অল্প বয়সে নেমে পড়লেন সেলুনের নরসুন্দরের কাজে। পড়ালেখা করেছিলেন চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত। কিন্তু, পড়তে তার ভাল লাগত খুব। চর্চাটা থেমে যায়নি সেলুনে এসেও৷ প্রতিদিন সেলুনে সংবাদপত্র রাখা হতো৷

বই পড়ার অভ্যাসটা দিন দিন কমে যাচ্ছে এই কথা যখন আমরা বলছি, তখন একজন নরসুন্দর বই পড়াটাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন। নিজের সেলুনে থরে থরে বিখ্যাত লেখকদের বই সাজিয়ে দারুণ এক লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন তিনি। মিলন শীল অসাধারণ এই উদ্যোগের উদ্যোক্তা, তার সেলুনটার নাম মিলন সেলুন। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় আপনার চোখে পড়বে এই সেলুনটিকে। 

১৯ বছর আগে মিলনের পিতা সেলুনটি শুরু করেন। তারপর হাত ঘুরে এখন মিলনই চালাচ্ছেন দোকানটি। সেলুনের হাল না ধরেও উপায় ছিল না তার। সংসার তো চালাতে হবে। আর্থিক ক্ষুদা, বেঁচে থাকার তৃষ্ণা নিবারণ করা সবার আগে প্রয়োজন। মিলন শীল সেই প্রয়োজন মেটাতে, অল্প বয়সে নেমে পড়লেন সেলুনের নরসুন্দরের কাজে। পড়ালেখা করেছিলেন চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত। কিন্তু, পড়তে তার ভাল লাগত খুব। চর্চাটা থেমে যায়নি সেলুনে এসেও৷ প্রতিদিন সেলুনে সংবাদপত্র রাখা হতো৷ 

মিলন অবসরে সংবাদপত্র পড়তেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। পড়ার আগ্রহ বাড়ে। তার চোখ যায় সৃজনশীল সাহিত্যের বইয়ের প্রতি। একদিন বন্ধুর কাছ থেকে নিয়ে আসেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'মেজদিদি' বইটি। পড়তে শুরু করেন এবং তার খুব পছন্দ হয়ে যায়। সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের জায়গা তৈরি হয় তার। এরপর নিজে নিজে কিছু বই কিনেন। মিলনের পড়বার আগ্রহ থেকে তার বন্ধুরাও তাকে বই উপহার দেয় কিছু। সংগ্রহীত বইগুলো প্রথমে নিজের বাড়িতে রাখলেও, এরপর এগুলো নিয়ে আসেন সেলুনে। তিন শতাধিক বই নিয়ে সেলুনে শুরু হয় মিলনের লাইব্রেরি। 

মিলন শীলের সেলুন ও লাইব্রেরি  

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মিলন যে উপজেলার বাসিন্দা, সেই বটিয়াঘাটায় সেই অর্থে কোনো পাবলিক লাইব্রেরি নেই। মিলনের সেলুনটিই তাই হয়ে উঠে সাহিত্যপিপাসু মানুষের মনের তৃষ্ণা মেটানোর জায়গা৷ এমনকি নাম ধাম লিখে কেউ চাইলে বই ধারও নিয়ে যেতে পারে এখান থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, শরৎচন্দ্র, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় সহ বিখ্যাত লেখকদের ক্ল্যাসিক বইয়ের কালেকশন মিলনের সেলুনে।

সেলুনে মানুষ আসে, চুলের বাহারি স্টাইল করে। শেভ টেভ করে সুন্দর মুখশ্রী নিয়ে ঘরে ফেরে। কিন্তু, মনের সৌন্দর্যটা একটা শিক্ষা সফরের মতো, যা আসে মানুষের যাপিত জীবন নির্ভর অভিজ্ঞতা থেকে, পড়াশুনা থেকে। মিলন তার সেলুনে লাইব্রেরি কার্যক্রম করে অনেক বড় সৌন্দর্যের দুয়ার খুলে দিলেন সবার সামনে। এই সেলুনে উৎসাহী পাঠকদের আনাগোনা দেখলেও বোঝা যায়, শুধু চুলের স্টাইলই স্টাইল না, বই পড়াটাও স্টাইল। 

মিলনের এই প্রচেষ্টায় এলাকার মানুষ বেশ মুগ্ধ। অল্পবয়সী ছেলেপেলেরা তো আসেই, অবসরে একটু বয়সী মানুষরাও এখানে এসে বই পড়েন। এম রহমান নামক একজন মিলনের দোকান সম্পর্কে বলেন, "স্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকের অঢেল অর্থবিত্ত আছে, তবে বটিয়াঘাটার তারা কেউ বই পড়ার উদ্যোগ নেননি। অথচ মিলনের মতো গরিব মানুষ পাঠাগার গড়ে জ্ঞান বিতরণের সুযোগ তৈরি করেছেন।" মিলনের অনেক অর্থ হয়ত নেই। কিন্তু শিক্ষা অর্জনের ক্ষুদা, নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা এটাই তাকে আরো আট দশটা মানুষের কাছ থেকে আলাদা করেছে৷ এই ধরুন, তার পড়ালেখার কথা। 

আর্থিক টানাপোড়েনে সে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করতে পেরেছিল। কিন্তু, এরপর এখন সেলুনের কাজের পাশাপাশি সে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতাকেও উন্নীত করার চেষ্টায় আছে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে একটু একটু করে পড়াশুনা করে এসএসসি পাশ করেছে! খুব বেশি কিছু আসলে লাগে না, নিজের সামর্থ্যের জায়গাকে কাজে লাগিয়ে মানু্ষ যেকোনোভাবেই সমাজে অবদান রাখতে পারে। 

মিলন শীল একজন নরসুন্দর, তার বই পড়ার আগ্রহ, মানুষ বই পড়ুক এটা তার চাওয়া। এই স্বপ্ন মিলন কিভাবে পূরণ করেছে,খেয়াল করেছেন? খুব বেশি কিছু না। নিজের সেলুনকেই কাজে লাগিয়ে সে ভিন্নধর্মী এই উদ্যোগটি নিয়েছে। এমন যদি সবাই হতো, এমনভাবেই যদি সবাই ভাবত, বই পড়াটাও হয়ে উঠতো অসাধারণ এক স্টাইল!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা