রূপালী পর্দায় তিনি জঘন্য একজন লোক, এমন কোন খারাপ কাজ নেই যেটা তিনি করেন না। অথচ সেই মানুষজটাই বাস্তব জীবনে দেবদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, করোনায় দুর্গত হাজারো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন!

সিনেমায় তিনি খলনায়ক। দুনিয়ার যতো খারাপ কাজ আছে সব করে বেড়ান। খুন, রাহাজানি, মাফিয়াগিরি, নারী পাচার, ড্রাগের ব্যবসা, সব। সেখানে তিনি অত্যাচারী এক প্রতিমূর্তি, সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করা যার কাজ। অথচ বাস্তব জীবনে এই মানুষটাই হাজির হচ্ছেন একদম ভিন্ন এক অবতারে, তিনি গরীব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন যতোটা পারছেন। তিনি সনু সুদ, মুম্বাই এবং দক্ষিণ ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় অভিনেতা। করোনার এই ক্রান্তিকালে তার মানবিক রূপটাই দেখছে গোটা ভারত। 

করোনাভাইরাসের কারণে আচমকা শুরু হওয়া লকডাউনে ভারতের বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়েছিল অভিবাসী শ্রমিকেরা। অভিবাসী বলতে কিন্ত ভীনদেশী নন, হয়তো পশ্চিমবঙ্গ বা বিহারের কোন দিনমজুর নিজের এলাকায় কাজ না পেয়ে দিল্লি বা মুম্বাইতে কাজ করতে গেছে, এদেরকে বলা হয় অভিবাসী শ্রমিক। লকডাউন শুরু হবার পরে এই লোকগুলো পড়েছে সবচেয়ে বিপদে। তাদের হাতে জমানো টাকাপয়সা নেই, কাজ বন্ধ, সরকারী সাহায্যও পাওয়া যাচ্ছে না- সব মিলিয়ে মানবেতর একটা অবস্থা! যেটা ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য। 

সনু সুদ থাকেন মুম্বাইতে। জুহু এলাকায় তার একটা রেস্টুরেন্ট আছে। সেই রেস্টুরেন্টও বন্ধ হয়ে গেছে করোনার কারণে। অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে মহারাষ্ট্রের রাজ্য সরকারের বিশেষ অনুমতি নিয়ে তিনি রেস্টুরেন্ট চালু করলেন, সেখানে রান্না শুরু হলো। তবে বিক্রির জন্যে নয়, অসহায় মানুষগুলোর মুখে বিনামূল্যে খাবার তুলে দেয়ার জন্য। রমজানের শুরু থেকেই প্রতিদিন ২৫ হাজার মানুষের মধ্যে খাবার বিতরন করা হয়েছে তার রেস্টুরেন্ট থেকে, তাও আবার সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেই। 

সিনেমায় তিনি ভিলেন

জুহুর সেই হোটেলে আবাসিক ব্যবস্থাও আছে। সেখানের কামরাগুলো সনু ছেড়ে দিয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য। যারা করোনার বিরুদ্ধে ফ্রন্টলাইন ওয়ারিয়র হিসেবে লড়ছে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন সনু, তাদের বলেছেন, এই লড়াইটাতে আপনারা একা নন, আমরাও আছি।

এসবের কোন প্রচারণা তিনি চালাননি, মানুষের লম্বা লাইন ভীড় দেখে সংবাদকর্মীরাই খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, সনু সুদের এই মহানুভব আচরণের কথা। তবে এখানেই থেমে থাকেননি এই অভিনেতা। যখন দেখেছেন, মাসের পর মাস আসলে এই অভিবাসী শ্রমিকরা এক জায়গায় আটকে থাকতে পারবেন না, তখন তিনি তাদের নিজ নিজ এলাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। হ্যাঁ, তিনি এই মানুষগুলোকে দুইবেলা খাবার দিচ্ছেন, কিন্ত খাবারটাই তো শেষ কথা নয়। 

ভারত সরকার এসব অভিবাসী শ্রমিককে নিজ নিজ এলাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্ত সেটা খুবই স্বল্প পরিসরে। লাখ লাখ অসহায় মানুষ শত শত কিলোমিটার হেঁটে চলেছেন নিজেদের বাড়িতে পৌঁছানোর জন্যে। প্রতিদিনই এসব শ্রমিকদের মৃত্যুর খবর আসছে, কোথাও হয়তো তারা ক্লান্ত শরীর নিয়ে রেললাইনে শুয়েছিলেন, গায়ের ওপর দিয়ে ট্রেন যাওয়ার আগে টেরও পাননি। ছিন্নভিন্ন শরীরগুলো পড়ে ছিল রেললাইনের পাশে। কোথাও আবার আশি বছরের বৃদ্ধা আর চার বছরের শিশু হাঁটছে পাশাপাশি, ক্লান্ত শরীর, পা ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে, তবুও বিরাম নেই। ঘরে পৌঁছুতে হবে। 

এই অসহায়, বিপন্ন মানুষগুলোর বিপদে সনু সুদ বসে থাকতে পারেননি। কর্নাটক থেকে যেসব শ্রমিক এসেছেন মুম্বাইতে, তাদের বড়সড় একটা দল বাড়ির পথে পা বাড়াচ্ছে শুনে তিনি অবাক হয়েছেন। কর্ণাটকের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সনু কাজ করেছেন, মুম্বাই থেকে কর্ণাটকের দূরত্ব সাড়ে ছয়শো কিলোমিটার, এই রাস্তা তারা পাড়ি দেবে কিভাবে, এটা ভেবেই তিনি শিউরে উঠেছেন। তার ওপর এদের মধ্যে আছে নারী, বৃদ্ধ, শিশু- সবাই। 

শ্রমিকদের বিদায় জানাচ্ছেন সনু

শেষমেশ সনু তাদের জন্যে নিজের খরচে ১০টি বাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। রোডস এন্ড হাইওয়েজ ডিপার্টমেন্ট থেকে স্পেশাল পারমিটের ব্যবস্থা করেছেন, যাতে রাস্তায় কোন ঝামেলার মুখে পড়তে না হয়। সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে, কর্ণাটকে গিয়ে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে রাজী হয়েছেন তারা। নিজে উপস্থিত থেকে সনু এই দলটাকে বিদায় জানিয়েছেন। এখন পাঞ্জাব আর উত্তরপ্রদেশে যাদের বাড়ি, তাদের জন্যেও স্পেশাল বাসের ব্যবস্থা করাফ চেষ্টা করছেন। অনুমতি পেলেই আরও হাজারখানেক অভিবাসী শ্রমিক সনুর ভাড়া করা এসব বাসে চড়ে পাড়ি জমাবে বাড়ির পথে। 

ফেসবুকে সনু লিখেছেন-  'আমি যখন দেখি হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিক রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন, তখন মানু্ষ হিসাবে আমার কেমন একটা ঘেন্না জন্ম নেয়। ঘুমোতে পারি না, সারারাত এই এক চিন্তা তাড়া করে বেড়ায়। তাই সারাদিন আমি ওঁদের ফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করছি, কথা বলছি। যদি পারতাম, আমি নিজে গাড়ি চালিয়ে সকলকে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিতাম।'

ভারতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নামীদামী তারকারা করোনার এই প্রকোপে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। শাহরুখ-সালমান-আমির-অজয়-অক্ষয়, সবাই যার যার জায়গা থেকে সাহায্য করেছেন। তবে সনুর মতো এভাবে গণমানুষের কাতারে নেমে তাদের সাহায্য করেননি কেউই। সনু বড় কোন তারকা নন, তবে তার মনটা যে আকাশের মতো বিশাল, সেটার প্রমাণ তিনি দিয়ে দিয়েছেন। পর্দায় ভিলেন হলেই যে মানুষটা খারাপ হবেন, এমন কোন কথা নেই। স্রষ্টা নাকি মানুষের রূপ ধরে তার সৃষ্টিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন মাঝেমধ্যেই। কে জানে, সনু সুদের মধ্যেও হয়তো স্রষ্টারই একটা রূপ বাস করছে! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা