শান্তি চুক্তি করলো যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান। ১৮ বছর ৪ মাস ৩ সপ্তাহ ১ দিন যুদ্ধের পর গত শনিবার কাতারের দোহায় বিলাসবহুল শেরাটন হোটেলে চুক্তির নামে যা হলো, তাতে এটা ইতিহাসের অন্যতম সেরা কৌতুকের জায়গায় স্থান করে নিলো।     

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলা হয়। মার্কিন সরকার ঐ হামলার জন্য আফগানিস্তানের তালেবানকে দায়ী করে দেশটিতে সামরিক আগ্রাসন চালায়। ব্রিটিশ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে চালানো হামলায় কয়েক দিনের মধ্যেই তৎকালীন তালেবান সরকারের পতন হলেও ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী গোটা আফগানিস্তানের দখল নিতে পারেনি। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডাব্লিউ বুশ বলেছিলেন, যারা আমেরিকাকে সাপোর্ট করবে না, তারাই তাদের শত্রু।

মানে আমেরিকার বিরুদ্ধে যাওয়া যাবে না কোনোভাবেই। তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকাকে সমর্থন না দিলেই সে সন্ত্রাসী, আমেরিকার শত্রু- এই মনোভাবে তিনি যখন যুদ্ধ বাঁধালেন, তখন তার বিপক্ষে কথা বলার সাহস কেউ পেলো না। জাতিসংঘ পর্যন্ত শিশু বাচ্চার মতো মুখে আঙুল দিয়ে চুপচাপ বসে ছিলো। এই সুযোগে জুনিয়র বুশ তার জন্মদাতার মতোই দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আফগানিস্তান হয়ে গেলো আমেরিকার স্টেজ, পাকিস্তান হলো পাপেট। সবাই চেয়ে দেখলো আমেরিকার তান্ডব। একটা দেশকে যতভাবে তছনছ করা যায় করলেন তিনি। বৃষ্টির মতো বোমা বর্ষণ হতে লাগলো আফগান অঞ্চলে। শিশু, নারী, অসহায় কেউ বাদ গেলো না এই হত্যাযজ্ঞ থেকে।

জঙ্গিবাদ- এই ছোট্ট একটা শব্দ দিয়েই শুধুমাত্র আস্ত দেশ নয়, বরং পুরো একটা ধর্মকে ব্ল্যাকলিস্টেড করে দিলো আমেরিকা। ঢালাওভাবে মুসলমানেরা হয়ে গেলো সন্ত্রাসী। আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখলাম কীভাবে আমেরিকা আমাদের বোকা বানালো। এই বোকা বানানোর বয়সটাও যখন ১৮ পেরিয়ে গেলো, তখন তারা আসলো শান্তি চুক্তি নিয়ে। পুরো বিশ্বটা যদি হয় দাবার বোর্ড, আমেরিকা তার সেরা খেলোয়াড়।

আমেরিকান-তালেবান ভাই ভাই 

যুদ্ধবাজ আমেরিকার মতে, ২০০১ সালে আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দশ লাখ কোটি মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে তাদের। এই অর্থ দিয়ে কত কিছু করা যেত সে হিসেব আর না-ই বা করি। অথচ এত অর্থ খরচ করে হলোটা কী? যুদ্ধ? যুদ্ধ হয় দুই পক্ষের মধ্যে। তারা যেটা করেছে সেটাকে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার বলে। বাংলা সিনেমার চৌধুরি সাহেবেরা গরীব খেটে খাওয়া মানুষদের ওপর এই অত্যাচারই চালিয়ে এসেছে।

কিন্তু এতে পাকিস্তানে যে ব্যয় হয়েছে তার হিসাব ধরা হয়নি যাকে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানোর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। প্রশ্ন জাগতেই পারে, এতো অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে? বেশিরভাগ অর্থই ব্যয় করা হয়েছে তথাকথিত জঙ্গি-বিরোধী অভিযানে এবং মার্কিন সেনাদের জন্য বিভিন্ন ব্যয় যেমন খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা সেবা, বিশেষ ভাতা, পুননির্মাণ প্রচেষ্টায় এবং অন্যান্য বাড়তি সুবিধার যোগান দিতে।    

আফগানিস্তানে থাকা জাতিসংঘের সংস্থা ইউনাইটেড নেশন অ্যাসিসটেন্স মিশন ইন আফগানিস্তান বা উনামা বলছে, ২০০৯ সালে তারা হিসাব শুরু করার পর এ পর্যন্ত আফগানিস্তানের এক লাখেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছে, এর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। গড়ে সেখানে প্রতিদিন ৩০-৪০ জন নিহত হয়। এর মধ্যে সবাই কি জঙ্গি তালেবান ছিলো? নিশ্চয়ই না। পক্ষান্তরে আমেরিকার কয়জন সৈন্য মারা গিয়েছে জানেন? মাত্র আড়াই হাজার। আর তাদের মিত্রবাহিনী মিলিয়ে সংখ্যাটা পাঁচ হাজারও ছাড়ায় না। এই হচ্ছে বাস্তবতা।

এতো কিছু করেও মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানের পুরো দখল নিতে পারেনি। এই মার্কিন-তালেবান যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হলো আফগানিস্তান ও তার নিরীহ মানুষদের। যাদের পক্ষে কেউ কোনদিন টুঁ শব্দও করবে না। গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে আফগানিস্তান দখল করতে এসেছিলো তিন তিনটা পরাশক্তি। প্রথমে এসেছিলো দ্য মাইটি ব্রিটিশ এম্পায়ার, তারপর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সর্বশেষ জঙ্গিদের বন্ধু আমেরিকা। এদের মধ্যে কেউই আফগানিস্তান পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে চলে গিয়েছে। ঐ একই কাজ আমেরিকাও করলো।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রভাব আমেরিকার ওপর আদৌ পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। নইলে সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতো না। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনও একই কায়দায় মার্কিনবাহিনীকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। সেটাও নির্বাচনের আগ দিয়ে, ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই কাজ করলেন। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৪ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়তে হবে মার্কিন ও ন্যাটো সেনাদের। আমেরিকার নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। এটা হয়তো তারই পরবর্তী নির্বাচনের ট্রাম্পকার্ড। ১৯৯৬ সালে কাবুল দখল করে পাঁচ বছর আফগানিস্তান শাসন করলেও, তালেবান সরকার পশ্চিমাদের স্বীকৃতি পায়নি। আমেরিকার বদৌলতে ‘অচ্ছুৎ’ তালেবান এখন স্বীকৃতি শক্তি। আর আমেরিকান-তালেবান এখন ভাই ভাই। বোঝা গেছে ব্যাপারটা?  

 

 

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা