বঙ্গবন্ধুর আমলেও চাটার দল ছিল, এখন সেই চাটার দল শেখ হাসিনাকে ঘিরে ধরেছে। আজ হজরত উপাধি দেয়া হচ্ছে, কাল আরও কিছু যুক্ত হবে নামের পাশে। তেলবাজির এই মহোৎসব চলবে।

ক্ষমতাবানদের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ থাকবেন- এমনটাই স্বাভাবিক। সুপ্রীম লিডারকে তোয়াজ করে চলতে জানলে ওপরের দিকে ওঠাটা অনেক সহজ হয়- এটাও পরীক্ষিত সত্য। কিন্ত সব কিছুরই তো একটা মাত্রা আছে। সেটা হিসেব না করে প্রশংসার নামে তেলের ড্রাম উপুড় করে দিলে কি হতে পারে, তার একটা নমুনা দেখিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। মনের খুশিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি তাঁকে 'হজরত' উপাধি দিয়ে বসেছেন! 

জাতীয় সংসদকে ওয়াজ মাহফিলের ময়দান বানিয়ে তিনি কিছুক্ষণ খলিফা হজরত ওমর (রা) এর প্রশংসা করেছেন, তারপর প্রধানমন্ত্রীকে তুলনা করেছেন হজরত ওমরের সঙ্গে, বলেছেন- 

"ওমর (রা.) মতো শেখ হাসিনা রাতের অন্ধকারে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে পারেন না। তখন জনসংখ্যা ছিল কম। এখন ১৭ কোটি মানুষের গৃহে যদি যেতে চান তার এক জনমে পৌঁছাতে পারবেন না। এ কারণে তিনি সারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে হজরত ওমর ও ওসমানের অনুসরণ করে মানবতার কল্যাণ করছেন। তিনিই প্রথম ইসলামের ইতিহাসে এমন একজন বিখ্যাত নেতৃত্ব যিনি দুঃস্থ মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের কল্যাণ ভাতা চালু করেছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) ১০ লাখের অধিক রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছেন। কওমি, ইবতেদায়ী মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আলেমদের জাতীয় জীবনে অবদান রাখার সুযোগ দিয়েছেন..." 

হুইপের বিশাল ভূমিকা এখানেই শেষ হয়নি,  আরও বেশ কিছুক্ষণ স্ততিবাক্য পাঠ করে তিনি মূল প্রসঙ্গে এসে বলেছেন- "প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলামের ইতিহাসে ৫৬০টি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশনার মধ্য দিয়ে এক মহৎ কাজ করেছেন। যা এর আগে কোনো ইসলামী রাষ্ট্রনায়ক করতে পারেন নাই। তিনি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছেন। তাই শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করার পূর্বে তার প্রতি সম্মানসূচক একটি শব্দ উচ্চারণ করতে চাই, ‘হজরত শেখ হাসিনা’ তোমাকে অভিবাদন।"

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হুইপ আবু সাঈদ

আমাদের প্রধানমন্ত্রী আছেন এক মহা মুসিবতে। উপাধির ঠেলায় তিনি কীভাবে টিকে আছেন সেটাই আশ্চর্য্যের। শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি করলেন, তেলবাজেরা তাকে উপাধি দিলো 'সীমান্তজয়ী' নামে। তার সরকার আন্তর্জারিক আদালতে মামলা করে জলসীমা উদ্ধার করলো, তাকে খেতাব দেয়া হলো 'সমুদ্রজয়ী নেত্রী'! মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলো বাংলাদেশ, চাটুকারেরা শেখ হাসিনার নাম দিয়ে দিল "মাদার অফ হিউম্যানিটি', চারিদিকে তখন 'নোবেল' 'নোবেল' টাইপের একটা রব। 

কোটা সংস্কার নিয়ে তুমুল আন্দোলন হলো, সরকার দাবী মেনে নিলো শিক্ষার্থীদের, তারা প্রধানমন্ত্রীকে উপাধি দিলো 'মাদার অফ এডুকেশন' এর! আওয়ামী লীগের পতনের জন্যে শাপলা চত্বরে আন্দোলন করা আহমদ শফী নিজের সুযোগ সুবিধা বুঝে পেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে খেতাব দিলেন 'কওমী জননী' হিসেবে। আমার ভয় হয়, এত সব উপাধি আর খেতাবের ভীড়ে লোকে কবে প্রধানমন্ত্রীর আসল নামটা না ভুলে যায়! 

হুইপের বক্তব্যে ফিরে আসা যাক। তার শব্দচয়ন খেয়াল করে দেখবেন। রোহিঙ্গাদের শেষে জোর করেই মুসলমান শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, হজরত ওমর এবং হজরত ওসমানের পথ অনুসরণ করছেন শেখ হাসিনা- দাবী করা হয়েছে এমনটা। আলেমদের জন্যে শেখ হাসিনা কি করেছেন, কয়টা মসজিদ বানিয়েছেন, কওমী মাদ্রাসাকে কি স্বীকৃতি দিয়েছেন- সেসবের ফিরিস্তি গেয়ে ধর্মান্ধ ভোটারদের দলে টানার একটা বাজে চেষ্টা পুরো বক্তব্যজুড়ে। কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, ধর্মান্ধরা কখনও আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি, কখনও দেবেও না। এটা জেনেও কেন আওয়ামী লীগ তাদেরকে আপন করার মিশনে ছোটে, সেটা দলটাই ভালো জানে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ আর সাম্প্রদায়িকতা- এই দুটো বিপরীতধর্মী শব্দ ছিল। আর এই বাংলাদেশে 'গান বাজনা হালাল' বলার অপরাধে একজন বয়াতিকে জেলে যেতে হয়, রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে, সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই গ্রেফতারের পক্ষে কথা বলেন! ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে যাদের লড়াই করার কথা, সেই আওয়ামী লীগই এখন জামায়াত আর হেফাজতের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে, আওয়ামী লীগের মূলমন্ত্র বিলীন হয়ে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে। 

এই সরকারের আমলে ব্লগার খুন হয় একের পর এক, সেই হামলায় জড়িতদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা না করে তারা উল্টো সেই হেফাজতের সুরেই সুর মেলায়, মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চলার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী, হেফাজতের মঞ্চে উপবিষ্ট অবস্থায় তাকে দেখে আমাদের হতাশা বাড়ে। হুইপ আবু সাঈদ কয়টা মসজিদ এই সরকার বানিয়েছে সেটা বললেন, এই সরকারের আমলে কয়জন ব্লগার খুন হয়েছেন, তাদের হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে কয়জন গ্রেফতার হয়েছেন- সেই পরিসংখ্যানটাও দিতে পারতেন। কিন্ত সেখানে তো তেলের ড্রাম উপুড় করে দেয়া যাবে না! তাই ব্লগার হত্যাকান্ড আড়ালে থেকে যায়, শরীয়ত বয়াতিরা জেলখানায় দিন কাটায়। 

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে হুইপ পদমর্যাদার একজন ব্যক্তির এমন নির্লজ্জ তেলবাজিতে অনেকেই অবাক হয়েছেন। আমি মোটেও হইনি। বঙ্গবন্ধুর আমলেও চাটার দল ছিল, এখন সেই চাটার দল শেখ হাসিনাকে ঘিরে ধরেছে। আজ হজরত উপাধি দেয়া হচ্ছে, কাল আরও কিছু যুক্ত হবে নামের পাশে। তেলবাজির এই মহোৎসব চলবে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পরে এই চাটার দল কোথায় ছিল আমরা দেখেছি। আজ আওয়ামী লীগ কোন বিপদে পড়লেও চাটার দলের ভোল পাল্টাতে সময় লাগবে না। জানি না, প্রধানমন্ত্রী সেসব মনে রেখেছেন কিনা... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা