ছোট্ট সন্তান নিজেকে বুঝার আগে বুঝতে শেখে সে কতটা অথর্ব। তার জন্য মা-বাবা কত কি করেছে, আর বিনিময়ে সে দুটো মার্ক্সও আনতে পারেনি। কত ছোট সে!

অর্ণব ভট্টাচার্য: শিরোনামটা লিখে চমকে উঠলাম, নিজেও একবার নিজেকে প্রশ্ন করলাম- আসলেই কি আমি এটাই লিখছি? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রচলিত সত্যের বাইরে গিয়ে আমাকে আজ বেশ কিছু মা-বাবাদের নিয়ে এমন কষ্টকর বিশেষণই ব্যবহার করতে হচ্ছে। খুব খুশি হতাম যদি এর পুরোটা মিথ্যে হত। যারা আজ এই লেখার সাথে কোন প্রকার মিল পাবেন না, তারা বুঝবেন সত্যিই আপনি অনেক অনেক ভাগ্যবান। 

১। শুরুটা করি পড়াশুনা দিয়ে। অনেকদিন আগে জাফর ইকবাল একটা সুন্দর লেখা লিখেছিলেন- ‘অভিভাবক যখন অভিশাপ’। এটা পড়ে আমি যেন আমার শৈশবের আশেপাশের মা-বাবার একটা বাস্তব চিত্র দেখতে পেয়েছি। আমি ভগবানের কাছে চিরকৃতজ্ঞ এমন একজন মা-বাবা পেয়েছি যাদের কাছে ফলাফলটাই সব না।

আশেপাশ দেখে আমার বারবার মনে হয়েছে যত না ছেলেমেয়েকে অধিকতর ভালো শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা তার চেয়ে যেন নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা ছেলেমেয়েদের দিয়ে পূরণ করানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অমুক তমুকের চেয়ে ২ মার্ক্স বেশি পেয়েছে, ব্যস শুরু হল ছেলেমেয়ের সাথে খিস্তি খেউর। এই খিস্তি খেউরের একটা বড় অংশ থাকে সন্তানকে ছোট করা, তাকে অপমান করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া। ছোট্ট সন্তান নিজেকে বুঝার আগে বুঝতে শেখে সে কতটা অথর্ব। তার জন্য মা-বাবা কত কি করেছে আর বিনিময়ে সে দুটো মার্ক্সও আনতে পারেনি। কত ছোট সে! 

এই যে হীনম্মন্যতা শেকড় গেঁড়ে বসলো, দিনকে দিন এই শেকড় পুষ্টি পাবে, আশেপাশে শাখা প্রশাখার বিস্তার ছড়াবে। একসময় জন্ম নেবে আত্মগ্লানির বটবৃক্ষ। আমার মামাত ভাই, বয়স সাত-আট, তার কাছেই শোনা যে কোচিঙে কম নম্বর পাওয়ায় এক বাবা তার সন্তানকে সকল অভিভাবকের সামনে কানে ধরে উঠ-বস করিয়েছেন। আমি যেন চোখের সামনে দেখলাম একটা বাচ্চা ছেলের মনটাকে গলাটিপে মেরে ফেলা হচ্ছে আর অবুঝ ছেলেটা বুঝতেও পারছে না কি হচ্ছে। দেহে খোস, দাদ, পাঁচরা হলে বাইরে থেকে দেখা যায়, প্রয়োজন মত ওষুধ দেয়া যায়। কিন্তু মনের ভেতর যখন অসম্মানের মহীরুহ জন্মায় তার খবর কি কেউ জানে? 

স্বয়ং মা-বাবার কি ধারণা আছে তার ছেলেমেয়েরা নিজেকে কত ছোট মনে করে? আজ যত বড় হয়, পাল্লা দিয়ে বাড়ে আত্মবিশ্বাসহীনতা। কেন একজন ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্র বুঝতে পারে না কিভাবে সামনে এগোতে হবে? নিজের কি সমস্যা সে এটাও জানে না। কেন সর্বত্র মোটিভেশন লেকচারে আশ্রয় খোঁজে কিন্তু একবারও নিজের বাবা-মাকে গিয়ে বলতে পারে না তার ভালো লাগছে না? প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কেউ খুঁজেছেন?

আমি উলটো প্রশ্ন করি, কেন একটা ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে আমাদের দেশে নিজে আত্মবিশ্বাসের সাথে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? ইন্টার পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত সে নিজে নিয়েছে? খোঁজ নিলে দেখা যাবে সে যে ভার্সিটি বা সাবজেক্টে পড়ছে সেটাও কোনভাবে তার বাবা-মার ঠিক করে দেয়া। আমি এমন বহু বহুজনকে দেখেছি নিজের পছন্দসই সাবজেক্টে পড়তে পারেনি শুধু মাত্র পরিবার চায়নি বলে। আমার বন্ধুর চূড়ান্ত শখ ছিল ডাক্তার হবে। ব্যাপারটা এমন যে সারাদিন জীববিজ্ঞান পড়ত, অসাধারণ ছবি আঁকত। সে প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় পেল না। মা-বাবা ভর্তি করল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে আমাদের ব্যাচের অনেকের মেডিকেলে চান্স হল, অথচ ও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগই পেল না পরিবার থেকে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম একজন প্যাশনেট ছাত্রের আগ্রহের চূড়ান্ত মৃত্যু। 

অবাক করা হলেও সত্য, আমি এমনও ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে দেখেছি যে কি শার্ট কিনবে তা তার মা ঠিক করে দেন! এভাবে গণ্ডিবদ্ধভাবে মানুষ যে হয়েছে, বাইরের জগতে আসলে যে সে খেই হারিয়ে ফেলবে তা কি খুব অবাক কিছু? মা বাবা হয়ত এইসব কিছুই করছেন বাড়তি ভালবাসা থেকে কিন্তু এই অনধিকার ভালবাসা যে একেবারেই বিষাক্ত। সবচেয়ে ভয়ংকর কথা- এই বিষের কোন ওষুধ নাই! 

২। পরিবারের সাথে আমি সন্তানের কথোপকথনের জায়গাটা খুব আগ্রহ নিয়ে শোনার চেষ্টা করি যখন কেউ এই বিষয়ে আমাকে বলে। একটা কথা স্বীকার করার উপায় নাই যে হালের মা-বাবারা সন্তানের একটুকু ভালোর জন্য অনেক অর্থ খরচ করতে কার্পণ্য করেন না। সেটা পড়াশোনার ক্ষেত্রেই হোক আবার দামী ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন কিনে দেয়াই হোক। কিন্তু অবাক করা বিষয় হল এই মা-বাবারাই অধিকাংশ মান-অভিমান পর্যায়ে সন্তানকে টাকার খোঁটা দিতে দ্বিধা করেন না। আমি পুরো বিষয়টাতে কেমন যেন অস্বস্তিজনক কৌতুক অনুভব করি। এখানে সন্তানকে একরকম ব্যবসায়ী প্রোজেক্ট হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এখানে মুল উদ্দেশ্য কখনই টাকা না, মুল উদ্দেশ্য কথা শোনানো, ছোট করা। ব্যক্তিগতভাবে আমি যখনই এটা শুনি তখন অসুস্থ বোধ করি। 

আমার এক অতিপরিচিত পরিবারের কাহিনী বলার লোভ সামলাতে পারছি না। মেয়ে ঢাকায় যেয়ে পড়বে এবং সেটা যৌক্তিকও, এমন বিষয়ে মা বেঁকে বসলেন এবং কথায় কথায় মেয়েকে টাকার খোঁটা দিতে লাগলেন। সারাজীবনে তার পেছনে কত কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যয় হচ্ছে সেটা নিয়ে নোংরা মন্তব্য করতে লাগলেন। আবার এই একই মা মেয়েকে যেকোনো উৎসবে অত্যন্ত দামী একাধিক জামা কাপড় কিনে দেন যার একেকটির খরচ দিয়ে ঢাকায় আরামসে মাসখানেক চলা যাবে! এখান থেকেই বুঝা যায় টাকা কখনই মুল ইস্যু না। মুল ইস্যু হল মতের অমিল হওয়ায় মেয়ের বিরুদ্ধে মাকে জিততে হবে, আর এই জেতায় টাকার খোঁটার চেয়ে বড় কি আছে হেনস্থা করার!

আমার বিভিন্নজনের অভিজ্ঞতা শুনে মনে হয়েছে অনেক মা-বাবাই সন্তানের সাথে মতের অমিল মেনে নিতে পারেন না। এখানে কেমন যেন একটা জো-হুকুম সম্পর্ক। আমার অত্যন্ত সৌভাগ্য এমন একটা পারিবারিক পরিবেশ পেয়েছি যেখানে রাজনীতি, ধর্ম, ব্যক্তিগত আলাপ সব কিছুতেই বিরুদ্ধমত দেয়ার সুযোগ আছে, সেটা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা-সমালোচনা করার পরিবেশ আছে। আর সেই আলোচনা শেষেও নিজ নিজ মত রাখবার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। দুঃখের বিষয় যে, অনেক ক্ষেত্রেই এমন আচরণ বিরল। তাই তো ডিসকাশনের পরিবর্তে চলে আসে টাকার খোঁটা, ব্যক্তিগত-পারিবারিক নানান বিষয় নিয়ে আঘাত করা।

অথচ বাস্তবতা হল দুইজন মানুষের মতের অমিল হবেই, এটাই যে কোন সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ। দুইজন মানুষ কক্ষনো সব বিষয়ে এগ্রি করতে পারে না। আর এই মতের অমিল নিরসনের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আলোচনা। এভাবেই মানুষ পরিপক্ব হয়, কথা বলা শেখে, যুক্তি পাল্টা যুক্তি আয়ত্ত করে। কিন্তু এই আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে নিজের মত চাপিয়ে দেয়া এবং নানান বস্তুগত বিষয় এনে অন্যকে হেনস্থা করার প্রয়াস প্রচণ্ড রকমের কুৎসিত। এটা বাজারের ঝগড়ায় মানায়, নিজ পরিবারের সাথে নয়। 

আরেকটা কুৎসিত রূপ দেখা যায় বিয়ের বাজারে। আমার খুব ক্লোজ এক জুনিয়রের বিয়ের আয়োজন শেষ দিকে এসে ভেস্তে যায় কারণ মায়ের মনে হয়েছে উনি শ্বশুরবাড়ি থেকে ‘পর্যাপ্ত’ যৌতুক আনতে পারবেন না! বলাই বাহুল্য, আমার সেই ভুক্তভোগী ছাত্রটি এখন অব্দি মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে নি। এছাড়াও আশেপাশে বিভিন্ন সময় বিয়ে নিয়ে এমন অনেক অশ্লীল কার্যকলাপ দেখেছি তাতে ‘বাবা-মা সবকিছু সন্তানের ভালোর জন্যই করেন’ এই অদ্ভুত সুন্দর কথাটা কতটা শিশুতোষ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এখানে অনেক মা-বাবার ইনসিকিউরিটির বলি সন্তানের আবেগ, তাদের ব্যক্তিগত হিসেব নিকেশে হারিয়ে যায় সন্তানের প্রতি ভালবাসা। অনেক অনেক কিছুর আঁক কষা হয়, খালি সন্তান ভালো থাকবে কিনা এটাই গৌণ হয়ে পড়ে! এক নিদারুণ হতাশা।

৩। আমি অনেক ভাববার চেষ্টা করেছি এমনটা কেন হয়। ঠিক সমস্যার জায়গাটা কোথায়। আমার যেটা মনে হয়েছে সন্তান যত পরিপক্ব হয়, মা-বাবার সাথে তত মানসিক দুরুত্ব তৈরি হয়। সন্তান যে একটা আলাদা অস্তিত্ব, তার একটা আলাদা ভালো লাগা আছে, পছন্দ আছে, মানসিকতা আছে, সর্বোপরি তার একটা ব্যক্তিত্ব আছে- এটা গোটা বিষয়টাই ভুলে যায় অনেক মা-বাবা। তাই মা-বাবার ইচ্ছে আর সন্তানের ইচ্ছে এই দুইয়ের মাঝে বিশাল ফারাক হয়। আর ধীরে ধীরে এই ফারাক থেকে আসে মতের বিরোধ, সেই থেকে মতামত চাপিয়ে দেয়া। সন্তান ভুল করতে ভয় পায় কারণ এই ভুলের কোন আশ্রয় তাকে পরিবার দিবে না, উলটো কথা শোনাবে। গাইডেন্স শব্দটার সাথে আমাদের এখনও সেই অর্থে পরিচয় ঘটে নি। তাই আমরা বুঝি না, দামী রেস্টুরেন্টে খাওয়া, জামা কাপড়ের চেয়ে মানসিকভাবে পাশে থাকা, সবসময়ের জন্য আশ্রয় হওয়া হাজার হাজার গুণ বেশি দরকার।

একবার এক ছাত্র আমার রুমে এসে অনেকক্ষণ ধরে তার গোটা সমস্যার কথা বলল। বলা বাহুল্য, এসব ক্ষেত্রে প্রায়শই আমার ভূমিকা থাকে কথাগুলো শোনা, ক্ষেত্রবিশেষে সাহস দেয়া। যেহেতু আমি প্রফেশনাল না, পারতপক্ষে কোন সমাধান দেয়ার ধারে কাছেও যাই না। তো সেই ছাত্রটি সব বলবার পরে রাতে আমাকে মেসেজ করে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল- স্যার এই কথাগুলো আজ পর্যন্ত আমার পরিবারের কাউকে বলতে পারিনি। পুরো বিষয়টাতে আমি এক আজব দুঃখ অনুভব করলাম। একসাথে একই ছাদের নিচে থাকা, অথচ মানসিকভাবে একজন থেকে কত ক্রোশ দূরে আরেকজন।

৪। প্রত্যেক মা দিবসে, বাবা দিবসে হোমপেজ ভরে ওঠে প্রত্যেকের মা-বাবার সাথের ছবিতে। প্রতিটা ছবির একটা কমন বৈশিষ্ট্য- চোখেমুখে পরিতৃপ্তি। বারবার একটা লেখা পড়ি- পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু খারাপ মা-বাবা নেই! কিন্তু বাস্তবতা হল আর সব খারাপের মতই পৃথিবীতে অনেক বিষাক্ত মা-বাবা আছেন যারা বুঝে বা না বুঝে সন্তানের বিকাশে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ান। অথচ খুব সহজেই বাবা মায়ের পক্ষে সম্ভব সন্তানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হওয়া, তার প্রথম ও প্রধান শিক্ষক হয়ে চরিত্রের ভিত্তি তৈরি করা। পরিবার যার সর্বোৎকৃষ্ট মানসিক আশ্রয় সে কখনও লোকে কি বলল এই ভয়ে থাকবে না। সে তার বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাবে। আর যে আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আজ হোক, কাল হোক, সফল সে হবেই।

শেষ করি নিজের কথা দিয়ে। কলেজের টেস্টে রেজাল্ট বাড়াবাড়ি রকম খারাপ হল। রেজাল্ট নিয়ে এসে বেজার মুখে বললাম- মা খুব খারাপ হইছে রেজাল্ট। মা সান্ত্বনা দিলেন। ভুল গুলো শুধরানোর চেষ্টা করলাম। এইচএসসি পরীক্ষা হল, সেখানেও কিছুটা খারাপ হল। কিন্তু এই গোটা সময়ে আমার মা-বাবার একটাই কথা। তুমি তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা কর। কোন ভয় নেই। যা হবার হবে। এখনও যে কোন ঝামেলায় আমার মাথায় এই একটা জিনিসই ঘুরে- কোন ভয় নেই। যা হবার হবে। আপনার সন্তানও কি এমন ভয়হীনভাবে এগিয়ে যেতে পারে? যদি না পারে, তবেই আজ হতেই শুরু করুন না, ভয়হীন পথচলা... 

লেখক- অর্ণব ভট্টাচার্য্য, অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বুয়েট।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা