জীবনভর মাশরাফি পাগলামি করেছেন দেশের জন্য, দলের জন্য, উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে। সেই মানুষটাকে তার ভালোবাসার একটা জিনিস ফিরিয়ে দিতে পেরেছি আমরা, এটুকুই তো বিশাল প্রাপ্তি!

জিনিসটার মধ্যে স্পেশাল কিছু নেই। মাশরাফি বিন মুর্তজার হাতে যে এটা এত বছর ধরে আছে, পাঁড় ভক্ত না হলে সেটা নোটিশ করার কথাও নয়। সাদা রঙের একটা ব্রেসলেট, যেটার গায়ে মাশরাফির নাম খোদাই করা। খুব প্রিয় জিনিস এটা মাশরাফির, সেটাই তিনি নিলামে তুলেছিলেন করোনায় দুর্গতদের সাহায্য করার জন্যে। সেই ব্রেসলেট বিক্রি হয়েছে ৪২ লক্ষ টাকায়! আরও অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে, ব্রেসলেটটা কিনে মাশরাফিকেই আবার গিফট করছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিএলএফসিএ! 

অকশন ফর অ্যাকশনের আয়োজিত এই নিলামে ব্রেসলেটটির ভিত্তিমূল্য ছিল পাঁচ লাখ টাকা। রাত দশটা নাগাদ সেটার দাম ওঠে সাড়ে এগারো লক্ষ টাকায়। শেষ পর্যন্ত ৪০ লক্ষ টাকায় সেটি কিনে নিয়েছে বিএলএফসিএ। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাড়িয়ে দিয়েছে আরও ৫ ভাগ। তাতে চূড়ান্ত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪২ লাখ টাকা। এই অর্থ দিয়ে মাশরাফির ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সহায়তা করা হবে করোনাভাইরাসের এই দুঃসময়ে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষদের।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাশরাফি ভক্তদের অনেকেই সকাল থেকে বলাবলি করছিলেন, যদি পারতাম আমরাই এই ব্রেসলেটটা কিনে আবার মাশরাফিকে গিফট করতাম। দুই-একজন নয়, অনেকেই এই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্ত সাধ থাকলেও, এই মানুষগুলোর সাধ্য ছিল না হয়তো। কিন্ত প্রকৃতির বিচিত্র খেয়াল দেখুন, মাশরাফির প্রিয় ব্রেসলেটটা তার হাতেই থাকছে! ব্রেসলেট কেনার পরে ফেসবুকে মাশরাফির সঙ্গে লাইভ কনভার্সেশনে বিএলএফসিএর চেয়ারম্যান মমিন উল ইসলাম জানিয়েছেন, এই ব্রেসলেট কিনে নিয়ে তারা আবার মাশরাফিকেই উপহার দিতে চান! করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমে এলে তখন একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এই ব্রেসলেট তুলে দেয়া হবে মাশরাফির হাতে। 

এই সেই ব্রেসলেট

এই ব্রেসলেটের সঙ্গে মাশরাফির প্রায় পুরোটা ক্যারিয়ার জড়িয়ে আছে। দেড়যুগ আগে, মাশরাফি তখন জাতীয় দলে নতুন মুখ, তখন এক বন্ধুর মামাকে দিয়ে ব্রেসলেটটা বানিয়েছিলেন। মাশরাফি তখন আগুয়ান এক পেসার, তার গতি, রানআপ নিয়ে তার ছুটে আসা ভয় ধরাতো ব্যাটসম্যানের হৃদয়ে। কলার উঁচু করে মাশরাফি ছুটে আসছেন, তার হাতে চকচক করছে রূপালী রঙের ব্রেসলেটটা- এমন দৃশ্য এদেশের ক্রিকেট দেখেছে অজস্রবার। হয়তো ক্যামেরা জুম করা হয়নি সেভাবে, মানুষের চোখেও পড়েনি ব্রেসলেটটা। কিন্ত আজকের রাতে সবটুকু আলো তো এই সাদামাটা দেখতে জিনিসটাই কেড়ে নিলো! 

মাশরাফির সঙ্গে এই ব্রেসলেট গোটা দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ইংল্যান্ড, আফ্রিকা থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ অথবা ভারত থেকে দুবাই- সর্বত্র মাশরাফি সঙ্গে রেখেছেন এই ব্রেসলেট।বিডিনিউজে মাশরাফির একটা ইন্টারভিউ পড়ছিলাম, ব্রেসলেটের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন- 

“গত ১৮ বছরে খুব কম সময়ই এটি খুলেছি হাত থেকে। অপারেশনের সময়, এমআরআই করানোর সময় খুলতে হয়েছে। আর কয়েকটি ম্যাচ বা কিছু সময়ের জন্য খুলেছি শুধু। তবে যখনই খুলেছি, কখনোই স্বস্তি বোধ করিনি। মনে হতো, কী যেন নেই, খালি খালি লাগত। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, এটি আমার সৌভাগ্যের প্রতীক।”

“আমার ক্যারিয়ারের সব উত্থান-পতনের স্বাক্ষী এই ব্রেসলেট। যত লড়াই করেছি, মাঠের ভেতরে-বাইরে যত কিছুর ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, সব কিছুর স্বাক্ষী এটি। আমার ১৮ বছরের সুখ-দুঃখের সাথী। আমার অনেক আবেগ-ভালোবাসা জড়িয়ে এটিতে, এই ব্রেসলেটকে আসলে ব্যাখ্যা করা আমার জন্য খুব কঠিন।”

এই ব্রেসলেট হাতে দুনিয়া চষে বেড়িয়েছেন মাশরাফি

নিজের ভীষণ পছন্দের জিনিসটা মাশরাফি হাতছাড়া করতে রাজী হয়েছেন কেবল সেটা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ মানুষের বিপদে কাজে লাগবে, এই ভেবে। ক্যারিয়ারজুড়ে মাশরাফি দলের জন্যে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে গেছেন, ইনজুরির দিকে তাকাননি, শরীরের মায়া করেননি, সার্জারির বেড থেকে উঠে আবার ছুটেছেন মাঠে, হাঁটুতে টেপ জড়িয়ে খেলেছেন, ব্যথায় আর্তনাদ করেছেন, কিন্ত একটা রান বাঁচানোর জন্যে ঝাঁপ দিতে দ্বিধা করেননি কখনও। 

সেই মানুষটাকে যখন বলা হলো, আমরা এই ব্রেসলেটটা আপনাকে গিফট দিতে চাই- দুই সেকেন্ডের জন্যে তার চেহারাটা দেখে হঠাৎই চোখটা জ্বালা করে উঠলো। মাশরাফি মুখ ঢাকলেন মুহূর্তের জন্য, হাসলেন একদফা, এই ভালোবাসার জবাবে কি বলবেন, সেটা নিয়েও বোধহয় একটু ভাবলেন। শেষমেশ ধন্যবাদেই কাজ সারলেন, কিন্ত আমরা জানি, বুকের ভেতর আবেগের এক বরফ গলা নদী ততক্ষণে বইতে শুরু করেছে তার। যতোই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন, মাশরাফিকে আমরা চিনি, এমন ভালোবাসায় মাশরাফি সিক্ত না হয়ে পারেন? 

বিএলএফসিএ এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মমিন উল ইসলামকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা। তারা না থাকলে এমন চমৎকার একটা স্মৃতি থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম হয়তো। জীবনভর যে মাশরাফি আমাদের শুধু দিয়ে গেছেন, এখনও দিয়ে চলেছেন, মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন, তাকে তার ভালোবাসার ব্রেসলেটটা গিফট করা গেছে বিএলএফসিএ'র কল্যানে, ধন্যবাদ তো তাদের প্রাপ্যই!  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা