আজকে আমার মা-বাবা-স্বামী সবাই গর্ব করে আমাকে নিয়ে। আমি আর কারো মাথার বোঝা নই। বছরের পর বছর কষ্ট করে যাবার ফল এখন পাচ্ছি। সবার যে ভালোবাসা আর সম্মান আমি পেয়েছি তাতে আমার জীবন ধন্য।

বিয়ের আগে বাবার মেয়ে, বিয়ের পর হয় স্বামীর স্ত্রী। এভাবেই সমাজ পরিচয় করিয়ে দেয় একটি মেয়েকে। এর বাইরে নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে গেলে সাত সমুদ্র তেরো নদী সাঁতরে পার হয়ে আসা লাগে প্রতিটা নারীকে। প্রতিষ্ঠিত ভাই-বোনদের ভিড়ে নিজের পরিচয় তৈরি না করতে পারলে, ব্যর্থতা একটু বেশীই নাড়া দেয়। তার উপর বিবাহিত জীবনের দায়বদ্ধতা, নানা রকম বিধি-নিষেধ, এবং বিয়ের পর চাকরি না করার শর্ত। নিজের কোনো পরিচয় হবে না সেটা ভেবেই মন ভেঙ্গে যায় বারংবার। নিজে কিছু একটা করার তাগিদে সেখান থেকে বহু কষ্টে বেরিয়ে আসা। শ্বশুড়বাড়ি থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করা ছিলো বিভীষিকার মতোন। একটা পর্যায়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেলে স্বামীর সহযোগিতায় আলাদা বাসায় শিফট্ হোন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্যে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসেন। শুরু হয় তার স্পষ্টভাষী জীবনের নতুন পথচলা।

গল্পটা জীবনযুদ্ধে হার না মানা একজন রওনক আশরাফী প্রেমা’র, সফল ও আত্মনির্ভরশীল এক মহিয়সী। মানসিক, পারিবারিক এবং সামাজিক সংকট অতিক্রম করে গড়ে তুলেছেন নিজের অনলাইভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শপিং গ্লোরিষ্ট। জন্ম ১৯৮৮ সালের ২৭ জুন ঢাকায়। বাবা আব্দুর রাজ্জাক খাদেম সরকারী চাকরী করতেন, এখন রিটায়ার্ড। মা রাফিয়া বেগম একজন গৃহিণী। ৪ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোটো প্রেমা পড়াশুনা করেছেন ঢাকার ভিকারুন্নেসা স্কুল এন্ড কলেজ থেকে। গ্র্যাজুয়েশন এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে। গ্র্যাজুয়েশনের সময়েই বিয়ে হয়ে যায় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত রাশেদুন নবীর সাথে। এরপর বন্দী হয়ে যান সংসারের বেড়াজালে। পরিবারের আদুরে মেয়েটির জীবনে নেমে আসে দূর্যোগের ঘনঘটা। থমকে যায় তার জীবন।

২০১৭ সালে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ঝুঁকি নিয়ে শুরু করেন অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান Shopping Glowrist. ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ফেসবুক গ্রুপ আর পেইজের ভিড়ে তৈরি করেছেন নিজস্ব স্বকীয়তা ও বিশ্বস্ততা। ততদিনে অর্জন করে নিয়েছেন স্বামীর আস্থা। থাইল্যান্ড থেকে লেডিস প্রোডাক্ট এনে সেল করা কখনোই সম্ভব হতো না যদি না স্বামীর সাপোর্ট থাকতো। ঘুরে ঘুরে প্রোডাক্ট চিনতেও কিছুটা সময় লেগেছে। এর মাঝে অভিজ্ঞতার অভাবে ঠকতেও হয়েছে। ২০১৮ সালের কর্পোরেট অর্ডার থেকে সাফল্য আসতে শুরু করে। ২০১৯ সালে এসে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকার মতো আয় করেন তিনি। ২০২০ সালে এসে নিজের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানকে আরো বড় পরিসরে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে তৈরি হবে আরো অনেক নারীর কর্মসংস্থান এবং সফলতার গল্প। 

রওনক আশরাফী প্রেমা

রওনক আশরাফী প্রেমার মুখেই শোনা যাক তার গল্পটা, ‘আমার উদ্যোক্তা হওয়া এতটা সহজ ছিলো না। অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজকে আমি এ অবস্থানে। আমার প্রতিষ্ঠান শপিং গ্লোরিস্ট নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে। এটা আমার নিজের সন্তানের মতো। থাইল্যান্ডের গন্ডি পেড়িয়ে চায়না, ইন্ডিয়া, আমেরিকাসহ ১০টি দেশ থেকে ইম্পোর্ট করার ইচ্ছে আছে। আমি মনে করি, মেয়েরা পড়ালেখা করে কারো বাড়ির চাকর হবার জন্য না। তারা প্রত্যেকেই নিজের পায়ে কিছু করে দাঁড়াতে চায়। আজকে আমার মা-বাবা-স্বামী সবাই গর্ব করে আমাকে নিয়ে। আমি আর কারো মাথার বোঝা নই। বছরের পর বছর কষ্ট করে যাবার ফল এখন পাচ্ছি। সবার যে ভালোবাসা আর সম্মান আমি পেয়েছি তাতে আমার জীবন ধন্য।'

তিনি আরো যা বলেছেন তা যেকোনো নারীর জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণামুলক পাথেয়, ‘আমি এখন একজন সুখী মানুষ। আমার বাবা, মা, স্বামী, ভাইবোনদের সহোযোগিতার কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। সাথে এইটুক বলতে চাই, ঘরে বসে থাকবেন না কেউ। কিছু না কিছু করার চেষ্টা করুন। মেয়ে বলে সবার কথা শোনার জন্য বসে থাকবেন না। দরকার হলে নিজের স্বামীকে বোঝান আপনার জন্য কেনো এটা ভালো। নিজের মনে সাহস রাখবেন, দেখবেন যতো কিছু হোক আপনি যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হবেন ইনশাল্লাহ। আল্লাহ্‌র উপর ভরসা রাখুন। আপনি নিরাশ হবেন না। আমি চাই আমার থেকেও আরো ভালো করা নারী উদ্যোক্তা তৈরী হোক সমাজে। এটার জন্য কর্মজীবি নারীদের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি করতে হবে অবশ্যই। এক উদ্যোক্তা আরো একজনকে সাহায্য করে পথ দেখিয়ে দিবে কিভাবে এগিয়ে যাবে। এটাই করা উচিত। এটা মাথায় রাখবেন সবসময়, এই অনলাইনের যুগে আপনি যদি কারো অপকার না করেন, তবে বিশ্বাস রাখতে পারেন আপনার সাথেও ভালো কিছুই হবে। আমার বিশ্বাস থেকে বলেছি।' 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা