন্যেই তারা নারী শিক্ষার বিরোধিতা, করে, এমনকি বইয়ে সাত-আট বছরের মেয়ে শিশুর ছবি থাকলেও এরা আন্দোলন করে সেই ছবির ওপরে ওড়না আর হিজাব চড়িয়ে দিতে বাধ্য করে! নারী যদি শিক্ষিত হয়, নিজের অধিকার চায়, অর্থনৈতিভাবে স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে তো এই ধর্মান্ধদের দমন পীড়নের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্যেই মেয়েদের ক্লাস ফাইভের বেশি না পড়ানোর ওয়াদা করায় তারা ভরা মজলিসে!

কষ্ট লাগে কি জানেন? এইরকম নারীবিরোধী একটা মানুষের সাথে একই মঞ্চে বসেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী, যিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যাও। বঙ্গবন্ধু একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, সেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে আহমদ শফিরা হচ্ছে বিষফোঁড়ার মতো। সেই লোকের কাছ থেকে সংবর্ধনা নেন শেখ হাসিনা, মদীনা সনদ অনুযায়ী দেশ চলবে বলে ভাষণ দেন, হেফাজতকে রেলের জমি বরাদ্দ দেয়া খবর পাই আমরা সংবাদ মাধ্যমে!

এসব দেখে শুনে খুব হতাশ লাগে। যে বাংলাদেশে আহমদ শফীদের এতটা গুরুত্ব দেয়া হয়, সেই বাংলাদেশ যে সাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই, সেটা বুঝে নিতে আমাদের কষ্ট হয় না!


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা