মৃত্যুকে শাশ্বত ও সুন্দর ভাবা হুমায়ূন ফরীদি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন একদম একা, বসন্তের এক মাতাল সমীরণ জাগানো সকালে।

সুদীপ্ত বিশ্বাস বিভু: শিবু কুমার শীল তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- মৃত্যু নিয়ে তাঁর একান্ত ভাবনা কী? উত্তরে বলেছিলেন- আমি চাই শিশিরের শব্দের মতো টুপ করে মরে যাব"। সত্যি সত্যি একদিন তিনি মাঘের শেষে শিশিরের মতন টুপ করে অকালে ঝরে গেলেন। কোনো এক সকালবেলা ঢাকাবাসী ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলো শক্তিমান অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী আর নেই। সাড়া না পেয়ে বাসার কেয়ারটেকার দরজা ভেঙে দেখতে পায় বাথরুমের দরজায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন নিঃসঙ্গ, মৃত হুমায়ুন ফরিদী।

ফরিদী সেই অর্থে বান্ধবহীন ছিলেন না। তবুও তিনি বলতেন পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ নিঃসঙ্গ। নিজেকে বলতেন ব্যাড হাজবেন্ড। দুটো বিয়ে। একাধিক্রমে চার বছর এবং বাইশ বছর। কেউই থাকলেন না বাহুডোরে। বলতেন- "আক্ষেপ নেই, দে মাস্ট হ্যাভ দেয়ার রিজন"। তিনি জানতেন কী ভয়ংকর এই একাকীত্ব, কী নির্মম এই বান্ধবহীনতা।

এই ছন্নছাড়া মহাপ্রাণকে বাঁধা যায়নি কোনো বাঁধনে। বাবার চাকরিসূত্রে ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা দেশ। স্কুলের পর স্কুল চেঞ্জ করেছেন। মদ গাঁজা খেয়ে রেলস্টেশনে, শ্মশানে, পাবলিক টয়লেটের ছাদে রাত কাটিয়েছেন। পাঁচ বছর স্টাডি ব্রেকের পর হঠাৎ মনে হল আবার পড়ালেখা শুরু করবেন৷ জাবিতে অর্থনীতিতে ভর্তি হলেন। ১৯৭৭ সালে শখের বশে আন্তবিভাগ নাট্য প্রতিযোগিতায় নাটক লিখে নির্দেশনা দিয়ে নাসির উদ্দিন ইউসুফ আর আতাউর রহমানদের নজরে পড়লেন। এরপর বাংলা থিয়েটার পেল মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতা। সেলিম আল দীনের কেরামত মঙ্গলের কেরামত ভূমিকায় ফরিদী হয়ে উঠলেন এক এবং অদ্বিতীয়। বিটিভির দর্শকেরা এখনো ভুলতে পারে না সংশপ্তকের কান কাটা রমজানের অনবদ্য অভিনয়। সবাই দেখলো, কোনো নায়ক নয়, এক ভিলেন দখল করে নিয়েছে দর্শকের হৃদয়াসন।

ফরিদীরা বার বার জন্মায় না

মঞ্চ ছেড়ে সিনেমায় গেলেন ৯০ সালে। শিবু দা জিজ্ঞেস করলেন কেন তিনি সস্তা চটুল সিনেমায় অভিনয় করতে গেলেন? নির্লিপ্ত ও সৎ স্বীকারোক্তি দিয়ে বললেন- "আমার জীবন ধারণের জন্য অর্থ দরকার৷ আমি অভিনয় ছাড়া আর কিছুই পারি না"। তাঁঁর মতো প্রখর রাজনৈতিক বোধ খুব কম শিল্পীরই ছিল। রাজনীতি নিয়ে স্বপ্ন আবার স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাও তার বুকে গভীরভাবে বাজতো। স্তানিস্লাভস্কির অভিনয় রীতি ফলো করতেন সব সময়৷ কত গভীর ছিল তাঁর অনুধাবন শক্তি!

জীবনের একটা বিশাল অংশ জুড়ে ছিল রবি ঠাকুর। বলতেন- "যদি মেয়ে হতাম, রবীন্দ্রনাথকে আমি বর হিসেবে গ্রহণ করতাম"। ক্রিকেট অবসেসড মানুষটা ক্রিকেটের সুক্ষ্ম আর্টে মুগ্ধ হতেন। আরো অনেক কিছুর প্রতি ছিল ফরিদীর অপার মুগ্ধতা।

আজ ফরিদীর চলে যাওয়ার দিন। ফরিদী শিবুদাকে জানিয়েছিলেন তিনি আর জন্মাতে চান না। যদি জন্মাতেই হয়, তিনি আবার ফরিদী হয়েই জন্মাতে চান। অথচ আমরা তো জানি, ফরিদীরা বার বার জন্মায় না। নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, হয় নাকি?


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা