আরে আমি তো ইয়াং। করোনাভাইরাসে আমার কিচ্ছু হবে না। এই ভাইরাসে শুরু বুড়োরা মরে- এমন উদ্ভট বিশ্বাসের পিঠে চড়ে যারা ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তারা মনোযোগ দিয়ে লেখাটি পড়ুন।

শুরু করছি একটি মৃত্যুসংবাদ দিয়ে। আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসের ল্যাংকেস্টারে এক টিনেজার মারা গেছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। এটাই প্রথম কোনো আক্রান্তের মৃত্যু যার বয়স ১৮ এর নীচে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী এই প্রজন্মকে বলা হয় মিলেনিয়াল। যারা এই ভাইরাসটিকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ, তাদের ধারণা বয়স কম বলে তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। ফলে তাদের করোনাভাইরাসে কিছুই হবে না। লস অ্যাঞ্জেলসের কাউন্টি পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্ট সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, করোনাভাইরাস যেকোনো বয়সের মানুষকেই আক্রমণ করতে পারে। এবং এটি একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস। আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

নিউইয়র্ক টাইমসের মতামত বিভাগে নিজে করোনাভাইরাসে ভোগার সময়কার কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরেছেন ফিওনা লোয়েনস্টেইন। তিনি একাধারে লেখক, প্রযোজক ও নারীবাদী সুস্থতার প্রতিষ্ঠান বডি পলিটিকের প্রতিষ্ঠাতা। ‘আমার বয়স ২৬। আমার আগে কখনো শ্বাসপ্রশ্বাসের কোনো সমস্যা ছিল না। আমি সপ্তাহে ছয় দিন ব্যায়াম করি এবং সিগারেট থেকে দূরে থাকি। আমি ভেবেছিলাম, বর্তমান স্বাস্থ্য সংকটে প্রবীণদের পাশে থেকে ভূমিকা রাখতে পারব। এভাবে আমি সংক্রমিত হলাম এবং কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হিসেবে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হলো।’

এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন ফিওনা লোয়েনস্টেইন। তিনি আরো জানিয়েছেন,  ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গ মিলে যাওয়ায় আমাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। আমাকে দেখে চিকিৎসক বা নার্সরা কেউ আশ্চর্য হয়নি। আমি জানতে পারলাম, পাশের ঘরেই ৩০ বছর বয়সী আরেকজন রোগী ভর্তি। তারও স্বাস্থ্য ভালো। তারও শ্বাসকষ্টের সমস্যা হচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানালেন, আমার মতো বয়সের আরও অনেকেই এ ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। যখন আমাকে অক্সিজেনের নল দেওয়া হলো, কেবল তখনই আমি কিছুটা স্বস্তি পেলাম। আমি ভাগ্যবান যে সমস্যার শুরুতেই হাসপাতালে জায়গা ও যত্ন পেয়েছিলাম।’

ফিওনা লোয়েনস্টেইন 

করোনাভাইরাসের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে তিনি আরো জানিয়েছেন,  ‘আপনি যদি কম বয়সী হন, তবে আপনাকে করোনাভাইরাসের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। এ মহামারিতে তরুণদের ওপরে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে ভাইরাসটি। যেহেতু অনেকেই ধরে নিয়েছেন যে মিলেনিয়ালদের ক্ষেত্রে উপসর্গ বোঝা যায় না, তাই আমাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখতে হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের প্রজন্মের বেশির ভাগ এবং আমাদের চেয়ে কম বয়সীদের মধ্যে কেউ কেউ এই জনস্বাস্থ্য সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে নিচ্ছে না।

আমরা দল বেঁধে জড়ো হয়ে যাচ্ছি, ভ্রমণ করছি এবং কোয়ারেন্টিনের সময়কে ছুটি মনে করে কাটাচ্ছি। সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন প্রজন্ম হিসেবে আমাদের উচিত আরও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহযোগী হিসেবে বন্ধুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। তবে যদি কেউ যদি সামাজিক দায়িত্ব নিতে না চান, তবে নিজেকে সুরক্ষার জন্য হলেও তিনি যেন বাড়িতে অবস্থান করেন। এ রোগে মিলেনিয়ালরা প্রতিরোধী, এটা নিছকই মনগড়া, যা আমি অভিজ্ঞতা দিতেই বলতে পারছি। ইউরোপ ও এশিয়াতে তরুণদের সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস এ সপ্তাহে তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস সংক্রমণে হাসপাতালে আসা ব্যক্তিদের ৪০ শতাংশের বয়স ৫৪ বছরের কম।’

শুরু করেছলাম মৃত্যুসংবাদ দিয়ে, মাঝে কিছু অভিজ্ঞতার গল্প ছিলো, তবে শেষও করছি আরেকটি মৃত্যুসংবাদ দিয়ে। ৩৯ বছর বয়সী সামাজিক কর্মী নাতাশা অট। সুস্থ জীবনযাপন করছিলেন। গত ২২ তারিখের নিউইয়র্ক পোষ্টের আর্টিকেলে বলা হয়- নাতাশাকে তার নিউ ওর্লেন্সের এপার্টমেন্টের রান্নাঘর থেকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত্যুর আগে তার শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিয়েছিলো।

এই বয়সে করোনায় ধরবে না, এমন উদাসীন ভাবনা থেকে আর করোনা টেস্ট করানো হয়নি। তাই জীবন দিয়ে এই ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা প্রায়ই দেখি করোনায় আক্রান্ত মানুষের আহাজারি। তবুও আমাদের টনক নড়ে না। আমরা ঐ এক আজব বিশ্বাসে অভ্যস্ত হয়ে গেছি- আমাদের কোনকিছুতেই কিছু হবে না। বিশ্বাসের এই ভাইরাস আমাদের অমরত্ব দিয়েছে। আর আমরাও বালিতে মাথা গুঁজে বেছে নিয়েছি উটপাখির জীবন।

তথসূত্রঃ নিউইয়র্ক টাইমস, নিউইয়র্ক পোষ্ট, লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস, প্রথম আলো।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা