আপনার চারপাশে একটা চক্র গড়ে উঠেছে যারা যে কোনও ঘটনার সময় আপনাকে শুধু ভালো ভালো খবর দেয়। আর যখনই সংকট হয়, আসল চিত্রটা বেরিয়ে আসে। আপনাকে তখন হস্তেক্ষপ করতে হয়। এটাই কি তাহলে সমস্যার সমাধান?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! আপনি একটু কৌশল বদলান। আপনার চারপাশে একটা চক্র গড়ে উঠেছে যারা যে কোন ঘটনার সময় আপনাকে শুধু ভালো ভালো খবর দেয়। তারা বলে কোন সমস্যা নেই। সব ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে। কিন্তু দুর্যাগের সময় দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। তখন আবার সবকিছুতে আপনাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই যেমন করোনার সময় সবাই আপনাকে বলেছে, সব ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে। ডাক্তার রেডি। হাসপাতাল রেডি। পিপিই রেডি। মাস্ক রেডি। তাদের কথা শুনে আপনিও বিশ্বাস করে বসলেন সব প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। এই তো কয়দিন আগে আপনি সারাদেশের জেলা প্রশাসক আর সিভিল সার্জনদের সাথে কথা বললেন। সবাই এমনভাবে বললেন যে কোথাও কোন সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তব অবস্থা শুরুর পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। করোনা শুরুর পর আমরা দেখলাম, সমন্বয়হীনতা, নেই আর নেই। কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা নেই। মাস্ক নেই, পিপিই নেই, ডাক্তার নেই, হাসপাতাল নেই, আইসিইউ নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার পক্ষে তো আর কতো মাস্ক আছে, কতো পিপিই আছে, হাসপাতালের কী অবস্থা এসব গিয়ে দেখা সম্ভব নয়। নেতার কাজও সেটা নয়। আপনাকে আপনার চারপাশের লোকজনের কথা বিশ্বাস করতে হয়। কিন্তু তারা সবসময় ভালো কথা বলে। প্রশংসা করে। আর যখনই সংকট হয়, আসল চিত্রটা বেরিয়ে আসে। সবকিছুতে আপনাকে তখন হস্তেক্ষপ করতে হয়। তাহলে সমস্যার সমাধান কী?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আপনার মতো দেশ চালাই না। আমি একটা ছোট্ট টীম চালাই। আমি একটা ছোট্ট কৌশল অবলম্বন করি। আমি যখন আমার ঢাকা ও ঢাকার বাইরের জেলা পর্যায়ের সব কর্মকর্তাদের নিয়ে টীম মিটিং করি আমি সোজাসাপ্টা বলে দেই, আপনাদের ভালো খবরগুলো তো এমনিতেই পাই। আমাকে ভালো ভালো কথা বলার দরকার নেই, কোথায় কী সমস্যা আছে সেটা আমাকে জানান। এমনকি আমার কোন সমস্যা থাকলে সেটাও জানান। সবাই যে সাহস করে বলেন তা নয়।

শুরুর দিকে অনেকেই বলতো না। কিন্তু এখন সবাই জানে। এখন তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সবার চোখে চোখ রেখে সমস্যাগুলোর কথা বলে। এমনকি সদ্য যোগ দেওয়া ছেলেটাও আমাকে বা আমাদের চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এভাবেই আমরা সবাই মিলে সমস্যা বের করি। আলোচনা করি। সমাধানের উপায় বের করি। শতভাগ সফল আমি বলবো না তবে বেশ কাজ হয়। সবাই আনন্দ নিয়ে কাজ করে। সত্যের চর্চা হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের দেশে এখন এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যে আমাদের সরকারি বা বেসরকারি প্রায় সব প্রধান বা বড় কর্তারা শুধু ভালো কথা আর প্রশংসা শুনতে চায়। অন্যরাও তাই সাহস করে বলে না। যে দুয়েকজন বলতে চায় তাদের বিরোধী হিসেবে তকমা দেয়া হয়। তাই অনেকেই সাহস হারিয়ে ফেলে। তারপরেও কেউ কেউ বলে। এরাই সত্যিকারের বন্ধু। এই ধরনর বন্ধুই তো আমাদের দরকার। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভাবেন তো কেউ যদি আপনাকে জানুয়ারি মাসে বলতো, করোনা আসছে। বাংলাদেশেও আসবে। আমাদেন কোন প্রস্তুতি নেই। আমাদের পিপিই নেই। হাসপাতালে আইসিইউ নেই। কী হবে? আমি নিশ্চিত আপনি তখন বলতেন, দ্রুত এগুলোর ব্যবস্থা করো। কিন্তু কেউ হয়তো সেটা করেনি সাহস করে। আচ্ছা আপনার স্বাচিপ নেতা, আপনার কোন মন্ত্রী, আমলা বড় বড় কর্তা, কেউ কি আপনাকে সতর্ক করেছিল? নাকি সবাই বলেছে, সব ব্যবস্থা আছে। আমি তো দেখেছি, একদল বলেছে, করোনা বাংলাদেশে আসবে না। আরেকদল বলেছে, আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী। তা কতোটা শক্তিশালী এখন তো দেখা যাচ্ছে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পেছনের কথা বলে লাভ নেই। গতকাল পর্যন্ত চলে যাওয়া সময়টা তো আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো না। এখন তাহলে কী করবেন? আপনি আপনার বিশ্বস্তদের দিয়ে একটা টীম করে দেন। তাদের কাজ হবে তারা আপনাকে শুধু সমস্যাগুলোর কথা জানাবে। সমস্যা সমাধানে করনীয় কী সেটা বলবে। আপনার কাজ হবে যারা আপনাকে সমস্যাগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে তাদের কথা শোনা। তাদের কথা সত্য হলে পুরুষ্কৃত করা। আপনি যদি সবক্ষেত্রে এমন করতে পারেন, যারা সারাক্ষণ জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর না করে, আপনাকে সব ঘটনার আসল তথ্য দেবে, সত্য তথ্য দেব হোক সেটা যতোই তিক্ত, দেখবেন এই সংস্কৃতিটা যদি গড়া যায়, বহু সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

শুধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কেন বলছি? আপনাকে বলছি। নিজের প্রতিষ্ঠানে দেখেন। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে একই অবস্থা। সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রের সর্বত্র এই সংস্কৃতির চর্চা জরুরী, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, যারা সমালোচনা করে হলেও সত্যটা ধরিয়ে দেবে। প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি সত্যটা জানতে পারেন তার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ হয়। এই সত্যটা জানার জন্য ভিন্নমত শোনার বা সত্যটা শোনারও অভ্যাস থাকতে হয়।

সেই সংস্কৃতিটাও জরুরী। কিন্তু আফসোস গত একযুগে কিংবা গত ৫০ বছরে এই দেশে একটাই সংষ্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি সেটা হলো তেলের সংস্কৃতি। সারাদেশ এমন একটা অবস্থা গড়ে উঠেছে সত্য সমালোচনা করারও সাহস পায় না অনেক লোকে। এভাবে চললে মিথ্যার স্রোতে সব ধ্বসে যাবে।

হ্যা, জাতি হিসেবে আমরা পরশ্রীকাতর। সারাক্ষণ অন্যের গীবত করি। আর বস বা ক্ষমতাশালীদের তেল দেই। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। আমি বিশ্বাস করি এই সংষ্কৃতি বদলানো জরুরী। আসুন আমরাও সবাই সত্য বলার কালচার তৈরি করি। নানা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে বা বড় দায়িত্বে যারা আছেন সত্য শোনার কালচারটা তৈরি করূন- হোক সেটা অপ্রিয়। তেলবাজদের বদলে যারা সত্য বলে আপনারা তাদের পুরুষ্কৃত করার সংস্কৃতি চালু করূন। দিনশেষে সেটাই মঙ্গলের। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভালো রাখুন।

আরও পড়ুন- 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা