বাংলাদেশের জনপ্রিয় খেলা কী? ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, কাবাডি? কিন্তু না! পরিসংখ্যান বলে ধর্ষণ।

২০১৬ সাল থেকে গড়ে এদেশে প্রতি বছর ধর্ষণের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। ২০১৯ এর শেষে এসে সেই সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে প্রায় দেড় হাজারে। এমন স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেশের অন্য কোনো সেক্টরে নেই। ধর্ষণের সাথে রয়েছে বাড়তি নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতা। ৯ মাসের শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধা, কেউই রেহাই পাচ্ছে না এই নির্মমতা থেকে। কেউ যদি ধর্ষণের পর বেঁচেও যায়, এ সমাজ তাকে বাঁচতে দেয় না। কোনো নারীর জীবনে ধর্ষণ একবার শুরু হলে সেটা যেন আর থামতেই চায় না। এর শেষ কোথায়, আত্মহত্যায়? কারণ, ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ৪০% ধর্ষিতা বেছে নিচ্ছে এ পথ। এভাবে চলতে থাকলে ধর্ষণে চ্যাম্পিয়ন দেশ হওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুই আমাদের গায়ে লাগছে না যতক্ষণ আমাদের নিজেদের উপর দিয়ে ব্যাপারটা যাচ্ছে বা কোনো ইস্যু তৈরী হচ্ছে। ইস্যু তৈরী হলেও, পরের ইস্যুতে সব হারিয়ে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এদেশে গড়ে ৩ থেকে ৫টা ধর্ষণ হচ্ছে প্রতিদিন। এছাড়া অগণিত ধর্ষণ সংবাদ গণমাধ্যমে পর্যন্ত পৌঁছুতে পারছে না। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর মতোই এলার্মিং একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যখন কথায় কথায় পাশের দেশের উদাহরণ টেনে এনে গালাগাল করি, ঠিক সেই জঘন্য কাজটাই এখন হচ্ছে আমাদের দেশে। আমরা কী তাহলে অন্যকে বর্বর বলতে বলতে নিজেরাই সে পথে এগিয়ে যাচ্ছি দুর্দান্ত সফলতা এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে। দৈনিক খবরে যা বের হয়ে আসে, পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। সামাজিক প্রাণী হিসেবে নিজেদের দাবী করা এই আমরাই সর্বাধিক অসামাজিক কাজে লিপ্ত। তাহলে আমরা কি অপেক্ষা করছি কখন আমাদের কাছের কেউ ধর্ষণের শিকার হবে, তারপর আমরা গর্জে উঠবো কোনো এক সাপ্তাহিক ছুটির দিনের জন্য?

হোক প্রতিবাদ, হোক প্রতিরোধ

আচ্ছা, এর প্রতিকার কী হতে পারে? ধর্ষণের কারণ হিসেবে প্রথমেই কড়া নাড়ে মানবিক মূল্যবোধের বিষয়টি। যে ধর্ষণ করে, এবং যারা ধর্ষণকে জাস্টিফাই করে তাদের কাছে ধর্ষণ কোনো অপরাধই নয়, বরং এটা তাদের অধিকার। কোনো উদাহরণ দিয়েই তাদের বোঝানো সম্ভব না যে, এটা কতটুকু ঘৃন্যতম অপরাধ। কারন, সেই অপরাধবোধ অনুধাবণের মানবিক মূল্যবোধ তাদের নেই। যে মূল্যবোধ একজন মানুষের ভিতর গড়ে ওঠে শিশুকাল থেকে পরিবার ও সমাজের মাধ্যমে। আমরা যে শিক্ষা পাচ্ছি, তাতে সবাই নিজের বেলায় উকিল আর অন্যের বেলায় বিচারপতি হয়েই বেড়ে উঠছে। নৈতিক মূল্যবোধের পাশাপাশি বিচারহীনতাও যে কোনো অপরাধের অন্যতম মূল কারণ। অপরাধ করার সময়েই অপরাধী জানে, সে এর বিচারকার্য থেকে খুব সহজেই বেরিয়ে আসতে পারবে। তার উপর, নারী ও শিশুদের উপর সংগঠিত অপরাধের উল্লেখযোগ্য বিচার এদেশে হয়নি, হচ্ছে না, হবে কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমতাবস্থায়, আমাদের কাছে সোজা দুটি পথ আছে। প্রথমত, যা হচ্ছে জাস্টিফাই করে চুপচাপ মেনে নেয়া। দ্বিতীয়ত, এর উপযুক্ত প্রতিবাদ করা। প্রতিবাদটা শুধু সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক কেন হয়ে যায় সেটা এখনো বোধগম্য হয় না। আমাদের চোখের সামনেই অহরহ ঘটনা ঘটে যায়, আর আমরা সাথে সাথে প্রতিবাদ না করে অপেক্ষা করি কখন সেটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলবো। এ লেখাটাও কতটুকু প্রভাব ফেলবে সেটা নিয়েও সন্দিহান। কোনো সমস্যার সমাধান চাইলে, প্রথমে উক্ত সমস্যার অস্তিত্ব মেনে নিতে হবে। অতএব, ধর্ষণকে গুরুত্বর অপরাধ হিসেবে স্বীকার এবং প্রতিকার না করলে, এর শিকার বাড়তেই থাকবে। তবে, অন্তত এইটুক মিনতি থাকবে... নদীমাতৃক এ দেশটা যেনো ধর্ষণমাতৃক না হয়ে যায়। নতুন বছরে এই পুরানো ক্রাইসিস নিয়ে শুভবুদ্ধির উদয় হোক।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা