মাত্র ৮ বছর বয়সে বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় মেয়েটির শরীর। পুরো ব্যান্ডেজ মোড়ানো শরীরে সিদ্ধান্ত নিলেন, মৃত ভাইয়ের ছদ্মবেশেই জীবনযাপন করতে হবে। নিজে বেঁচে থেকে পরিবারকে সাহায্য করবার জন্য এছাড়া কোনো উপায়ও ছিলো না তার কাছে।

কোনো এক অলস দুপুরে হাপিয়ে উঠি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবি, জীবন কতোটাই না দূর্বিষহ। এর থেকেও কি যন্ত্রণায় থাকা যায়? হয়তো খুব কষ্টে আছি, কমবেশি সবাই থাকে। নিজের পরিচয় গোপন করে বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীরে বিপরীত লিঙ্গের ছদ্মবেশে জীবনযাপন করবার দৈন্যদশায় বোধ হয় আমরা থাকি না সচরাচর।    

তখন ১৯৯২ সাল। মাত্র ৮ বছর বয়সে তার বাড়িতে বোমা হামলা হয়। মূহুর্তেই পাল্টে যায় জীবন। হামলায় একমাত্র ভাইটিকে হারান, মা-বাবাসহ নিজেও খুব বাজেভাবে আহত হন। বিকৃত হয়ে যায় মুখমণ্ডল। তখনই বুঝে গিয়েছিলেন যুদ্ধের মাঝে বসবাসের ভয়াবহতা। যুদ্ধ কিভাবে মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেয় দেখেছেন জীবনের শুরু থেকেই। সেসময়ে হাসপাতালও নিরাপদ নয়, একজন মেয়ে শিশুর জন্য তো প্রেক্ষাপট আরো ভয়াবহ। তাই ১১ বছর বয়সে সিদ্ধান্ত নিলেন মৃত ভাইয়ের ছদ্মবেশেই জীবনযাপন করবেন। নিজে বেঁচে থেকে পরিবারকে সাহায্য করবার জন্য এছাড়া কোনো উপায়ও ছিলো না। টানা ১০ বছর ছিলেন পুরুষের ছদ্মবেশে।

আফগানিস্তানের তালিবান অধ্যুষিত জন্মানোই যেন আজন্ম পাপ। মেয়েরা স্কুলে যেতে পারবে না, পড়ালেখা করতে পারবে না, ঘরের বাইরে কাজ করতে পারবে না, এমনকি বাড়ির বাইরেও যেতে পারবে না। এমতাবস্থায় তার জন্য বেঁচে থাকাটাই ছিলো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার উপর পরিবারের ভরণপোষণ। এক টুকরো রুটি যেন আসলেই পূর্ণিমার চাঁদ। যার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে প্রতিদিন।  

২০০৭ সালে এসে একটি এনজিও এর সাহায্য পান, যারা আফগানিস্তানের শিশু ও নারীদের নিয়ে কাজ করে থাকে। সে সাহায্যে বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীরের চিকিৎসার জন্য স্পেনের বার্সেলোনায় পাড়ি জমান তিনি। তখন থেকে সেখানেই বসবাস করছেন। নিজেও যুক্ত হয়েছেন একটি এনজিওর সাথে। সেখান থেকেই কাজ করেছেন চলেছেন আফগানিস্তানের সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুদের জন্য।  

নিজের আত্মজীবনী 'দ্যা সিক্রেট অফ মাই টার্বান' হাতে নাদিয়া গুলাম

২০১০ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘দ্যা সিক্রেট অফ মাই টার্বান’ এ ৩৪ বছর বয়সী নাদিয়া গুলাম এভাবেই তুলে ধরেছেন তার ভয়ঙ্কর জীবনগাঁথা। কখনো তালেবানদের রাঁধুনি, কখনো বা কৃষক সেজে দিন পার করেছেন। বোমা হামলায় আহত হবার পর বাঁচার জন্য নিজ শরীরে করাতে হয়েছে ৮টি অপারেশন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোই ছিলো শেষ ভরসা। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যান্ডেজে মোড়া শরীর নিয়ে ছুটেছেন মিশরের মমিদের মতো। তিনি তখনো বুঝে উঠতে পারেননি কী ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে তার সামনের দিনগুলোতে। 

মাথার পাগড়ি দিয়ে চুল ঢাকা লাগতো, চোখে সুরমা লাগিয়ে, বুকে শক্ত কাপড় বেধে চলাফেরা করেতে হতো। কণ্ঠস্বরেও আনতে হতো পরিবর্তন। এতোকিছু করেও বহুবার ধরা খেতে খেতেও বেঁচে গেছেন তিনি। একবার তো কৃষিকাজ করতে গিয়ে কুয়ায় পড়ে গিয়েছলেন। মরতে মরতেও নিজের পরিচয় গোপন রাখতে হয়েছিলো তাকে। আরেকবার মসজিদের ইমামের অসুস্থতায় তাকে ইমামতিও করতে হয়েছিলো। শারীরিক পরিবর্তন ঠেকাতে প্রায় ছয় মাস টানা রোজা রেখেছিলেন তিনি। তবুও তেমন কাজ হয়নি। দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো বেঁচে থাকা। এভাবেই ছদ্মবেশে লেখাপড়া করেছেন।

স্থায়ীভাবে স্পেনে বসবাস করলেও নিজের দেশে স্থায়ীভাবে ফেরত যেতে চান নাদিয়া গুলাম। মাঝেমধ্যে আফগানিস্তান গেলে, এখনো পুরুষের ছদ্মবেশেই নিজেকে নিরাপদ মনে করেন তিনি। নিজ দেশের সুবিধাবঞ্জিত নারী ও শিশুদের জন্য সরাসরি কাজ করতে চান তিনি। নিজের বই প্রকাশ করে এখন বেশ অনিরাপত্তায় ভোগেন। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও নিজের দেশেই ফিরে যেতে চান। নারী শিক্ষায় ভূমিকা রাখতে চান।

নিঃশঙ্কচিত্তে বেঁচে থাকা এই নারী যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সেটা আসলেই লার্জার দ্যান লাইফ। নাদিয়া গুলাম তার মনের জোরে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন। আমরা যেখানে খুব সহজেই জীবনের হাল ছেড়ে দিই সেখানে তিনি এমন এক যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন যেখানে বেঁচে থাকাটাই অনেক বড় একটা অর্জন। তার শরীরের ক্ষতগুলো হয়তো প্রকাশ পেয়েছে, এই কঠিন পথচলায় তার মনের ক্ষত থেকেই শক্তি জুগিয়েছেন। এমনটা পারে কয়জনা?  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা