মগজভর্তি সাহিত্য আছে, পকেটে ফুটো কড়ি নেই। ঘরে খাবার নেই, অসুখের পথ্যি নেই, সংসারে শান্তি নেই। ক'টা টাকার জন্যে এর-ওর কাছে হাত পাতা, ধারকর্জে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা, মাসটা শেষ হচ্ছে না কেন- এই নিয়ে আহাজারি করা, এটাই হয়তো লেখকদের জীবন।

সর্বকালের সেরা সাহিত্যিকদের একজন, লেভ টলস্টয় মারা গিয়েছিলেন রাশিয়ার আস্তাপোভা নামের একটা জায়গায়। একদমই প্রত্যন্ত অঞ্চল সেটা, টলস্টয়ের মাথা গোঁজার কোনো জায়গা ছিল না তখন, রেলস্টেশনে আশ্রয় নিয়েছিলেন কপর্দকহীন মানুষটা। সেখানেই এক শীতল রাতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত টলস্টয় পাড়ি জমালেন অজানার পথে। কেউ জানতেও পারলো না, কাশির দমকে কাঁপতে থাকা মানুষটা ছিলেন রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লেখক। ঠান্ডায় জমে থাকা লাশটা ঠেলাগাড়িতে করে সরকারী হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল পরদিন।

উইলিয়াম শেকসপিয়র তাঁর পুরোটা জীবন কাটিয়েছিলেন ছাপোষা একজন মধ্যবিত্ত হিসেবে। মঞ্চ নাটকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, নাটক লিখতেন। শেষ বয়সে একটা নাটক কোম্পানীর মালিকও হয়েছিলেন। অভাব ছিল না সংসারে, তবে রাঘব বোয়াল টাইপের বড়লোকও হতে পারেননি। হ্যামলেট, কিং লিয়র, ম্যাকবেথের মতো অমূল্য সৃষ্টিগুলোকে লোকে মূল্যায়ন করেছে তার মৃত্যুর তিনশো বছর পরে এসে। জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান বা প্রতিপত্তির কানাকড়িও পাননি শেকসপিয়র।

জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান বা প্রতিপত্তির কানাকড়িও পাননি শেকসপিয়র

এরকম উদাহরণ হাজারটা দেখানো যাবে। দুনিয়ার সবচেয়ে সফল লেখক ধরা হয় জে কে রাওলিংকে, হ্যারী পটার সিরিজের স্রষ্টা তিনি। বই লিখেই বিলিওনিয়ার্স ক্লাবে ঢুকে গিয়েছিলেন এই মানুষটা। সাফল্যের দেখা পাবার আগে তাঁকেও কাটাতে হয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভরা একটা জীবন। কতবার আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন রাওলিং, শুধু ছোট্ট মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে গলায় দড়িটা দিতে পারেননি, ঘুমের ওষুধগুলো বের করেও ঢুকিয়ে রেখেছেন ড্রয়ারে।

লেখকদের জীবনটা এমনই হয়। জীবনানন্দ দাশকেই দেখুন। এই মানুষটাকেও প্রকাশকের কাছে একরকম ভিক্ষে চেয়ে চিঠি লিখতে হয়েছে। যে চিঠির প্রতিটা হরফে মিশে আছে অপমানের গ্লানি, আর বেদনার্ত এক জীবনের আখ্যান। যে জীবন কবি জীবনানন্দের, তার সাথে কোনো লেখকের যেন হয় না কো দেখা...

এই দেশের ছেলেপুলেরা ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক, পাইলট হোক, অক্সফোর্ড-হাভার্ডে পড়ুক, গুগল-ফেসবুক-নাসায় কাজ করার স্বপ্ন দেখুক। শুধু কেউ যেন জীবনানন্দ হতে না চায়, কেউ যাতে লেখক হবার স্বপ্ন বুকে পুষে না রাখে। লেখকের জীবন বড় কষ্টের, বড় বেদনার। পাঁচশো পৃষ্ঠার উপন্যাস বা চল্লিশ পংক্তির কবিতা থেকে দু-চার লাইন টেনে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়ে সেই বেদনার খোঁজ পাওয়া সম্ভব নয়!

জীবনান্দ দাশের সেই চিঠি

জীবনবাবুকে সেই প্রকাশক টাকাটা ধার দিয়েছিলেন কিনা জানিনা। কিন্ত নিজের চোখে দেখেছি, এক বইমেলা শেষ হয়ে পরের বইমেলা চলে এসেছে, কত তরুণ লেখক বছর ধরে রয়্যালিটির সামান্য ক'টা টাকার জন্যে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন! বই বিক্রি শেষ হলে প্রকাশক মহোদয়টি লেখককে চেনার দরকারটাও বোধ করেন না আর, এটাই বোধহয় তাদের ব্যবসায়িক পলিসি!

শুধু বাংলাদেশ কেন, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা উপমহাদেশ, লেখক হওয়াটাকে সিরিয়াস প্রফেশন হিসেবে নেয়ার সুযোগ খুব কম। সবাই হুমায়ূন আহমেদ হতে পারেন না, সবাই জে কে রাওলিং হবার কপাল নিয়ে জন্ম নেন না। বেশিরভাগ লেখকই শেকসপিয়রের মতো আড়ালে থেকে যান, জীবনানন্দের মতো অভাবে অনটনে দিন কাটান, কেউবা টলস্টয়ের মতো মরে যান, যে মৃত্যুর খোঁজটাও কেউ হয়তো রাখে না!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা