এখানে মজাটা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বলা হলেও এখানে আসলে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই পাঠদান সেবা দেয়া হবে। অর্থাৎ, ক্লাস ওয়ান থেকে একদম বিশ্ববিদ্যালয় অবধি পড়তে পারবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন। শুধু গ্র‍্যাজুয়েশন নয়, তারা চাইলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে পারবেন, পিএইচডি ডিগ্রিও নিতে পারবেন!

এই মানুষদের কেউ ডাকেন হিজড়া বলে, কেউ বলেন কমনজেন্ডার, কেউ কেউ বলেন হাফ লেডিস, কেউ বলেন নপুংশক, কেউ বলেন বৃহন্নলা ইত্যাদি। এই মানুষগুলো সমাজে থেকেও কেমন যেন মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্নই রয়ে যান সবসময়। তাদেরও আমাদের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করবার অধিকার, উচ্চশিক্ষা নেয়ার অধিকার, চাকরি, ভোটাধিকার সহ সব অধিকার পাওয়ার হক আছে - এই ব্যাপারটাই অনেক দেশে এখনো প্রতিষ্ঠিত না। বিশেষত আমাদের উপমহাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি অবহেলার ছাপ এমনিই টের পাওয়া যায়, সামাজিক জীবনব্যবস্থায় এই মানুষদের অবস্থান এবং তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে...

বেঁচে থাকার দাবি

তবে, দিনে দিনে ট্যাবু ভাঙছে। দিনে দিনে প্রচলিত নিয়মধারা, সামাজিক আচারে বিচারে পরিবর্তন আসছে। মানসিকতার পরিবর্তন টের পাওয়া যায় যখন এরকম একটি মহৎ উদ্যোগের খবর শুনতে পাই। 

ঘটনাটি ভারতের উত্তরপ্রদেশে। যদিও এই উত্তরপ্রদেশ সাম্প্রতিকালে বেশ বিতর্কিতই। বিশেষত, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে উত্তপ্ত এই অঞ্চল। তাছাড়া এই রাজ্যেই অযোধ্যার রাম মন্দির নির্মাণ নিয়েই বিশাল বিতর্ক হয়েছে কিছুদিন আগে। আবার তিনতালাক প্রাপ্তদের বার্ষিক ছয় হাজার টাকা পেনশন দেয়ার ঘোষণা দিয়েও আলোচিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকার। সব মিলিয়ে বিতর্ক, আলোচনা যেন উত্তরপ্রদেশের নিয়মিত ঘটনাই এই মুহুর্তে। 

এবার নতুন করে উত্তরপ্রদেশে যোগী সরকার ঘোষণা দিলো, ট্রান্সজেন্ডারদের জন্যে হবে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ের হিসেবে এটিকে একটি সাহসী সিদ্ধান্তই বলতে হয়। ভারতেও থার্ড জেন্ডারদের প্রতি মানুষের উদার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় সর্বাংশে দেখা যায় না। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের এখানে অবহেলিত হতে হয় এরকমটা নিয়মিত চিত্রই। তাই, তাদেরকে শিক্ষার সুযোগ করে দেয়ার জন্যে আস্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য করার সিদ্ধান্ত বেশ যুগান্তকারীই বলতে হয়। এই সিদ্ধান্ত হয়ত এই মানুষগুলোকে সমাজে মূল স্রোতে মিশতে সাহায্য করবে। তারা স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে অস্বস্তি বোধ করবেন না, অন্যরাও যারা নিজেদের 'স্বাভাবিক' ভাবে তারা সত্যিকার অর্থে দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা শিখে স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। ইউটোপিয়ান স্বপ্ন মনে হচ্ছে? হতে পারে। কিন্তু, আপাতত ট্রান্সজেন্ডারদের জন্যে একটি গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা শুনে মনে হচ্ছে এটার প্রভাব সমাজেও পড়বে এবং তা ইতিবাচক অর্থেই। 

ভারতে ট্রান্সজেন্ডারদের একটি আন্দোলন   

যাইহোক, এই বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম এবছরই শুরু হতে যাচ্ছে, সম্ভবত ফেব্রুয়ারী, মার্চে প্রথম ব্যাচ পড়তে শুরু করবে। এখানে মজাটা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় বলা হলেও এখানে আসলে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই পাঠদান সেবা দেয়া হবে। অর্থাৎ, ক্লাস ওয়ান থেকে একদম বিশ্ববিদ্যালয় অবধি পড়তে পারবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন। শুধু গ্র‍্যাজুয়েশন নয়, তারা চাইলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে পারবেন, পিএইচডি ডিগ্রিও নিতে পারবেন!

বাংলাদেশে কদিন আগে দেখলাম হরিজন/দলিত সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না। তারা 'নিম্ন' বা সমাজের তথাকথিত ভাষায় 'অচ্ছুৎ' বলে তাদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা হয়েছে। আমাদের দেশে তৃতীয় লিঙ্গের কাউকেও সে অর্থে খুব বেশিদূর শিক্ষায় অংশ নিতে দেখি না কিংবা অংশ নিতে দেয়া হয় না। আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে ছিল একটু অন্যরকম করে কথা বলতো। বাকিরা তাকে নিয়ে খুব মজা করতো, কেউ কেউ তাকে 'হাফ লেডিস' ডাকতো, খুব মানসিকভাবে হয়ত ছেলেটা বিপর্যস্ত হয়েছিল। তা আমরা কে জানি, জানার চেষ্টা করেছি! 

এরকমটা হয়, কারণ আমাদের মেন্টাল ব্লক আছে। আমরা সে সমাজে বেড়ে উঠেছি এখানে দৃষ্টিভঙ্গি খুব সীমাবদ্ধ, চারধারের দেয়াল বেধ করে মুক্ত ভাবনা ছড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ এখানে কম, দৃষ্টিভঙ্গি উদার হবে কি করে...

বদলাবে একদিন এই চিত্র

 

উত্তরপ্রদেশের ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় তাই উপমহাদেশের জন্যে এক মাইলস্টোন, শেকলভাঙ্গা পদক্ষেপ, মেন্টাল ব্লক ছুটানোর প্রথম বলিষ্ঠ ধাপ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র‍্যাজুয়েটরাই যখন ছড়িয়ে পড়বেন চারদিকে, আলো ছড়াবেন আপন শক্তিতে, এগিয়ে চলার পথে তৈরি হবে দুরন্ত কিছু গল্প, যা হবে প্রথা ভাঙ্গার একেকটা স্মারক চিহ্ন!

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা