অমানুষগুলো দেখতে ঠিক মানুষের মতোই, পার্থক্য শুধু শিরদাঁড়ায়। আপনাদের সবার কাছে একটাই অনুরোধ, যে যার অবস্থান থেকে এই অমানুষদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। 

ঘটনা ১

গত ২২ জানুয়ারি ঘটনা। নিজের সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি নিয়ে এক ছাত্রী ফেসবুকে পোস্ট করেন। ঘটনার বর্ননা জানা যাক তার কাছ থেকেই:

‘এরকম একটা ঘটনা রোজই ঘটে কারো না কারো সাথে, সিম্পল ব্যাপার। আমার সাথেও ঘটলো, বাবার বয়সী লোক। দাড়ি, পাঞ্জাবি, পাগড়ি পড়া আহা! উনি আমার দিকে তাকায় শিষ বাজাইলো, হাত মারলো (হস্তমৈথুন করলো)। এটা স্বাভাবিক, আজকাল এমনই হয়। অন্য সবার মতো আমিও চিৎকার করলাম, মানুষ আসলো, ধরলো-মারলো, পুলিশ এসে তাকে নিয়ে গেলো। একদল মানুষ বললো আপা ছাইড়া দেন, প্রথমবার করছে মাফ কইরা দেন। তা ভাই কয়বারের পর তাকে শাস্তি দেয়া যাবে আমাদের একটু বইলেন। কিন্তু আমি ছাড়ি নাই, আজকে আমার সামনে এই করছে পরে, এই লোক যে অন্যকারো সামনে অন্য কারো সাথে এর থেকে খারাপ কিছু করবে না, তার নিশ্চয়তা কে দিবে? এমন কিছু দেখলে বোন চুপ করে এড়িয়ে যাইয়ো না। প্রতিবাদ কইরো, এমন শিক্ষা দিও যাতে জীবনে দ্বিতীয় বার এমন করার সাহস না পায়। ভিডিওগুলো এতোই স্পষ্ট আর নোংরা যে ব্লার না করে দেয়া সম্ভব ছিলো না।’

ঘটনা ১ এর ভিক্টিমের দেয়া পোষ্ট 

ঘটনা ২

গত ২৫ জানুয়ারির ঘটনা। আরেক ছাত্রী হাসপাতালের ভিতর যৌন হয়রানির শিকার হোন। সাথে তার মা ছিলেন। তবুও এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয় তাকে। এ ব্যাপারে তিনি লিখেছেন:

‘আমি ফার্মগেট ইসলামিয়া আই হসপিটালে অপেক্ষা করছিলাম। হসপিটালে প্রবেশের পর থেকেই আমাকে এবং সাথে থাকা আমার মাকে ফলো করছিলো লোকটা। এরপর সে আমাদের সামনে এসে বসলো। তারপর থেকে সে বারবার পেছন ফিরে আমাদের তিকে তাকাচ্ছিলো এবং বারবার তার পুরুষাঙ্গে হাত দিচ্ছিলো। যারা বলবেন ভালো জামা কাপড় পড়লে এমন হতো না, তাদের বলছি। আমার শরীর পুরোটাই ঢাকা ছিলো। শরীরের কোনো অংশই দেখা যাচ্ছিলো না।’ 

ঘটনা ২ এর ভিক্টিমের দেয়া পোষ্ট 

ঘটনা ৩

গত ১৯ জানুয়ারি, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় আরেক ছাত্রী শিকার হোন যৌন হয়রানির। ঘটনার বর্ননা দিয়ে ফেসবুকে লিখেন:

‘আজ ঢাকা থেকে চট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে ট্রেনে ফিরছিলাম। একা ছিলাম। ট্রেন থেকে নামার সময় হাতে অনেক ব্যাগ ছিলো যা একাই ক্যারী করছিলাম। এক্সিট পয়েন্টে যখন টিকেট চেক করা হচ্ছিলো সেই ভীড়ের সুযোগ নেয় এক মানুষরুপী জানোয়ার। আমি প্রস্তুত ছিলাম না। হাতভর্তি ব্যাগ ছিলো তাই তখন কিছু করতে না পারলেও তার হাতের শার্টের রং দেখে নিয়েছিলাম। আর সে আমার সামনেই বেশ সাহস নিয়ে দুই দুই বার হাসলো, বিজয়ের হাসি! আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। খুব দ্রুত ভাবছিলাম। আমি জানতাম আজ আমি ইগনোর করে চলে আসলে ঠিকই দিনের পর দিন অনুশোচনা নিয়ে থাকতাম৷ দুশ্চিন্তা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অনেকগুলো নির্ঘুম রাত কাটাতাম। আর এমন মানুষরুপী জানোয়ারগুলো এভাবে বিজয়ের হাসি দিয়ে প্রশ্রয় পেয়ে আরো এক এক ধাপ করে এগোতো আর তার শেষ পরিণতি নিশ্চয়ই কোনো মেয়ের ধর্ষণ দিয়ে থামতো। দ্বিতীয়বার ভাবলাম না। তখনই আমার হাতের যত ব্যাগ ছিলো সব ছুড়ে দৌঁড়ে পিছন থেকে লোকটার কলার চেপে ধরলাম। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে বেশ কয়েকটা চড় মারলাম। সে প্রস্তুত ছিলো না। লোক জড়ো হলো। তামাশা দেখছিলো সবাই। কেউ কেউ খুব বিচারসভার ভান করে ঘটনা জিজ্ঞেস করছিলো। কেউ মোবাইল বের করে ভিডিও করার চেষ্টা করছিলো। একা মেয়ে একটু রসিকতা না করলে চলে? এসব দেখে আমি কারো সাহায্যের ধার ধারলাম না।কারণ তখন আমি জানতাম আমার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। ততোক্ষণে তারাও বুঝে নিয়েছিলো আমার তাদের দরকার নেই। আর সেই লোকও বুঝলো তার ছাড় নেই। পরে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলো। কলার চেপে জোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে সাইডে সরিয়ে নিজের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্যাগ গুলো আনতে গেলাম। ফেরার সময় একপলকে লোকটার ভয়ার্ত চেহারা দেখে নিলাম। তবে যে এই চোখে মুখে একটু আগে বিজয়ের হাসি ছিলো?

ঘটনা ৩ এর ভিক্টিমের দেয়া পোষ্টের এর প্রথম অংশ

আজকের এই ঘটনাটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত হলেও এটা এভাবে সোশ্যাল সাইটে আনার কারণ সবাইকে সতর্ক করা। হয়তো এটা আহামরি কিছু না। যারা রোজ বাসে চড়ে, হেঁটে আসে তারা রোজই এমন কিছু না কিছুর শিকার হয়। আমরা বেশীরভাগই এসব ঘটনা যতসম্ভব এভয়েড করার ট্রাই করি। কিন্তু এই ছোট ছোট ঘটনায় প্রশ্রয় পেয়ে একটা সময় এরাই ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করতে বাধে না। আজ আমি যা করলাম তারপর আমি জানি এমন কাজ আবার করার আগে লোকটা দশবার ভাববে। তাই কেউ যদি কখনো এমন কোনো ঘটনার শিকার হও সাথেসাথে প্রতিবাদ করো। ঘরে বাইরে যেখানেই এমন সিচুয়েশনে পড়বে প্রতিবাদ করো সে যেই হোক। আজকের ঘটনার পর আমি নিজের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি আমার যখন একটা মেয়ে হবে তাকে সবার আগে আমি আত্নরক্ষা কিভাবে করতে হয় তা শিখাবো। তার প্রতিটা প্রতিবাদে আমি তার পাশে থাকবো আর যদি আমার ছেলে এমন কিছু করে তাহলে তার বিরুদ্ধে স্টেপ সবার আগে আমিই নিবো। আল্লাহ সকলকে হেদায়েত দান করুক।’ 

ঘটনা ৩ এর ভিক্টিমের দেয়া পোষ্টের দ্বিতীয় অংশ

এই ঘটনাগুলো যাদের সাথে তারা যদি ব্যাপারটি তুলে না ধরতেন, আমরা কখনোই জানতে পারতাম না। আমাদের চারপাশে এমন অগণিত যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত, যা আমাদের কাছ পর্যন্ত এসেও পৌঁছায় না। সমাজ দোষ দিবে এই ভয়ে কিংবা কিংবা বাড়তি ঝামেলা এড়ানোর জন্য আমরা এসব ঘটনাকে পাত্তা দিই না। এর আগেও সোশ্যাল মিডিয়ার বরাতে এমন সব অযাচিত ঘটনার আমাদের সামনে এসেছিলো।

গণপরিবহনে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া, জামা কাপড় কেটে দেয়া, হস্তমৈথুন করা এসব যেন এখন খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। ইস্যু আসে, ইস্যু যায়, এরই মাঝে কতোকিছু ভাইরাল হয়। এবং যেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের রিএকশনও খুব সিলেক্টিভ। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানও ততোটা শক্ত নয়। না আমাদের বিচার ব্যবস্থা কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছে, না আমাদের প্রশাসন এগিয়ে এসে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে।

আমাদের নিজেদের মন মানসিকতাও খুব সংকীর্ণ এ ব্যাপারে। আমরাও যৌন হয়রানিকারীকে বাদ দিয়ে ভুক্তভোগী মেয়েদের পোষাক, চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। আমরা এমন একটা সমাজ তৈরি করে ফেলেছি, যেখানে একজন নারী যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হলে তাকেই দোষারোপ করা হয়। আর এভাবেই একজন যৌন নির্যাতনকারী নিশ্চিত হয়ে যায় তার কিছুই হবে না, না বিচার হবে, না কেউ তাকে হেয় করবে। আসলে অমানুষগুলো দেখতে মানুষরে মতোই, পার্থক্য শুধু শিরদাঁড়ায়। আপনাদের সবার কাছে একটাই অনুরোধ, যে যার অবস্থান থেকে এই অমানুষদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

আরো পড়ুনঃ এসেছে ধর্ষণরোধী মোবাইল অ্যাপ!


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা