‘সন্তানেরা খাবার চায়। তারপর ক্ষুধায় কাঁদতে শুরু করে। আমার কাছে কোনো অর্থ ছিলো না। তখন দেখলাম, একটা দোকান আছে যারা মানুষের মাথার চুল কেনে। আমি সেখানে গিয়ে আমার পুরো মাথার চুল ১৫০ রুপিতে বিক্রি করে দিই।’

‘সন্তানেরা খাবার চায়। তারপর ক্ষুধায় কাঁদতে শুরু করে। আমার কাছে একটা দশ রুপির নোট পর্যন্ত ছিলো না। কেবল কয়েকটি প্লাস্টিকের ঘটিবাটি ছিলো। তারপর হঠাৎ মনে হলো, এমন কিছু কি আছে যা আমি বিক্রী করতে পারি? তখন মনে পড়লো, একটা দোকান আছে যারা মানুষের মাথার চুল কেনে। আমি সেখানে গিয়ে আমার পুরো মাথার চুল ১৫০ রুপিতে বিক্রি করে দিই।’

এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন প্রেমা সেলভাম। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর রাজ্যের সালেম জেলার বাসিন্দা তিনি। তিন সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সুখের সংসার ছিলো তার। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একটি ইটভাটায় কাজ করতেন, যা উপার্জন হতো তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে যেত। সংসারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনার জন্য স্বামী ইটভাটার কাজ ছেড়ে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আড়াই লাখ রুপি ঋণ করলেন ব্যবসার জন্য। তবুও শেষ রক্ষা হলো না। ব্যবসায় লোকসান করে সব হারালেন।

ঋণে জর্জরিত হয়ে হতাশায় ডুবে গেলেন প্রেমার স্বামী। এক পর্যায়ে সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন। তিন সন্তানকে নিয়ে যেন অকুল পাথারে পড়লেন প্রেমা। নিজের করার মতোও কিছু ছিলো না। প্রতিদিন ইটভাটায় কাজ করলে ২০০ রুপি পেতেন। শারীরিক অসুস্থতার জন্য টানা তিন মাস কাজ করতে পারেননি। স্বামীর মতো নিজেও ঋণে জর্জরিত হয় গেলেন। হাত পাতার মতো কেউ বাকি ছিলো না। ক্ষুধার জ্বালায় সন্তানেরা কান্নাকাটি করতে লাগলো। কারো কাছে চেয়েও খাবার পাননি, বিক্রি করার মতোও কিছু ছিলো না। 

প্রার্থনা পূরণ হওয়ার বিনিময়ে অনেক হিন্দু পূণ্যার্থী মন্দিরে তাদের চুল দান করে থাকেন। ব্যবসায়ীরা সেগুলো কিনে নিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে। শুধু ভারতেই নয়, সারা বিশ্বেই মানুষের চুল কেনাবেচা হয় এবং  ভারত শীর্ষ পরচুলা রপ্তানিকারক। সন্তানের কষ্টের চেয়ে মায়ের কাছে নিজের চুল কখনো ই বড় হতে পারে না। তেমনই এক দোকানে নিজের চুল বিক্রি করে দেন প্রেমা। বিনিময়ে ১৫০ রুপি পান। সেই অর্থ দিয়ে তিনি খাবার সংগ্রহ করেন সন্তানদের জন্য।   

একদিনের আহার জোগাড় করে তো আর জীবন চলবে না। পরেরদিন আবারো সেই ক্ষুধার তাগিদ, এবার আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। স্বামীর দেখানো পথেই পা বাড়ালেন। আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। দোকানে গেলেন কীটনাশক জোগাড় করতে। দোকানদার তার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন।

বালা মুরুগানের সাথে প্রেমা ও তার সন্তান 

এদিকে প্রেমার এই অসহায়ত্বের কথা এক ইটভাটার মালিকের কাছ থেকে জানতে পারেন সেটা বালা মুরুগান নামের এক ব্যক্তি। প্রেমার সাথে নিজের প্রাক্তন জীবনের মিল খুঁজে পেলেন তিনি। বালার বয়স যখন ১০ বছর তখন তার মা প্রেমার মতোই অসহায় হয়ে আত্মহ্যতার পথ বেছে নিয়েছিলেন। জীবন সংগ্রাম করে বালা মুরুগান দারিদ্র থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি এখন একটি কম্পিউটার গ্রাফিক্স সেন্টারের মালিক। বালা নিজের জীবনের গল্প শুনিয়ে প্রেমাকে আশার আলো দেখালেন।  তাকে খাবার কেনার জন্য অর্থ দিলেন। অতঃপর, বালা মুরুগান সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেলন প্রেমা সেলভামের দুর্ভাগ্যের কথা। সেখান থেকেই বদলে গেলো গল্প। কয়েকদিনের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার রুপি জোগাড় হয়ে গেলো। 

প্রেমা যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেলেন। নিজের সন্তানদের জন্য খাবার জুটিয়েও ঋণ শোধ করতে লাগলেন। বর্তমানে প্রেমার অনুরোধেই সোশ্যাল মিডিয়াতে তার জন্য তহবিল সংগ্রহ করা বন্ধ আছে। নিজে কাজ করে উপার্জন করতে চায় প্রেমা। সে উপার্জনেই সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি। সন্তানেরা যেন মৌলিক অধিকারগুলো থেকে আর বঞ্চিত না হয়। প্রেমাকে এখনো প্রতি মাসে ৭০০ রুপি পরিশোধ করতে হয় তার পাওনাদারদের। প্রসঙ্গত, তামিলনাডুর সালেম জেলার সরকারি কর্মকর্তারাও প্রেমাকে একটি দুধ বিক্রির ডিলারশিপ স্থাপনে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।  

প্রেমা সেলভামের এই ঘটনা ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। দেশবিদেশের সংবাদপত্রে উঠে এসেছে প্রেমার জীবনগল্প। জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করে সন্তানদের জন্যই বাঁচতে চান প্রেমা। বালা মুরুগানের মতো হৃদয়বান মানুষের জন্যই পৃথিবীটা এখনো টিকে আছে। প্রেমা সেলভামেরা সংগ্রাম করে বেঁচে থাকুক মাথা উঁচু করে। বালা মুরুগানেরা ছড়িয়ে দিক মানবতার বাণী। এভাবেই এগিয়ে চলুক জীবনের গল্পগুলো। ভালোবাসা ও  শুভকামনা নিরন্তর। 

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা