হলিউড কিংবা বলিউডের মুভি দেখে অভ্যস্ত আমাদের চোখে অনেক কিছুই আটকে যায়। সাথে আমাদের এটাও মেনে নিতে হবে যে- বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে টেকনিকালি আমরা এখনো অনেক অনেক পিছিয়ে।

সম্প্রতি মুক্তি পেলো ঢাকা অ্যাটাকের বহুল আলোচিত সিকুয়্যাল ‘মিশন এক্সট্রিম’ এর টিজার। আসন্ন ইদুল ফিতরে এ সিনেমা মুক্তি পাবার কথা। ১ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের টিজারে বেশি কিছু দিক নজর কাড়লো। প্রথমেই নেগেটিভ দিকের পাঠ চুকিয়ে নিই। পরে আসছি কী কারণে বর্তমানে এ সিনেমাগুলোই দরকার- তার ব্যাখ্যায়।

হলিউড কিংবা বলিউডের মুভি দেখে অভ্যস্ত আমাদের চোখে অনেক কিছুই আটকে যায়। সাধারণত প্রথম টিজারে রহস্যঘেরা একটা আমেজ তৈরি করা হয় সাসপেন্স থ্রিলারের ক্ষেত্রে। অন্য জনরার মুভির জন্য মুভির মূল আকর্ষণগুলোই স্বল্প পরিসরে টুকে নেয়া হয়। এই টিজার কিংবা ট্রেইলার বানানোর জন্য আলাদা হাউজই থাকে। একটা ডেডিকেটেড টিম থাকে যাদের কাজই শুধু ট্রেলার/ট্রিজার/প্রমো এসব বানানো। এসব দিক থেকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে।

ফিরছি টিজার প্রসঙ্গে- মিশন এক্সট্রিম এর পুরো টিজার দেখে মনে হলো খুব জোর করে একটি ভিডিও কোলাজ বানিয়ে দেয়া হয়েছে। অযাচিত ড্রোন শট, দুর্বল ভিএফএক্স, কালার গ্রেডিং এর ওঠানামার ব্যাপারগুলো বেশ দৃষ্টিকটু ছিলো। কী কারণে তারা এই টিজার বানালো সেটাও বোধগম্য নয়। একতরফাভাবে আরিফিন শুভকেই প্রমোট করা হলো শুধু। তাতেও খেয়াল করলাম মরুভূমিতে হামাগুড়ি দেয়ার দৃশ্যে শুভর স্টাইলিং সালমান খান এর করা টাইগার চরিত্রটির মতো লাগছে। আবার শুভ যখন ‘আর উই রেডি’ বলে চিৎকার দিলো, দেখে মনে হলো দৃশ্যটি উরি দ্য সার্জিকাল অ্যাটাকে করা ভিকি কৌশালের ‘হাও ইজ দ্য জোশ’ এর মতোই লাগছে। হয়তো অনুপ্রেরণা নেয়া হয়েছে, তবে স্বকীয়তা বজায় রাখলে আরো বেশি ভালো লাগতো। সর্বোপরি, ডিসেন্ট স্ট্যান্ডার্ড এর কথা চিন্তা করলে প্রমোশনাল টিজার হিসেবে দুর্বল মনে হয়েছে। আশা হয়তো বেশি ছিলো তাই।

মিশন এক্সট্রিম সিনেমার টিজারের কিছু দৃশ্য

এবার আসি কিছু প্রাসঙ্গিক আলাপে। এতকিছু বলার পরেও, এই সিনেমাগুলোই আমাদের বেশি দরকার। কেন জানেন? বর্তমানে বাংলাদেশী ফিল্ম ইন্ডাজট্রির যে দুরাবস্থা তাতে মানি ইজ দ্য বিগেস্ট মোটিভেশন। টানা আট-দশটা ব্যবসাসফল সিনেমা মুক্তি পাক, দেখবেন প্রেক্ষাপট বদলাতে শুরু করেছে। আর এদেশে ব্যবসাসফল সিনেমার জন্য যে হাহাকার তৈরি হয়ে থাকে সেটা মেটানোর জন্য মিশন এক্সট্রিমের মতো সিনেমাগুলোরই দরকার। আমাদের মেনে নিতে হবে যে- বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে টেকনিকালি আমরা এখনো অনেক অনেক পিছিয়ে। এমনকি আমরা বলিউডের আশেপাশেও নেই। আমাদের দেশে প্রযুক্তির অভাব, বাজেটের অভাব, দক্ষ নির্মাতা কিংবা কলাকুশলীও নেই তেমন একটা।

হলসংখ্যাও একদমই সীমিত এখন। ডেইলি স্টারের একটা প্রতিবেদনে পড়লাম বর্তমানে বাংলাদেশে সিনেমা হলসংখ্যা এখন মাত্র ৭০টি। দুই তিন বছর আগেও ২৫০টি সিনেমা হল ছিলো। বাংলাদেশে অনেক শহর আছে যেখানে সিনেমা হলই নেই। অথচ পাশের দেশেও রাজ্যভিত্তিক সিনেমাগুলো শত কোটির উপর ব্যবসা করে। তার ওপরে দর্শক হিসেবে আমরা সিনেমা হল বিমুখ। অথচ মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে আমরা যারা নিয়মিত যাই ফরেন সিনেমা দেখতে। দর্শক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়বদ্ধতা থেকে যায়। দেশীয় সিনেমা দেখবো না, শুধু সমালোচনা করবো- এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। একটা ফিল্ম ইন্ডাজট্রি যদি আর্থিকভাবে সফলতা অর্জন করতে পারে তবেই ভালো সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেয়ার সাহসটা পাবে।

আমাদের দেশে কিন্তু দর্শক টার্গেট করেই সিনেমা বানানো হয়ে থাকে। একটু ভাবুন তো কারা নিয়মিত দেশী সিনেমা দেখতে হলে যায়? আপনার আমার মতো সিনেমা বোদ্ধারা? না। খেটে খাওয়া মানুষ। যারা নিছক বিনোদন ছাড়া কিছুই চায় না। যেকোনো উৎসব বা ছুটিতে তারা সিনেমাকে বেছে নেয় ক্লান্তি দূর করতে। বাংলাদেশের এই ওয়ার্কিং ক্লাস পিপলদের সাথে আমাদের মতো সিনেমা বোদ্ধাদের টেস্ট বাড অবশ্যই মিলবে না। উল্টো শুরু হবে দ্বন্দ। এখানেই মিশন এক্সট্রিমের মতো সিনেমাগুলো একটা মিচুয়াল স্ট্যান্ড তৈরি করে দিতে পারে।

নব্বইয়ের দশকে ঐসব দর্শকদেরই অশ্লীল সিনেমা গুলিয়ে খাইয়ে দেয়া হয়েছিলো। সেই দৃশ্যপটের প্রত্যাবর্তন হয়েছে। দর্শকের রুচিরও পরিবর্তন এসেছে। এই অবস্থা থেকে চাইলে আরেকটু নার্চার করে আমরা ভালো একটা অবস্থানে যেতে পারি। তবে ব্যবসায়িক সাফল্য ছাড়া ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন অসম্ভব। এতে নির্মাতাদের যেমন দায়  রয়েছে, দর্শকদের এগিয়ে আসার সময় হয়েছে।

বাংলাদের সিনেমা ইন্ডাষ্ট্রির এ অবস্থায় কিভাবে নিজেদের সিনেমা দেখে বিশ্বমানের সাথে তুলনা করতে পারি বলুন। আমাদের প্রথমে তুলনা করতে হবে নিজেদের কাজের সাথেই। সেই তুলনা করলে, সুন্দরবনের সিংহ দেখার চাইতে মিশন এক্সট্রিম দেখাই কি ভালো নয়?  

 

  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা