রাস্তায় থাকা একটা মানুষও এগিয়ে এলো না সাহায্য করতে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা বোঝে। বুঝলেন না শুধু কনস্টেবল রুবেল মিয়া, নিজেই ভ্যান চালিয়ে লাশটাকে নিয়ে এলেন থানায়...

লাশটা পড়ে ছিল রাস্তার এক পাশে। সাদা রঙের হাফ শার্ট আর লুঙ্গি পরনে, মাথায় টুপি। কিভাবে মারা গেছে কেউ জানে না, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মরেছে কিনা সেটাও নিশ্চিত নয় কেউ। আর তাই মৃত্যুর পরেও ঘন্টার পর ঘন্টা লোকটার দেহ পড়ে রইলো রাস্তার পাশে, অনাদরে, ভীষণ অবহেলায়। আশপাশ দিয়ে মানুষজন হেঁটে যাচ্ছে, তাকাচ্ছে, আবার মুক ফিরিয়ে নিয়ে হাঁটা ধরছে- সবাই রোবট হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। 

কিন্ত একজন হতে পারলেন না রোবট। অবহেলা করতে পারলেন না তিনি, তার ভেতরে হৃদয় বলে একটা বস্তু আছে, সেটা কেঁদে উঠলো। তিনি এগিয়ে গেলেন, কোন প্রোটেকশন ছাড়াই স্পর্শ করলেন লাশটাকে, দেখলেন, শরীরের নিচে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। বুঝতে পারলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন লোকটা। তবুও আশেপাশের মানুষজনের ভয় কাটে না। কেউ এগিয়েও এলো না।

কারো সাহায্য না পেয়ে নিজেই একটা ভ্যান ডেকে আনলেন, লাশটাকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য। ভ্যানের চালক হাতেপায়ে ধরলেন, তিনি এই লাশ নিয়ে যেতে পারবেন না। নিরুপায় হয়ে আমাদের গল্পের, না গল্প না, সত্যি ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্রটি সুপারহিরো হয়ে উঠলেন। নিজেই লাশটাকে ধরে ভ্যানে শুইয়ে দিলেন, দড়ি দিয়ে বাঁধলেন শক্ত করে, তারপর নিজেই ভ্যান চালিয়ে নিয়ে এলেন থানায়, সেখান থেকে লাশ গেল হাসপাতালে। যে সুপারহিরোর কথা এতক্ষণ বলছিলাম, তিনি গাজীপুরের গাছা থানার কনস্টেবল রুবেল মিয়া।

রুবেল মিয়া বলছিলেন, "রাত ২টার দিকে সাইনবোর্ড এলাকায় ডিউটি করছিলাম, এমন সময় একজন বয়স্ক লোককে (৬০) রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে সামনে এগিয়ে যাই। কাছে গিয়ে দেখতে পাই লোকটি রক্তাত্ব অবস্থায় পড়ে আছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে কেউ লাশের পাশে আসেনি।পরে লোকটিকে থানার নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা গাড়ি খুঁজতে থাকি। রাত বেশি হওয়ায় কোনো গাড়ি না পেয়ে একজন ভ্যানচালককে লাশটি থানায় নেয়ার অনুরোধ করলে তিনি আমাদের তার গাড়িতে লাশ না তুলতে হাতে-পায়ে ধরেন।পরে তার অনুরোধ উপেক্ষা করে আমরা লাশটি তার গাড়িতে তুললে সে লাশটি বহনে অস্বীকৃতি জানায়, পরে আমি নিজেই তার ভ্যান গাড়িটি চালিয়ে লাশ থানায় নিয়ে যাই।" 

নিজেই ভ্যান চালিয়ে লাশ নিয়ে যাচ্ছেন রুবেল মিয়া

রুবেল মিয়া চাইলে সেধে এই দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিতে নাও পারতেন। চাইলেই সরে যেতে পারতেন ঘটনাস্থল থেকে, কিংবা সাহায্যের জন্যে থানায় যোগাযোগ করে বসে থাকতে পারতেন। চেনেন না, জানেন না, এমন একটা লাশের ব্যাপারে এত আগ্রহ দেখানোর কি আছে! তার ওপর পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ, করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে দ্রুত। কই, রাস্তায় থাকা একটা মানুষও তো এগিয়ে এলো না সাহায্য করতে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা বোঝে। বুঝলেন না শুধু রুবেল মিয়া। 

করোনাভাইরাস মহামারীর রূপ নেয়ার পর থেকে ডাক্তারদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হয়ে কাজ করছেন সে পেশার মানুষ, তারা পুলিশ। লকডাউন নিশ্চিত করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তারা, এই তীব্র গরমের মধ্যে পিপিই পরে ডিউটি করছেন, তার ওপর রোজা রাখতে হচ্ছে, একটু বাতাসের জন্যে হাঁসফাস করে ওঠে শরীর, খানিকটা শীতলতায় প্রাণ জুড়াতে চায়, কিন্ত উপায় নেই! কোথাও হয়তো ভাড়া না দেয়ায় বাড়িওয়ালা বের করে দিয়েচগে ভাড়াটিয়াকে, পুলিশ গিয়ে বাড়িওয়ালার সঙ্গে মীমাংসা করে দিচ্ছে, ভাড়াটিয়াকে সাহায্য করছে সাধ্যমতো। 

এর বাইরে নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ তো আছেই। অসহায় মানুষজনের জন্য রান্না করা খাবার প্যাকেটে করে বিতরণ করা হচ্ছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে কেউ মারা গেছে, লাশ পড়ে আছে কয়েকদিন ধরে, ভয়ে ধরছে না কেউ, পুলিশ ছুটে গেছে। করোনায় আক্রান্ত রোগীর জানাজা পড়াতে রাজী হচ্ছে না কেউ, পুলিশের চার-পাঁচজন সদস্য দাঁড়িয়ে জানাজা পড়িয়ে ফেলছেন। করোনায় মৃত ব্যক্তিকে কবর দিতে দিচ্ছে না এলাকাবাসী, পুলিসজ গিয়ে তাদের বোঝাচ্ছে, কোদাল হাতে নেমে পড়ছে কবর খুঁড়তে- জ্বী, এমন দৃশ্য এই বাংলাদেশেই আমরা দেখেছি গত কিছুদিনে, করোনার এই দুঃসময়ের মাঝেই। 

পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে অজস্র সমালোচনা আছে, পাওয়ার প্র‍্যাকটিসের সুযোগ বেশি বলে এই বাহিনীর অনেক সদস্যই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত হয়। কিন্ত সেই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের কাজ কি চমৎকারভাবেই না করছে পুলিশের সদস্যরা! মানুষের মনে পুলিশের প্রতি বিশ্বাসটা ফিরে আসছে আবার। প্রতিদিন শত শত পুলিশ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, মারা গেছেন বেশ কয়েকজন। যমের সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হয়ে যারা ফিরে এসেছেন, তারা আবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। রুবেল মিয়ারা সেই পুলিশেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। আর আমরা মানুষের বিপদে চুপচাপ দূরে সরে যাই, নিজেদের স্বার্থটাকে সবার ওপরে রাখি, তারপর ফেসবুকে এসে পুলিশকে গালাগাল করি, কি চমৎকার হিপোক্রেসি, তাই না? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা