আজ এই স্বপ্নবিলাসী মানুষের জন্মদিন। ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট ছাড়া শতভাগ ভালোবাসা এই লোকটির জন্যে।

তপু ভাইয়ের সাথে এক রাতে ইভ্যালির অফিসে গিয়েছিলাম। তখন আনুমানিক রাত ১১টা। এই রাতে যখন ঢাকা শহর শান্ত, রাস্তায় ব্যস্ত গাড়ির সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান, চায়ের টং দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; তখন ইভ্যালিতে যাওয়ার পর দেখলাম অন্য এক কাণ্ড। বিশাল এক কর্মযজ্ঞ! একদিকে ডেলিভারি দেয়ার পণ্যগুলো প্রস্তুত হচ্ছে, অন্যদিকে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করে যাচ্ছেন ইভ্যালির পেছনের মানুষজন, যাদের চোখেমুখে অদ্ভুত তারুণ্য এবং অন্যরকম প্রেরণা কাজ করছে। এতো রাতে হয়ত ক্লান্তি ভর করার কথা, একটু উদাস উদাস ভাব এসে যাওয়ার কথা। কিন্তু তাদের দেখে উদ্দীপ্তই মনে হলো৷

আমরা যখন গিয়েছি, তখনও দেখলাম ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল একটা মিটিং করছেন। এরকম মিটিং সারাদিনই তার করতে হয়৷ মজার ব্যাপার হলো, বাইরে সাক্ষাৎপ্রার্থী আরো অনেকেই বসে আছে। তারা সবাই বিভিন্ন কারণে, বিভিন্ন কাজে সিইও মোহাম্মদ রাসেলের সাথে দেখা করতে এসেছেন। রাত সাড়ে এগারোটায়ও একজন মানুষ লোকের সমস্যা শুনছেন, আর্জি শুনছেন, অনুরোধ, অনুযোগ শুনছেন - এরকমটাও হতে পারে কোনো প্রতিষ্ঠানে এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না কোনোদিন। ইভ্যালি বড় হচ্ছে দিনে দিনে, ইভ্যালির পরিসর বাড়ছে, লোকমুখে ইভ্যালি নামটা আলোচনার বিষয় হয়েছে। ই-কমার্স কী এই প্রশ্নের উত্তরও বদলে যাচ্ছে। ই-কমার্স বুঝলেও ই-কমার্সের বেনিফিট কী এটা আগে অনুভব করতে পারা যেতো না।

ই-কমার্স সময় বাঁচায়, ই-কমার্সে হরেক রকমের প্রোডাক্ট একসাথে থাকে। ই-কমার্সে অর্ডার দিলে বাসায় পৌঁছে দেয়। ভেজাল নেই। ঘরে বসেই পণ্য পাওয়ার ব্যবস্থা - খুব সাধারণভাবে বাংলাদেশে ই-কমার্স সম্পর্কে এমনই ধারণা ছিলো বেশিরভাগ লোকের। কিন্তু, লোকে এটাও খেয়াল করলো অনলাইন থেকে পণ্য অর্ডার দিলে ঘরে এসে পৌঁছে দিয়ে যায় বটে, কিন্তু প্রোডাক্টের গুণগত মান নিয়ে সন্দেহের অবকাশও থেকে যায়৷ যে দামে প্রোডাক্ট ক্রয় করা হয়েছে, সেই দামের যোগ্য পণ্য কি দেয়া হয়? আমি বেশ কবার কিছু পোশাক, কিছু টুলস কেনাকাটা করে মনে হয়েছে অনলাইন থেকে না কিনে নিজে দেখেশুনে মার্কেটে গিয়ে কিনলে এর চেয়ে ভাল কোয়ালিটি এবং এর চেয়ে কম দামেই হয়ত কিনতে পারতাম পছন্দের পণ্যটা। তাহলে ই-কমার্স থেকে কেনাকাটার বেনিফিট কী? কেন আমি ই-কমার্স থেকে কিনবো কোনো কিছু?

এই প্রশ্নটার সঠিক উত্তর খুঁজে পাই অনেকদিন বাদে, যখন ইভ্যালির নামটা শুনতে পাই৷ চায়ের দোকানে বন্ধু শাওন হাতের মোবাইল ফোনটা দেখিয়ে বলে, 'কেমন হইসে সেটটা কও?' মার্কেটে ফোনটার দাম আনুমানিক ২০ হাজার টাকার মতো। দেখতে সুন্দর। আমি বললাম, ভালোই হইসে। শাওন জিজ্ঞেস করলো,

- কত দাম এটার জানো?

- কত?

- ১০ হাজার।

- মানে কী? সেকেন্ড হ্যান্ড?

- আরেহ না মিয়া! ব্র‍্যান্ড নিউ অফিসিয়াল সেট।

- তাইলে কেমনে কী?

- ইভ্যালি থেকে কিনসি, গিফট কার্ড কিনসিলাম। একটু লেইট হইসে কিন্তু পাইসি।

শাওন তখন ইভ্যালির সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা শুনালো। সে খুবই একটা সামান্য পেটে ভাতে চলার মতো চাকরি করে। বেতন ৮/৯ হাজার টাকার মতো আসে মাসে। একটা ফোন কিনার কথা চিন্তায় ছিল। কিন্তু একসাথে এতো টাকা দিয়ে ভাল ফোন কিনার কথা ভাবতে পারতো না শাওন। কিন্তু তার ভাষ্যমতে একমাত্র ইভ্যালির কারণেই সে ফোনটা কিনার সাহস করতে পেরেছে। আমি আসলে তখনই উত্তর পেয়ে গেলাম যে ই-কমার্সের বেনিফিট আসলে কেমন হতে পারে।

ইভ্যালির কার্যক্রম তারপর থেকে নিয়মিত নজরেই থাকে। ইভ্যালির গ্রুপে প্রতিদিনই দেখি অদ্ভুত সব ব্যাপার। ২ লাখ টাকার বাইকে সাইক্লোনে মানুষ কিনে ফেলছে ৭০/৮০/৯০ হাজার টাকায়। ইয়ামাহার এক্সপেনসিভ বাইকগুলো কিনতে পারছে লক্ষ টাকার উপরে ছাড় পেয়ে। ছাড় আসে ইভ্যালির পক্ষ থেকে ক্যাশব্যাক হয়ে। আশ্চর্য এক কারবার।

মোহাম্মদ রাসেল

আজব এই কারবারের সেনাপতি মোহাম্মদ রাসেল। 'বিহাইন্ড দ্য সিন' বলি কিংবা বলি 'লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট' - দুই জায়গাতেই আপনি মোহাম্মদ রাসেলের তুখোড় পদচিহ্ন অনুভব করতে পারবেন। সেটা আরো দৃশ্যমাণ হবে যখন আপনি জানবেন প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছর বাদেই ইভ্যালি সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান (ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং) ব্র‍্যান্ড হিসেবে পুরস্কার অর্জন করেছে। মান্থলি টার্ণওভার যে প্রতিষ্ঠানের ১৫ মিলিয়ন ডলার ছাড়ায় এক বছরেই, আপনি তাদের ডেডিকেশন এবং প্যাশনকে সম্মান না জানিয়ে পারবেন না আসলে৷ হয়েছেও ঠিক তাই। আর রাসেল? তিনি অর্জন করেছেন ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং লিডারের পুরস্কার। মোহাম্মদ রাসেলের ভিশনের মতোই এগিয়ে চলছে ইভ্যালি মিশন। তিনি মার্কেটে বিশাল আওয়াজ তৈরি করতে চেয়েছিলেন কাস্টমার বেজ দাঁড় করাবার জন্যে। এখানে তিনি শতভাগ সফল। তিনি চেয়েছেন ২০২০ এর মধ্যে ইভ্যালি হবে দেশের শীর্ষ ই-কমার্স। ইতিমধ্যে ইভ্যালি নিজেদের 'দেশ সেরা ই-কমার্স' হিসেবে ব্র‍্যান্ডিংও করছে, গ্রাহক সংখ্যা এবং অর্ডার ভলিউমের কথা ভাবলে ইভ্যালিকে এই মুহুর্তের দেশসেরা ই-কমার্স বলাই যায়।

তবে সার্ভিসে? এ জায়গাতেই ইভ্যালি নিয়ে যতো কন্ট্রোভার্সি। ইভ্যালির নিজেদের নির্ধারিত সম্ভাব্য ডেলিভারি দেয়ার সময়সীমা হলো ১৫ কার্যদিবস। কিন্তু গত এক বছরে ইভ্যালি সবচেয়ে যে জায়গায় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে সেটা এই সময়ের মধ্যে ডেলিভারি দেয়া নিয়েই। আমি নিজেও একটি বাইক অর্ডার দিয়ে দীর্ঘদিন বসে আছি। তাই অপেক্ষার ফলে কি রকম মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা আমি অনুভব করি৷ কিন্তু একই সাথে এই বোধটাও আমার আছে যে, অন্য সকল ই-কমার্সের সাথে ইভ্যালির ধরণে বেশ পার্থক্য বিদ্যমান। তাই আমি ইভ্যালির সার্ভিসকে অন্য ই-কমার্সের নিরিখে মাপতে যাই না।

হয়ত ইভ্যালি বাংলাদেশে না জন্ম নিলে হয়ত অদূর ভবিষ্যতেও আমি অনলাইন থেকে আর যা-ই হোক বাইক কেনার কথা ভাবতাম না। লোকে ভাবতো না কম্পিউটার কেনার কথা, ফ্রিজ-এসি কেনার কথা। এমনকি ফার্নিচার পর্যন্ত মানুষ কিনছে ই-কমার্স থেকে এরকম কিছু দেখবো তা ভাবনাতেই আসে নি কখনো। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি ইভ্যালি থেকে মানুষ চার চাকার গাড়ি পর্যন্ত কিনছে যার দাম ১৫, ২০,৩০ লাখ কিংবা তারও বেশি। ইভ্যালিকে ১০০০ টাকা দিয়েও বিশ্বাস কর‍তে বেগ পেতো লোকে একদম শুরুর দিকে, এখন সেখানেই লোকে দশ লাখ টাকার গিফট কার্ড কিনে ১৫ লাখে গাড়ি কিনছে!

আমি যেদিন তপু ভাইয়ের সাথে ইভ্যালিতে গিয়েছিলাম সেদিন রাত ১২টার পর একজন আসলেন। তিনি ইভ্যালির একজন গ্রাহক, তিনি ইভ্যালি থেকে গাড়ি কিনেছেন। তিনি এসে অপেক্ষা করলেন এবং সুযোগ পেয়ে সিইও রাসেলকে জানালেন, রাসেল ভাই আমি চাই আমার গাড়িটা নেয়ার আগে আপনার দোয়া নিই, আপনি একটু নিচে আসবেন? গাড়ির সামনে ছবি তুলবো আপনার সাথে...

মোহাম্মদ রাসেল

মোহাম্মদ রাসেল হাসিমুখেই নিচে নামলেন। ছবি টবি তুললেন। হয়ত তিনিও তৃপ্ত হন একটা মানুষের স্বপ্নপূরণ হওয়া দেখার আনন্দে। কারণ এই লোকগুলোর সাথে সাথে মোহাম্মদ রাসেলের নিজের স্বপ্ন দেখার গণ্ডিও যে বাড়তে থাকে। তিনি প্রতিদিন কয়েকশো মেসেজ, ফোন কল রিসিভ করেন, সবাই তার কাছে সমস্যা জানাতে চায়। তার কাছে সমাধান চায় (আমিও বাইক ডেলিভারি না পেয়ে তাকে মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করেছি)। তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার জনগণের সম্পত্তি। সবার কাছেই আছে প্রায়। লোকে ভীড় করে থাকে তার মেসেঞ্জারে।

তিনি প্রায়ই লাইভে আসেন। খোলামেলা ভাবেই ইভ্যালি সম্পর্কে সব তথ্য জানিয়ে দেন। ইভ্যালি কিভাবে ব্যবসা করছে, সেলারদের সাথে সম্পর্ক কিংবা কোন ব্র‍্যান্ডের পণ্য কেনো দেরিতে আসে সব কিছুই তিনি বলে দেন। তিনি এটাও বলে দেন, বাইকে ভর্তুকি দেয় মানেই যে ইভ্যালি সব কিছুতে লস দেয় এমন না। বাইকে ছাড় দিয়ে ইভ্যালি যে মার্কেট ধরতে চায়, গ্রাহক সংখ্যা বাড়াতে চায় এটাও তিনি সরল মনেই বলেন।

সার্ভিস ইস্যুতে যে ঘাটতি আছে এটা কখনোই তিনি অস্বীকার করেন না। সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেয়ার জন্যে কখনো তিনি হুট করে ঘোষণা দেন, ৭ দিনে, ১০ দিনে সমস্ত পেন্ডিং ডেলিভারি ক্লিয়ার করবেন। কিন্তু পারেন না। অর্ডার ভলিউম এতো বেশি যে শতভাগ দিয়েও শতভাগ সন্তুষ্টি তিনি কুড়াতে পারেন না। কিন্তু চেষ্টার জায়গাতে? এখানে তাকে একটু বাড়তি নাম্বার দেয়া যেতে পারে। আপনি তাকে কখনো বিরামহীন দেখবেন না। তিনি সবসময়ই চান একটু বাড়তি মাইলেজ দিতে, এটা মিথ্যে নয়।

তবুও ইভ্যালিকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগের আমলনামার কমতি থাকে না কখনোই। দুই লাখ অর্ডার ভলিউমের দশ পার্সেন্টও যদি সময়মতো ক্লিয়ার করা না হয়, সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২০ হাজার। এই ২০ হাজার মানুষের মধ্যে ২ হাজার জনও যদি অনলাইনে অভিযোগ নিয়ে সারাক্ষণ কথা বলতে থাকে, সেটাকে বিশাল এক আওয়াজ মনে হয়। সেই সংখ্যাটাকে অনেক বড়ই মনে হয় তখন। ইভ্যালি এই দুই হাজার মানুষকে ভালভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছে কিনা সেটাই ঠিক করে দেবে সার্ভিসে কতটুকু উন্নতি করতে পারলো ইভ্যালি। কারণ, মোহাম্মদ রাসেল তো পরের পুরস্কারটা সেরা সার্ভিস দিয়েই পেতে চান! তার জন্যে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে এখনো তবে সে দম নিশ্চয়ই তিনি নিয়েই এসেছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে করলেন এমবিএ, তিনি সাবেক ব্যাংকারও। ঝুট ঝামেলাহীন একটা জীবন কাটানোর সবরকম উপাদান ছিল তার কাছে। নিয়ম মেনে অফিসিয়াল ডিউটি, মাস শেষে বেতন, বছরে হয়ত একটা ফরেন ট্যুর- ব্যাস, একদম স্বাভাবিক নিয়মের জীবন কাটানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি গ্র‍্যামার ছাড়া মানুষ, ম্যাথে ভাল আবার বোধহয় ইনটুইশনটাও খারাপ না। মগজ ও মনের ক্যালকুলেশন মিলিয়ে শুরু করলেন স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান, কারণ তার মতে ই-কমার্সই ভবিষ্যৎ। কিন্তু টিকে থাকা যাবে তো? কেনো যাবে না, অন্যরা যদি ১২ ঘন্টা কাজ করে আমি করবো ১৮ ঘন্টা! এমনই নাকি তার মানসিকতা। এই মানসিকতা তখনই সম্ভব যখন প্রতিষ্ঠানের প্রেমে তীব্রভাবে আক্রান্ত হয় কেউ৷ যখন কেউ প্রচণ্ডরকম ভালোবাসে নিজের প্যাশনকে।

মোহাম্মদ রাসেলকে কেউ কেউ ঠাট্টা বা ভালবেসে আলাদীনের চেরাগ বলে৷ কেউ বলে ম্যাজিশিয়ান। কারো ভাষায় তিনি স্বপ্নপূরণের কারিগর। কেউ তাকে ভীনদেশি বিখ্যাত কোনো ই-কমার্সের সিইওদের সাথে তুলনা করে। একজন সিইও কিভাবে স্টার হয়ে ওঠেন তা ধীরে ধীরে চোখের সামনে দেখা হয়ে যাচ্ছে মোহাম্মদ রাসেলের স্বপ্নযাত্রা দেখে। আজ এই স্বপ্নবিলাসী মানুষের জন্মদিন। ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট ছাড়া শতভাগ ভালোবাসা এই লোকটির জন্যে। প্রায় শুনি কোনো বিশ্বখ্যাত কোম্পানির সিইও পদে কোনো বাংলাদেশিকে দেখা যায় না? কিন্তু মোহাম্মদ রাসেল বাংলাদেশেই এমন এক প্রতিষ্ঠান নিজ হাতে গড়ছেন যে প্রতিষ্ঠান নিজেই বিশ্বখ্যাত হবার প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। শুভ জন্মদিন দ্য লিডার হু লিডস ফ্রম দ্য ফ্রন্ট!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা