পুরুষদের নাকি কাঁদতে নেই, আবেগে ভাসতে নেই, নিজের মনের ব্যথা পুরুষদের বলতে নেই - সমাজের বানানো কত নিয়ম। আহারে, বাইরে নিজেকে শক্তিশালী দেখাতে গিয়ে ভেতরের ঝড় কতভাবে যে লুকান একজন পুরুষ তা কে জানবে....

৪৫ বছরের কম বয়সী পুরুষরা সবচাইতে বেশি যে কারণে মৃত্যুবরণ করেন, তা হলো আত্মহত্যা। সমাজ আমাদেরকে যেভাবে ভাবায়, কিংবা ভাবতে বাধ্য করে একজন পুরুষের মনোজগৎ কি আসলেই সেভাবেই চলে? একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা হয়েছে, পুরুষ মানেই শক্ত মানসিকতার, পুরুষ মানেই কান্না করা লজ্জার, পুরুষ মানেই গাম্ভীর্য, পুরুষ মানেই আবেগের পরিমিতি।

ছোটবেলা থেকেই আসলে ছেলেদের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। আমি মাঝে মধ্যে খেয়াল করি, বাচ্চা একটা ছেলে কাঁদছে। তাকে বাবা মা কান্না থামাতে বলে এইভাবে যে তুমি না ছেলে, ছেলে হয়ে কাঁদে! কি লজ্জা, কি লজ্জা! বড় হতে হতে চারপাশ দেখে একটা ছেলে যুবক হয়ে উঠতে উঠতে তার আরো বদ্ধমূল ধারণা হতেই পারে, যে যত টাফ সে তত বেশি শক্তিশালী, তত বেশি পুরুষ। বাইরের জগতে নিজেকে দৃঢ়চেতা দেখাবার জন্যে ভেতরে ভেতরে একজন পুরুষকে কতবার ভেঙ্গেচুরে একাকার হয়ে যেতে হয় তা বোধহয় ওই পুরুষটাই জানে।

নিজের খোলসে পুরুষরাও লুকিয়ে থাকে


আমি অনেক সময় খেয়াল করি, বন্ধুদের মধ্যে কোনো ছেলে যদি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়েও থাকে কোনো কারণে অন্যরা কেউ কেউ তাকে খোঁচা দেয়৷ কেউ কেউ বলে শালা একটা 'সেন্টিখোর'। তাই ভেতরটা চুরমার হয়ে গেলেও সেন্টিমেন্ট শো করার জায়গা থাকে না, টাফ এন রাফ ভাব নিয়ে চলতে হয় কিংবা ভান ধরতেই হয়।

এইরকম একটা সমাজে আমাদের বসবাস যেখানে পুরুষরাও প্রতিনিয়ত মানসিক টর্চার পোহায়, যেখানে পুরুষেরও মনোজাগতিক লড়াই চলে প্রতিনিয়ত সমাজের সাথে, সম্পর্কগুলোর সাথে। সেখানে কেউ একটা খারাপ টাইমলুপ ওভারকাম করতে না পেরে আত্মহত্যা করে বসলে লোকে তখনো তাকে জাজমেন্ট করে যায়। তখনো মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা থাকে না। কেউ কেউ আফসোস করে, কই আগে তো বুঝিনি, আগে যদি জানতাম...

আগে জানলেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আমরা এরকম সিচুয়েশনে কাউকে সত্যিকার অর্থে সাহায্য করতে পারি না। কারণ, পুরুষ মানুষ বলে এটা করা যাবে না, ওটা বলা যাবে না, ওরকম আবেগী হওয়া যাবে না, কাঁদা যাবে না ইত্যাদি কত খোলসে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আটকে থাকে। পুরুষ মানুষকে দায়িত্বশীল আচরণ করে যেতে হবে, ওসব মন খারাপ, ডিপ্রেশন পুরুষের জিনিস নয়। কেউ ওরকম ভেঙ্গে পড়লে তার প্রতি সমর্থনও চলে যায় বাকিদের। কারণ, পুরুষদের এমন হতে হবে যেন সবসময় ভরসা হয়ে থাকা যায় অন্যদের।


পুরুষরা অনেক কারণেই মনের কথা বলতে পারে না, আবেগগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে না। যেমন-

১। শৈশবের বাজে কোনো অভিজ্ঞতা অনেকদিন ধরে মনে থেকে যেতে পারে। কিছু কিছু ঘটনার সাথে হয়ত লজ্জাজনক, অপমানজনক কিংবা ভয়ের কোনো অভিজ্ঞতা জড়িয়ে থাকতে পারে। কোনো ছেলের যদি শৈশবে এমন কোনো অভিজ্ঞতা থাকে, খুব সম্ভাবনা থাকে যে বড় হয়েও এই অভিজ্ঞতার প্রভাবে তার আবেগ প্রকাশের ধরণে সমস্যা হতে পারে। কেউ হয়ত মাত্রাতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হতে পারে, কেউ হতে পারে মাত্রাতিরিক্ত খিটমিটে।

২। দূর্বলতা প্রকাশের ভয়ও পুরুষদের সঠিক আবেগ প্রকাশ করতে বাধা দিতে পারে। অনেকসময়ই একজন পুরুষ অনেক কিছু প্রকাশ করতে গিয়েও করেন না, বলতে গিয়েও বলেন না। তার মনে অন্যের দ্বারা জাজমেন্ট হবার ভয় কাজ করে, তার মনে হতে পারে মনের ভেতরকার সহি অনুভূতির কথা প্রকাশ করে ফেললে লোকে এটাকে দূর্বলতা ভেবে নিতে পারে। একারণে অনেক পুরুষের ভালবাসার প্রকাশের ধরণ একেবারে ভিন্ন হয়। বুকের ভেতর মোমের মতো গলগলে অনুভব অথচ বাইরে কি গাম্ভীর্য ধরে রাখার চেষ্টা দেখা যায় কিছু মানুষের মধ্যে।

৩। প্রিয়তম সঙ্গীর কাছে নিজেকে মানসিকভাবে শক্তিশালী দেখাবার জন্যে এবং তার আস্থা হয়ে তাকে রক্ষা করবার জন্যে অনেকসময় একজন পুরুষ নিজের অনুভূতি লুকিয়ে ফেলেন। তিনি এমন কোনো কথা বলতে চান না কিংবা এমন কোনো দুশ্চিন্তার ভাগ প্রিয় মানুষটাকে দিতে চান না যাতে সেই মানুষটা তার জন্যে কষ্ট পায়, তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে শুরু করে। শুধু অন্যের মানসিক সুস্থতার জন্যেও একজন পুরুষ নিজের উপর অমানসিক চাপ সয়ে নিতে পারে।

৪। আপনার সবচেয়ে বড় সমস্যাটাই কারো কারো কাছে হাসাহাসির টপিক হয়ে যেতে পারে। আপনি অন্যদের মতো শক্ত মানসিকতার না, আপনি ডিপ্রেসড, আপনি আবেগী। আপনি বেশিই ইমোশনাল। শুধু একারণেই আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি হতে পারে। এবং আপনি তাদের এই হাসাহাসিটাও সামনাসামনি সহ্য করে নিলেও ভেতরে ভেতরে চরম কষ্ট পান। তাই, এধরণের কষ্ট থেকে নিজেকে বাঁচাতে অনেকসময় আপনি নিজের আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করতে চান না। কারণ, বিশ্বাসী মানুষরাই আপনার বিশ্বাস ভাঙ্গে সবচেয়ে বেশি।


৫। কিছু কিছু ছেলেদের মানসিক বিকাশ অনেক দেরিতে হয়, স্বাভাবিকের চাইতেও। তারা আবার বাস্তববাদী না হয়ে একটু ফ্যান্টাসিতে ভোগে। একটু শিশুসুলভ আচরণ থাকে, আবদার থাকে প্রচুর। তারা জীবনটাকে সহজভাবে দেখে। এবং এজন্যে প্রচুর কথাও শুনতে হয় তাদের। একটা সময় তারা মানুষের কথা শুনতে শুনতে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। তারা তখনো হয়ত ম্যাচিউরড হয় না, কিন্তু কষ্টগুলো নিজের মধ্যে রাখতে শিখে যায়। কারণ, সে যে পুরুষ, সব কিছু শেয়ার করা তার উচিত নয়...

৬। মিডলাইফ ক্রাইসিস কিংবা মানসিক অসুস্থতার জন্যেও একজন পুরুষ নিজের আবেগকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। মনের মধ্যে অনেক কথা জমে, অনেক ভাবনা, কিন্তু প্রকাশের ক্ষেত্রে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। এসময় পুরুষরা অন্যদের সাথে মানসিক দূরত্ব অনুভব করে। কেমন যেন নিজেকে বেমানান লাগে তার এই সমাজের কাছে, নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়, অন্যদের সাথে হয়ত স্বাভাবিক প্রাত্যহিক যোগাযোগ আছে বটে, কিন্তু এই পুরুষ কোথাও নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। কেউ টের পেত, যদি দেখত ভাল করে তাকিয়ে তার অন্যমনষ্কতার দিকে..

এছাড়া আরো অসংখ্য কারণ আছে, পুরুষদের সাইকোলজি নিয়ে কথা বলতে গেলে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা লেখায় শেষ করা সম্ভব নয়, একাধিক লেখার অবতারণা ঘটাতে হবে। কিন্তু, এখন কেবল একটা কথাই বলে যাই, পুরুষ মানুষদের প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনুন প্লিজ, কোনো পুরুষ কাঁদতে চাইলে কাঁদতে দিন, মন খুলে নিজের কথা বলতে দিন৷ তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও ভাবুন, কথা বলুন। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা