‘‘কোনো অবস্থাতেই শিশুদের সাথে মিথ্যা বলা উচিত নয়। কোনো উপায় না পেয়ে বলতে বাধ্য হয়েছি। এতে যদি কখনো বোমার আঘাতে আমার মেয়েটি মারা যায়, তবে সেটা হাসতে হাসতেই হবে।’’

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের বিদ্রোহী অধ্যুষিত শহর ইদলিব। শহরটি সাক্ষাত মৃত্যুপুরী। সেখানে পপকর্ণের মত বোমা ফুটে চলে সারাদিন। ২০২০ সালের প্রথম দেড় মাসেই ১১ হাজারের বেশি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে সেখানে। এই মৃত্যুপুরী থেকে পালিয়ে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। এমনকি ঐপাশের দেশ তুর্কি বর্ডার বন্ধ করে দিয়েছে। ইদলিবের ওপর চলছে বোমা ঝড়। আপনি যদি ইউটিউবে শুধু ‘ইদলিব সিরিয়া’ লিখে সার্চ দেন তবে ভেসে উঠবে অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ। সেগুলোয় দেখা যাবে করুণ সব দৃশ্য।      

এমনই এক হৃদয়ভাঙা দৃশ্য সম্প্রতি দেশ বিদেশের সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হতে দেখা গেছে। আব্দুল্লাহ আল মোহাম্মদ, এক অসহায় সিরিয়ান পিতা। বাস করেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইদলিব শহরেই। সাথে থাকে তার তিন বছর বয়সী কন্যা সালওয়া। বোমাবর্ষণে শিশু সালওয়া যেন ভয় পেয়ে না যায় সেজন্য বাবা আব্দুল্লাহ অদ্ভুত এক খেলা শুরু করেছেন। বোমার শব্দকে খেলা বানিয়ে মেয়েকে আনন্দ দিচ্ছেন এই সিরিয়ান বাবা। যখন কোনো বোমার শব্দ হয় তিনি মেয়েকে হাসতে শুরু করা শিখিয়েছেন।   

এ ব্যাপারে আল-জাজিরায় পাঠানো এক ভিডিতে আব্দুল্লাহ বলেছেন, ''কোনো অবস্থাতেই শিশুদের সাথে মিথ্যা বলা উচিত নয়। কোনো উপায় না পেয়ে বলতে বাধ্য হয়েছি। এতে যদি কখনো বোমার আঘাতে আমার মেয়েটি মারা যায়, তবে সেটা হাসতে হাসতেই হবে। আমি তাকে বুঝিয়েছি এটা আতশবাজির খেলা। যখনই আওয়াজ হবে হাসতে হবে। এই বোমাবর্ষণে উচ্ছসিত হবার কিছু নেই। আমার সন্তান যেন আতংকিত ও ভীতগ্রস্ত না থাকে এজন্যই এই খেলা। তবুও সে বোমার ভয়ে কাঁপতে থাকে অথচ মুখে তার হাসি।''

আব্দুল্লাহ ও তার মেয়ে সালওয়া

নিজের বাড়ি থেকে বিতারিত আব্দুল্লাহ বাঁচার জন্যই ইদলিবে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন সেখানেই গ্রহবন্দী অবস্থায় দিন পার করছেন। বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই যেখানে শূন্য, মানবাধিকারের কথা বলাটা সেখানে অরণ্যে রোদনের মতই।

লাইফ ইজ বিউটিফুল সিনেমাটি যারা দেখেছেন তারা হয়তো ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন কিভাবে দিন পার করছে এই অসহায় পিতা ও তার সন্তান। সিনেমাটি দেখানো হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান সেনা ক্যাম্পে বন্দী থাকা অবস্থায় কেন্দ্রীয় চরিত্র গুইদো আর শিশু ছেলে জশোয়াকে বোঝায় যে এটি একটি খেলা। এই বন্দী ক্যাম্পটি খেলারই একটি অংশ। সেই নিয়মকানুন মেনে চললেই সে তার মাকে দেখতে পাবে। এখানেই গুইদো আর আব্দুল্লাহ এর নিয়তি একসূত্রে মিলে যায়। 

আমাদের বিছানার পাশে ফোন চার্জ দেবার ব্যবস্থা না থাকলে ঘুম আসে না- মন খারাপ হয়ে যায়, আর এই সিরিয়ান মানুষগুলোকে মাথার ওপর বোমাবর্ষণের আতঙ্ক নিয়ে ঘুমাতে হয়, কাটাতে হয় প্রতিটা দিন-রাত-মূহুর্ত! কী ভয়াবহ অবস্থা সেটা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারবো না। এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের কি-বা করার আছে?


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা