আগুনের পরশমনি'র মতিন সাহেব থেকে দারুচিনি দ্বীপের সোবহান সাহেব, কিংবা মিসির আলী- সব ভূমিকাতেই দর্শককে মুগ্ধ করেছেন তিনি। এমন একজন কিংবদন্তিকে নিয়ে নোংরা অসুস্থ ট্রল কীভাবে করে মানুষ?

১৯৭১ সালের মে মাস, ঢাকা শহরে অবরুদ্ধ হাজারও পরিবারের মধ্যে মতিন সাহেবের পরিবারও একটি। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও গৃহপরিচারিকা কে নিয়ে তিনি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, সেই সময় তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নেন এক তরুন মুক্তিযোদ্ধা। প্রতি মুহুর্তের মৃত্যুর আতঙ্কের মাঝেও স্বপ্ন দেখেন দেশ একদিন স্বাধীন হবে। রেডিওটা কানে লাগিয়ে ভয়েস অফ আমেরিকা, বিবিসি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনার চেষ্টা করেন মতিন সাহেব। 

হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'আগুনের পরশমনি'তে এই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে নিজের প্রতিভার সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখেন, তিনি দারুচিনি দ্বীপ সিনেমার সেই অতি দারিদ্যের মাঝেও স্বপ্নদ্রষ্টা 'সোবহান সাহেব' চরিত্রে অভিনয় করে পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার। শুধু চলচ্চিত্রে নয় নাটকের জগতেও তিনি নিজ নামে খ্যাত, নক্ষত্রের রাত কিংবা আজ রবিবার- সব ধারাবাহিকেই তিনি বাবার চরিত্রে অনবদ্য। পাশাপাশি জনপ্রিয় 'মিসির আলি' হয়েও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যঙ্গনের কিংবদন্তি অভিনেতা 'আবুল হায়াত'।

ভারতের পশ্চিমববঙ্গে জন্ম হলেও,দেশ বিভাগের পর চলে আসেন চট্টগ্রামে।ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে প্রকৌশলী হিসেবে নিযুক্ত হন ওয়াসায়।এরপর হঠাৎ করেই ১৯৬৯ সালে 'ইডিপাস' নাটকের মধ্য দিয়ে টেলিভিশন জগতে আত্বপ্রকাশ, ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেন টিভি নাটকের নিয়মিত অভিনেতা। 

আবুল হায়াত

প্রধান চরিত্রে অভিনয় না করেও ভীষন জনপ্রিয় হয়েছিলেন। বহুব্রীহি, অন্য ভুবনের ছেলেটা, দ্বিতীয় জন্ম, অয়োময়, নক্ষত্রের রাত, আজ রবিবার থেকে জোছনার ফুল, শুকনো ফুল রঙ্গিন ফুল, আলো আমার আলো, নদীর নাম নয়নতারা, সাতকাহন, শনিবার রাত ১০টা ৪০ মিনিট, হাউজফুল, এফ এন এফ- সহ অসংখ্য দর্শকনন্দিত নাটকে অভিনয় করে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁকে বলা হয় টিভি নাটকের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় 'বাবা'। শুধু অভিনয়েই নয়, নাট্যকার হিসেবেও নিজের প্রতিভার আলো ছড়িয়েছিলেন। পরিচালনা করেছেন উন্মেষ, দিল দরিয়া, জোছনার ফুল, মন+হৃদয়, হারানো সুর, অতিথি, শুকনো ফুল রঙ্গিন ফুল, মধাহ্ন ভোজ কি হবে, হাত বাড়িয়ে দাও- এর মত বহু আলোচিত নাটক। সম্প্রতি 'উপহার' নাটকেও ছড়িয়েছেন নিজের দ্যূতি।

নাট্যজগতের পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতেও নিজেকে করেছেন সমৃদ্ধ। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটকের 'তিতাস একটি নদীর নাম' চলচ্চিত্রে স্বল্প উপস্থিতিতে প্রথম অভিনয় করেন, একই বছর 'অরুণোদ্বয়ের অগ্নিসাক্ষী' সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। তবে নব্বইয়ের দশকে এসে চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করা শুরু করেন, কেয়ামত থেকে কেয়ামত, স্বপ্নের ঠিকানা, প্রানের চেয়ে প্রিয়, প্রেমের তাজমহল থেকে শঙ্খনীল কারাগার, আগুনের পরশমনি, জয়যাত্রা, দারুচিনি দ্বীপ, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, অজ্ঞাতনামা- সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন। 

স্ত্রী মাজফুজা খাতুন শিরিনের সঙ্গে আবুল হায়াত

সিনেমার মধ্যে সর্বশেষ অভিনয় করেছেন 'ফাগুন হাওয়ায়' তে, ওয়েব ফিল্ম 'দ্বিতীয় কৈশোর' এ-ও ছিল তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। সাহিত্য জগতেও নিজের নাম লিখিয়েছেন, এছাড়া তিনি বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, উপস্থাপক হিসেবেও প্রশংসিত হয়েছিলেন। বর্ণিল ক্যারিয়ারে দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার সহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। 

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন ১৯৭০ সালে, স্ত্রীর নাম মাহফুজা খাতুন শিরিন। তার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে নাট্যজগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত, ছোট মেয়ে নাতাশা হায়াতও নাটকে অভিনয় করেছেন। জনপ্রিয় অভিনেতা ও নির্দেশক তৌকির আহমেদ ও মডেল অভিনেতা শাহেদ উনার জামাতা। 

১৯৪৪ সালের আজকের এইদিনে জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তি অভিনেতা আজ পেরোচ্ছেন জীবনের ৭৬টি বছর, ব্যক্তিজীবন ও মিডিয়াজগতের অত্যন্ত সফল এই মানুষের জন্য সুস্থতা কামনা করি। শুভ জন্মদিন...

ছবি কৃতজ্ঞতা- দ্য ডেইলি স্টার

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা