কমিক এডাপ্টেড সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সে, দ্যা ডার্ক নাইট এমনই এক স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে যা বেঞ্চমার্ক হিসেবে গণ্য করা হয়। সেটা শুধু কমিক ফ্যান হিসেবেই নয়, বরং একজন মুভি ফ্যানাটিক হিসেবে স্বীকার করতেই হয়।

নন-ডায়েজেটিক ব্যাকরাউন্ড স্কোর। ব্রেক-আউটরত দুজন ক্লাউনকে মিডশটে দিখন্ডিত করে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি। পেছন থেকে তার বাম হাতে দৃশ্যমান মুখোশ, মুখোশটিতে জুম ইন, রহস্যময় এক ক্লাউনের অবয়ব। ফোকাস করে রুপকার্থে সেটার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা। এরই মাঝে তার সামনে একটি কালো গাড়ির হার্ড-ব্রেক। এবং ছুটে চলা। অতঃপর, মাত্র পাঁচ মিনিট দৈর্ঘ্যের ব্যাংক ডাকাতি। যা ইতিহাসের যেকোনো ডাকাতিকে লজ্জায় ফেলতে বাধ্য। মুখোশ খুলতে খুলতে সেই ঠাট্টাবাজের বলে ওঠা, Whatever doesn't kill you, Simply makes you...'Stranger'; জন্ম নিলো এক অনন্য লেগাসি!

বলছিলাম ক্রিষ্টোফার নোলানের ব্যাটম্যান ট্রিলজির দ্বিতীয় ফিচার লেন্থ দ্যা ডার্ক নাইটের কথা। প্রথম কোনো ব্যাটম্যান মুভি যার টাইটেলে স্বয়ং ব্যাটম্যানই নেই। কমিকবুক এডাপ্টেশনের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র বলা হয় এই মুভিকে। যেখানে আমার নিজস্ব মত অনুযায়ী, ইহা কোনো সহীহ এডাপ্টেশন নহে। নোলান সাহেব খুউব স্মুদলি কমিকবুক থেকে নিজের মতো করে সেল্যুলয়েডে সাবমার্জ করেছেন, তাই এখানে ডিসি কমিক্সকে ছাপিয়ে নোলানীয় নূরানী তেলেসমাতি প্রকট। ক্যালকুলেটেড রিস্কও বলা চলে; ফলাফলঃ রটেন টমাটজে এখনো ফ্রেশনেস ৯৪%, আইএমডিবি সেরা আড়াইশো চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান চতুর্থ, মেটাক্রিটিকে স্কোর ৮২ এবং বক্সঅফিসে আয় ১ বিলিয়ন ইউএস ডলারেরও বেশি; যা এই মুভিটিকে সর্বকালের সেরা ব্যবসাসফলের তালিকায় স্থান করে দিয়েছে।

চলচ্চিত্রের মেরুদন্ড চিত্রনাট্য। এখানেই বাজিমাত করেছেন নোলান ভাতৃদ্বয়। ডিসি কমিক ইউনিভার্স থেকে ম্যাটেরিয়াল নিয়ে শার্প সিনেম্যাটিক এজ দিয়েছেন ঠিক লোহা গলিয়ে সোর্ড বানানোর মতো করে। এবং সিনেমায় ব্যবহৃত ডায়লগসমূহ যেনো গণিতের সূত্রের মতোই কাজ করেছে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। পরিচালনা, সম্পাদনা কিংবা আবহসঙ্গীতের টপ নচ পারফর্মেন্সের সাথে হাড্ডাহাড্ডি পাল্লা দিয়েছে এর দুর্দান্ত কাস্টিং। ৬ ফিট লম্বা সুদর্শন এক ব্যক্তিত্ব, যার উপস্থিতি আলাদা এক আবহ তৈরী করতে সক্ষম। আমেরিকান সাইকো, মেশিনিস্ট কিংবা ইকুলিব্রিয়ামের সংমিশ্রন। মানুষটা বাই বার্থ ব্যাটম্যান, জোর করে প্রমাণ করবার প্রয়োজন পড়েনি; নামটা ব্রুস ওয়েইন কিংবা ক্রিশ্চিয়ান বেল। মরগান ফ্রিম্যানের ঐশ্বরিক কন্ঠ, মাইকেল কেইনের বুদ্ধিদীপ্ত ক্যারেক্টার রোল প্লে। টুফেইসকে আউটস্মার্ট করে দেয়া অ্যারন এখার্ট বা কমিশনার গর্ডনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া গ্যারি ওল্ডম্যান।

যাকে নিয়ে এখন লিখছি, সে ভয়াবহ সিনেমাদাহ ঘটিয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। ২০০৮ এর পর থেকে যিনি জোকারের অর্থই বদলে দিয়েছেন। কাস্টিং প্রসঙ্গে পরিচালক নোলান বলেছিলেন, "Christian Bale has exactly the balance of darkness and light that we were looking for. He could portray both radically different personalities. And there is nobody more passionate than Heath Ledger as the Joker:"

একা একটি মোটেলে ৬ মাস থেকে ক্যারেক্টার স্টাডি করা, নিজের ফেইসে জোকারের মেকআপ করা, আনস্ট্রিপ্টেড ইম্প্রোভাইজেশন, সেলফ শটগুলো নিজেই ডিরেক্ট করা; রীতিমত নোলানের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন চরিত্রটিকে। ফলাফলঃ প্রথম কোনো কমিক চরিত্রের অস্কার জয়। অথচ মুভিটি মুক্তির আগেই তার মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন, "I couldn't stop thinking as a psychopathic, mass-murdering, schizophrenic clown with zero empathy. My body was exhausted and my mind was still going. Prescribed drugs didn't help!''

জোকার চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতাদের মধ্যে ৪ জনই (জ্যাক নিকলসন, হিথ লেজার, জ্যারেড লেটো, হোয়াকিন ফিনিক্স) ফিল্ম ক্যারিয়ারে অস্কারজয়ী হয়েছেন। হিথ এবং হোয়াকিন এর মিলটা হচ্ছে এরা জোকার চরিত্র অভিনয় করে অস্কার জিতেছেন আর বাকী দুইজন অস্কার জিতে এসে জোকার চরিত্র অভিনয় করেছেন। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, জ্যাক নিকলসনের জোকার ভয়েসে টেকনিকাল ডাবিং করেছিলেন জন কার্লো। ১৯ বছর পর, হিথ লেজারের জোকার ভয়েসে যিনি টেকনিকাল ডাবিং করেছিলেন তার নাম আদ্রিয়ানো কার্লো। ঐ জন কার্লো হচ্ছেন এই আদ্রিয়ানো কার্লোর বাবা।

দ্যা ডার্ক নাইট মুভিটি তৎকালীন সর্বোচ্চ প্রযুক্তির আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিলো। সে সময় পুরো দুনিয়ায় আইম্যাক্স ক্যামেরা ছিলো মাত্র ৪টি। যার মধ্যে একটি ক্যামেরা এক্সপ্লোসিভের শুটিং করার সময় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। এক একটি আইম্যাক্স ক্যামেরার মূল্য ছিলো ৫ লাখ ডলারেরও বেশি। মুভিটিতে ব্যবহৃত ব্যাটসু্টও তৎকালীন সর্বাধুনিক নির্মান ছিলো।

দ্য ডার্ক নাইটের একটি দৃশ্য 

হাস্যকর ব্যাপার হলো, এর আগের ব্যাটম্যানের মুভিগুলোতে অড ব্যাটসু্টের কারণে ব্যাটম্যান শরীর না ঘুরিয়ে ঘাড় ঘুরাতে পারতো না। ব্যাটসু্টের আধুনিকায়নের ফলে এ মুভি থেকেই প্রথম কোনো ব্যাটম্যান শরীর না ঘুরিয়ে ঘাড় ঘুরাতে সক্ষম হয়েছে। স্ট্রেঞ্জ বাট ট্রু।

ব্যাটম্যান রাত্রির যাত্রী, তাই রাত ছাড়া তার শিডিউল পাওয়া যায় না। তো ডার্ক নাইটের এক দৃশ্যে ব্রুস ওয়েইন দিনের বেলায় যে ল্যাম্বোরগিনি গাড়িটি নিয়ে বের হন সে মডেলটির নাম হচ্ছে 'Murcielago'; যেটি একটি স্প্যানিশ শব্দ যার ইংরেজী শব্দার্থ হচ্ছে 'Bat'! অর্থাৎ লিটারেলি, ব্যাটম্যান ব্যাটমোবিল নিয়েই বের হয়েছে। এত্ত ক্ষুদ্র ডিটেইলে কাজ করা মানুষটার নাম যে ক্রিষ্টোফার নোলান। এই মানুষটা আবার সিজিআই তেমন একটা পছন্দ করেন না। ফলাফল, হাসপাতাল উড়িয়ে দেবার দৃশ্যে আসলেই আস্ত বিল্ডিং উড়িয়ে দিয়েছেন। আবার টেকনিকালি মিনিয়েচার দিয়েও শ্যুট করেছেন। নোলানের ইনসেপশন মুভির সেট ডিজাইন খেয়াল করে থাকলে তো জানারই কথা লোকটা রিয়ালিষ্টিক দৃশ্যায়নের জন্য কী পরিমান কষ্ট করে থাকেন। সে আলাপ না হয় অন্য আরেকদিন হবে।

কমিক এডাপ্টেড সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সে, দ্যা ডার্ক নাইট এমনই এক স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে যা বেঞ্চমার্ক হিসেবে গণ্য করা হয়। সেটা শুধু কমিক ফ্যান হিসেবেই নয়, বরং একজন মুভি ফ্যানাটিক হিসেবে স্বীকার করতেই হয়। প্রথম কোনো চলচ্চিত্র যেটা দেখে মনে হয়েছিলো, ভালো মানুষটাও ঠিক থাকুক, আবার দুষ্টু লোকটাও ঠিক থাকুক। বিকৌজ, দে কমপ্লিট ইচ আদার।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা