মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশের শিরোপা জিতে বৈশ্বিক আসরে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা শিরিন শিলাকে দেখে বাংলাদেশের কেউ যদি আগে থেকে চিনে না-ও থাকেন, তবুও এক পলক দেখলেই বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয় যে, এই মেয়ে লাল সবুজের দেশ থেকে গিয়েছেন সেখানে।

উপস্থাপিকার কণ্ঠস্বরে ঘোষিত হলো বাংলাদেশের নাম, মঞ্চে পা রাখলেন মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা তরুণী শিরিন শিলা। তার সাজসজ্জা দেখে চোখ ছানাবড়া হবার যোগাড়, লাল জামদানি শাড়ি গায়ে জড়িয়েছেন, মাথার ওপরের অংশটা রিক্সার হুডের আদলে গড়া, কানের দুলটা বাংলা বর্ণমালার মতো করে নকশা করা! 

মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশের শিরোপা জিতে বৈশ্বিক আসরে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা শিরিন শিলাকে দেখে বাংলাদেশের কেউ যদি আগে থেকে চিনে না-ও থাকেন, তবুও এক পলক দেখলেই বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয় যে, এই মেয়ে লাল সবুজের দেশ থেকে গিয়েছেন সেখানে। ছোট্ট পরিসরে এরচেয়ে ভালোভাবে বাংলাদেশকে এভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয় কোনভাবেই, শিলা সর্বোচ্চটাই করেছেন গতকাল।

‘মিস ইউনিভার্স' প্রতিযোগীতার এই স্পেশাল এপিসোডের নাম ছিল 'ন্যাশনাল কস্টিউম’। নিজ দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মাধ্যমে দেশের অস্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলার পরীক্ষা নেয়া হয় এই রাউন্ডে। এখানেই বাজীমাত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের এই ছাত্রী। তিনি বেছে নিয়েছেন বাঙালী ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক জামদানী শাড়িকে, পরনে ছিল হাতের তৈরী দেশী গয়না। কানের দুলে লেখা ছিল বাংলা বর্ণমালা। আর মাথার ওপরের অংশটা তিনি সাজিয়েছেন রিকশা'র ডিজাইনে, যে বাহনটা বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে ওতপ্রোতভাবে।

ফেসবুকে নিজের পেজে শিলা লিখেছেন- ‌‘এই পর্বে র‌্যাম্প আয়োজনটি হয়েছে নিজের দেশ ও সংস্কৃতি তুলে ধরার জন্য। এখানে আমি আমাদের ঐতিহ্য জামদানি শাড়ি ও গহনা পরেছি। এগুলোর মাধ্যম্র কখনও পরিবেশ দূষিত হয় না। আর আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে রিকশার হুড ব্যবহার করেছি। যেখানে আছে আমাদের ৪০০ বছরের বাঙালির ইতিহাস, সম্রাট আকবরের পঞ্জিকার ইতিহাস, পহেলা বৈশাখ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও আমাদের সংস্কৃতির নানা শক্তি। সবুজ রিকশা পেইন্ট আর লাল শাড়িতে শহীদের রক্তে পাওয়া আমি আমার লাল-সবুজের দেশকে তুলে ধরতে চেয়েছি।’

 ঠাকুরগাঁওয়ের মেয়ে শিলা পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে। মেধাবী এই তরুণী পদার্থবিজ্ঞানের মতো খটমট্র একটা বিষয়ে পড়ালেখা করেন। অথচ তার স্বপ্নের মেঘগুলো খেলা করে আরও অনেক উঁচুতে। মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ প্রতিযোগীতা চলার সময়ই তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, প্রফেশনাল মডেল হতে চান তিনি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এমন স্বপ্ন দেখাটা শুধু দুঃসাধ্যই নয়, বেশ দুর্লভও বটে! 

সেই প্রতিযোগীতার প্রশ্নোত্তর পর্বের একটা পর্যায়ে শিলাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তার প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে। তিনি তখন নিজের বাবার কথা বলেছিলেন। কেন বাবা সবচেয়ে প্রিয় মানুষ- এই প্রশ্নটা এসেছিল এর পরপরই। শিলা যে জবাবটা দিয়েছিলেন, সেটা এখনও মাথায় গেঁথে আছে, শিলা বলেছিলেন- 'আমার বাবা আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব, কারণ তিনি আমার মাকে সম্মান করেন। আমার মায়ের সাথে সবসময় ভালো ব্যবহার করেন, সম্মান দিয়ে কথা বলেন তাই আমি আমার বাবাকে অনেক ভালবাসি...' 

মুখস্ত বা শিখে আসা কোন উত্তর নয়, নিজের মনের ভাবগুলোই শিলা প্রকাশ করেছেন অকপটে। এ ধরণের প্রতিযোগীতায় অনেককেই দেখা যায় বেশি স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে ইংরেজী-বাংলা মিশিয়ে ভাষার একটা জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলেন। এখানেও শিলা ছিলেন ব্যতিক্রম, তিনি কথা বলেছেন প্রমিত বাংলায়, শুদ্ধ উচ্চারণে। প্রয়োজনে ইংরেজী শব্দ এসেছে তার কথায়, কিন্ত সেটার পরিমিতিটা চোখে পড়েছে। মিস ইউনিভার্সের মঞ্চে আবার তার সাবলীল ইংরেজী উচ্চারণ বুঝিয়ে দিচ্ছে, এই ভাষাতেও তার দখল বিন্দুমাত্র কম নয়। 

মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশের ফাইনাল রাউন্ডে স্পেশাল জাজ হয়ে এসেছিলেন সাবেক মিস ইউনিভার্সের খেতাবজয়ী বলিউডি অভিনেত্রী সুস্মিতা সেন। শিলার ভূয়সী প্রশংসা শোনা গিয়েছিল তার মুখে, অনুজের পারফরম্যান্সের দীপ্তি মুগ্ধ করেছিল সুস্মিতা সেনকে, শিলার ঔজ্জ্বল্যে এখন মুগ্ধ আমরা, মুগ্ধ হচ্ছে পুরো বিশ্বই।

শিলার বাবা সেনাবাহিনীতে চাকুরী করেন। মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশের মুকুট জেতার পর শিলা বলেছিলেন, 'আমার বাবা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, এদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই মুকুট জেতার পর আমার দায়িত্ব বেড়ে গেছে, আমিও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই, দেশের জন্যে সম্মান নিয়ে আসতে চাই।' সেই মিশনে শিলা অনেকদূর এগিয়ে গেছেন। আগামীকাল মিস ইউনিভার্সের ফাইনাল, বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় ঘোষণা করা হবে ফলাফল। সেরার মুকুটটা শিলার মাথায় উঠবে কীনা সেটা সময় বলে দেবে, তবে এই তরুণী ইতিমধ্যেই আমাদের মন জিতে নিয়েছেন ব্যাপকভাবে, মুকুট জেতা-না জেতায় কিছু আসে যায় না!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা