কোন বাবা-মা'ই চাইবেন না তাদের ছেলে রায়হানের মতো হোক, নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করুক, মাঝরাতে বাড়িতে র‍্যাব-পুলিশ হানা দিয়ে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাক। কাজেই নিজের সন্তানকে রায়হান ভাই বানাবেন কিনা- সেই সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে...

মামলা মোকদ্দমার তোয়াক্কা না করা রায়হান আলম, ওরফে রায়হান ভাইকে গতকাল গ্রেফাতার করেছে র‍্যাব-২ এর একটি দল। তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালাগালি, বিকৃত অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে অশ্লীলতা ছড়ানোর অভিযোগ এনেছে র‍্যাব। এছাড়াও অভিযোগ আছে, নারীদের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেল করতেন এই তরুণ। ফেসবুকের কয়েকটা গ্রুপে রায়হানের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ওঠার পরেই র‍্যাব তার বিরুদ্ধে নানা তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের অভিযানে নেমেছে, তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে, ফেসবুকে অল্প সময়েই ভাইরাল হওয়া এই রায়হান ভাইকে গতকাল গ্রেফতার করা হয়েছে তার শ্যাওড়াপাড়ার বাসা থেকে। 

ফেসবুকে হঠাৎ করেই ভাইরাল হয়ে গিয়েছিলেন রায়হান আলম। ফেসবুক লাইভে এসে ধূমপান, উগ্র আচরণ, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন জনের নামে অশালীন কথাবার্তা বলতেন তিনি। তারপরেই রায়হানকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তার ভক্ত তৈরী হতেও সঅময় লাগেনি, আবার রায়হানের এই উগ্র আচরণ অনেকের মনেই বিরক্তির জন্ম দিয়েছে। ফেসবুক ভিত্তিক বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপে রায়হানের এসব আচরণ নিয়ে আলোচনা উঠলে বিষয়টি নজরে আসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার টিমের। এ বিষয়ে তাকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হলেও থামেননি রায়হান।

উল্টো পুলিশ, র‌্যাব নিয়ে তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন লাইভে এসে। হুমকি দিয়েছেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও গ্রুপের উদ্যোক্তাদেরও। সামাজিকভাবে তাদের হেয় করার কথাও বলেছেন রায়হান। কয়েকদিন আগে লাইভে এলে রায়হানকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, এসব মামলা বা পুলিশের সতর্কতায় তিনি ভয় পাচ্ছেন কিনা। রায়হান তখন পাত্তা না দেয়ার সুরেই বলেছেন, ‘আরে মামলা কী জিনিস এইডাই আমার ডিকশনারিতে নাই। পুলিশ-র‌্যাব আমি ভয় পাই নাকি?’

রায়হানকে যারা গ্রেফতার করেছে, সেই র‌্যাব-২ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেছেন, "আপত্তিকর কনটেন্টের কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রায়হানকে গ্রেপ্তারে মাঠে নামে র‌্যাব। টানা কয়েকদিনের চেষ্টায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শেওড়াপাড়ার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রায়হানের ব্যবহৃত মোবাইল ও কম্পিউটার থেকে বিপুল পরিমাণ ছবি, অশ্লিল ভিডিও, নারীদের সঙ্গে আপত্তিকর চ্যাটের স্ক্রিনশট উদ্ধার করা হয়েছে। যা দিয়ে বিভিন্ন সময় নারীদের ব্ল্যাকমেলিং করেছেন এবং ভবিষ্যতে ব্ল্যাকমেলিংয়ের জন্য এসব তিনি অনেকের কাছে সরবরাহও করেছেন।" 

র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার হবার পর রায়হান আলম

মামলাকে পাত্তা না দেয়া রায়হানের গ্রেফতার হবার পরের ছবি দেখলাম ফেসবুকে। হাতে হাতকড়া পরে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে, লাইভে বলা অহংকারের ছাপ মুখ থেকে মুছে গেছে, সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ভয়, আতঙ্ক। তবে খারাপ লেগেছে তার বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করে। তারা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি, বদ্ধ ঘরে দরজার ওপাশে বসে তাদের ছেলে ফেসবুকে তুমুল হইচই ফেলে দিয়েছে, আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। র‍্যাব সদস্যরা যখন রায়হানকে বাসা থেকে বের করে আনছিলেন, তখনও হয়তো তারা স্থানুর মতো বসেছিলেন এক জায়গায়, কোত্থেকে কি হয়ে গেল, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। 

রায়হানের এই কর্মকাণ্ড, তার পরিণতি- এগুলো আমাদের জন্যে শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে যারা সন্তানের বাবা-মা, তাদের জন্যে। সন্তান কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, স্কুল-কলেজে ক্লাস ঠিকমতো করছে কিনা, বাজে কোন নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে কিনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে কি করে বেড়াচ্ছে, এসব খেয়াল রাখাটা এখনকার সময়ে খুব কঠিন। আমরা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, যান্ত্রিক হয়ে গেছি। কিন্ত এতসব নজরদারী না করেও সন্তানকে আয়ত্বের মধ্যে রাখা যায়, সন্তানের বন্ধু হয়ে, কাছের মানুষ হয়ে। 

ছেলে বা মেয়ের মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকতে হবে না, দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা তার ওপর গোয়েন্দাগিরিও করতে হবে না। এত ঝামেলায় না গিয়ে তার মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস জাগিয়ে তুলুন, সম্ভব হলে সময় দিন, তার বিশ্বাস অর্জন করুন। জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটা ঘটনা যাতে সে আপনার সাথে শেয়ার করার সাহস রাখে- সন্তানের কাছ থেকে এটুকু ভরসা অর্জন করতে না পারলে বাবা-মা হওয়াটা খুব একটা কাজের কথা নয়।

ধর্ম পালনে মন থাকলে সন্তানের মধ্যেও সেটার অভ্যাস ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন। ওয়াজ-নসিহতের নামে বিনোদন নয়, ধর্মের শিক্ষা দিন ধর্মগ্রন্থ থেকে, ধর্মপ্রচারকদের জীবনী থেকে। তাকে বই উপহার দিন, হুমায়ূন পড়তে উৎসাহিত করুন, তার হাতে সমরেশ-শীর্ষেন্দু বা সুনীল তুলে দিন, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, হুমায়ূন আজাদ থেকে আহমদ ছফা- সবকিছুই পড়তে বলুন। তাকে কবিতার প্রতি আগ্রহী করে তুলুন। ছেলেকে শেখান নারীদের সম্মান করতে, মেয়েকে শেখান নিজেকে পণ্য না ভাবতে। 

রায়হান যা করেছে সেটা অন্যায় নাকি অনৈতিক, তাকে গ্রেফতার করা উচিত হয়েছে কি হয়নি- এসব নিয়ে বিস্তর তর্ক হতে পারে। তাকে গ্রেফতারে উচ্চপদস্থ র‍্যাব কর্মকর্তা কেন সিংঘামের রূপ নিতে গেলেন- এসব নিয়েও আসলে কথা শুরু করলে সেটা ফুরোবে না। কিন্ত দিনশেষে সারমর্ম একটাই- রায়হানরা গ্রহণযোগ্য কোন চরিত্র নয় এখানে। কোন বাবা-মা'ই চাইবেন না তাদের ছেলে রায়হানের মতো হোক, নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করুক, মাঝরাতে বাড়িতে র‍্যাব-পুলিশ হানা দিয়ে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাক। কাজেই আপনার সন্তানকে রায়হান ভাই বানাবেন কিনা- সেই সিদ্ধান্তের ভার কিন্ত আপনার হাতেই থাকছে... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা