মন খারাপ থাকা আর ডিপ্রেশন এক জিনিস না। মন খারাপ থাকলে সবাই বুঝবে, দেখেই বুঝবে। যার ডিপ্রেশন হয়, সে খুব ভালো করেই জানে, সে যতই বলুক তার দমবন্ধ টাইপ কষ্টের কথা, ভেতরে ভেতরে শূন্যতার কথা, কেউ বুঝবে না।

বলিউডের শীর্ষ নায়িকা দীপিকা পাড়ুকোন তার কোনো এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ''আমাকে সবাই বলে তুমি এক নাম্বার নায়িকা। জীবনে যা যা দরকার, সব আছে তোমার। গাড়ি বাড়ি সব। তোমার ডিপ্রেশন হয় কীভাবে? তোমাকে দেখেও তো মনে হয়না তোমার ডিপ্রেশন''

মন খারাপ থাকা আর ডিপ্রেশন এক জিনিস না। মন খারাপ থাকলে সবাই বুঝবে, দেখেই বুঝবে। মন খারাপ অনেক বেশি বস্তু আর পারিপার্শ্বিক নির্ভর এক ধরণের ইমোশন। যেমন- পার্টনারের সাথে ঝগড়া হলো তাই মন খারাপ। টাকার অভাবে প্রিয় জামাটা কিংবা প্রিয় বাইকটা কিনতে পারছেন না, মন খারাপ। কেউ একজন খোঁচা দিয়ে কথা বলেছে, মন খারাপ। প্রিয় বন্ধু মিথ্যা বলেছে, তাই মন খারাপ।

কিন্তু ডিপ্রেশনে থাকা মানুষটার যেই মন খারাপটা হয় , সেটা কেউ বুঝবে না। ইনফ্যাক্ট ডিপ্রেশনে থাকা মানুষটা সবার আগে চেষ্টা করবে, কেউ যেন তার ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া হৃদয়টা না দেখতে পায়। কেন জানেন? কারণ ডিপ্রেশন শুধু দুই ধরণের লোক বুঝতে পারে- 
১। ডাক্তার, সাইকোলজিস্ট, থেরাপিস্ট ইত্যাদি।
২। যার ডিপ্রেশন হয় শুধুমাত্র 'সে'

যার ডিপ্রেশন হয়, সে খুব ভালো করেই জানে, সে যতই বলুক তার দমবন্ধ টাইপ কষ্টের কথা, ভেতরে ভেতরে শূন্যতার কথা, কেউ বুঝবে না। সবাই ব্ল্যান্ক একটা দৃষ্টি দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারপর শেষে তাকে নানাবিধ উপদেশ দিবে। যেই উপদেশ এর সাথে ডিপ্রেশন ভালো হয়ে যাবার কোনো সম্পর্কই নেই। ধরেন কেউ বললো আমার 'ডিপ্রেশন' আছে, তখন যে শুনলো সে বলবে- 'সব ঠিক হয়ে যাবে, আল্লাহর নাম নাও'। অথবা 'নিজের বাবা-মা কিংবা বাচ্চার দিকে তাকিয়ে সুখে থাকার চেষ্টা করো।'

আরে বাবা, এটা একটা অসুখ। অসুখের চিকিৎসা দরকার। আপনার জ্বর হলে শুধু বাবা-মা আর বাচ্চার দিকে তাকিয়ে আল্লাহর নাম নেন? তাতে জ্বর ভালো হয়ে যায়? ওষুধ পথ্য নেবার সাথে সাথে হয়তো আল্লাহর নাম নেন, সেটা ঠিক আছে। বাচ্চা কাচ্চার কথা চিন্তা করে হয়তো ওষুধ খেয়ে তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে যেতে চান, সেটাও ঠিক আছে। যাই করেন, সাথে কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুযোগ সুবিধা সব নিচ্ছেন। নিচ্ছেন না? তাহলে ডিপ্রেশনে শুধু মোটিভেশনাল স্পিচ শুনে একটা মানুষ সুস্থ্য হবে কীভাবে? হবেনা।

কারণ ডিপ্রেশন একটা রোগ- সমস্যা হলো এটা একটা মানসিক রোগ, তাই কেউ দেখেনা। দেখতে পায়না বলে এই রোগের অস্তিত্ব নেই, তা কিন্তু না। পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ এই রোগে ভুগছে। আপনি এই রোগ নিয়ে হাসাহাসি করেন, মানেন কিংবা না মানেন। তাতে কিছু যায় আসেনা। এই রোগ বাড়ছে। বাড়তেই থাকবে।

যেহেতু এই রোগ আপনার নেই, এই জিনিস হলে কী হয় আপনার ধারণা নেই। তার উপর আপনি ডাক্তার-সাইকোলজিস্ট না, তাই কীভাবে কী সাহায্য করবেন তাও জানেন না। সেক্ষেত্রে আপনি একটা কাজ করতে পারেন। কাজটা হলো- মুখে কুলুপ এঁটে তাদের কথা শুনুন। শুধু শুনুন। কিছু বলবেন না। জাজ করবেন না। উপদেশ দিবেন না, যদি না সেটা চিকিৎসা রিলেটেড হয়। শুধু শুনুন! তাকে নিয়ে যদি সাইকোলজিস্টের কাছে না যেতে পারেন, সেটাও হবে। শুধু তার পাশে থাকুন। প্লিজ, তাদের মন খারাপের গল্পগুলো শুনুন। যত স্টুপিড হোক, যতই ঢং লাগুক, তবুও শুনুন। 

আর তারা যদি বলতে না চায়, তাহলে বলবেন- আপনি শুধু শুনবেন, আর কিছু না। লেট্ দেম স্পিক্ আউট। শোনার পর যদি আপনি তার বান্ধবী হন, তাহলে পরে আবার তাকে নিয়ে কুটনামি করবেন না। যদি তার বন্ধু হন পরবর্তীতে তাকে নিয়ে বন্ধু মহলে হাসাহাসি করবেন না। এভাবে আপনি তাকে আরো ভেঙ্গে দেবেন। তার বিশ্বাস, তার আস্থা, তার মন, সব ভেঙ্গে দেবেন। মানুষের মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙা সমান। যদি আপনার সামনে একটা ভাঙা মসজিদ থাকে? তখন কী করবেন? এক টুকরো ইট দিয়ে হলেও সেই মসজিদটাকে ঠিক করে ফেলার চেষ্টা করবেন, তাইনা? ডিপ্রেশনে ভোগা সেই চাপা মানুষগুলোর কথা আপনি শুনলে হয়তো সেই ভাঙা মসজিদে এক টুকরো ইট দেয়া হবে। আপনি শুনলে তার পুরোনো ঘায়ে মলম দেয়া হবে। আপনি শুনলে, কোনো এফোর্ট ছাড়াই তার বড় একটা উপকার করে ফেললেন।

Please listen to them, show them that you care. Don’t ask them ‘why’ or ‘how’. Depression is not a straight forward answer.. it has never been.


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা