যে লড়াইয়ে ট্রাম্প গো-হারা হেরেছেন, পুতিন হারছেন, ফ্রান্স-স্পেন-ইতালি মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে, সেখানে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে জেসিন্ডা আরদার্নের সরকার নিউজিল্যান্ডকে রক্ষা করেছে করোনার তাণ্ডব থেকে!

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত 'দ্য আটলান্টিক' ম্যাগাজিন একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরদার্নকে নিয়ে। সেটার শিরোনাম দেয়া হয়েছে- ‘পৃথিবীর সবচেয়ে উপযোগী নেতা’। মূলত করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে জেসিন্ডার লড়াইটাকেই ফোকাস করা হয়েছে সেই লেখায়, বলা হয়েছে, কিভাবে যথাসময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে নিউজিল্যান্ডকে করোনার তাণ্ডব থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন জেসিন্ডা এবং তার সরকার। 

করোনাভাইরাস সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নিচ্ছে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার, সেই সঙ্গে একটা দেশের সরকাত এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থারও। যে পরীক্ষায় আমেরিকার মতো দেশ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাও ডাহা ফেল মেরে বসেছেন। হেরেছে ইউরোপের উন্নত দেশ স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স সহ সবাই। বৃটেন বা কানাডার অবস্থাও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়, অস্ট্রেলিয়াতে করোনা ছড়িয়েছে, যদিও সেটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। 

অন্যদিকে স্রোতের একদম বিপরীতে দাঁড়িয়ে করোনাভাইরাসকে হারানোর অসম্ভব এক যুদ্ধে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরদার্ন। নিউজিল্যান্ডে দুই মাসে করোনা পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ১৪৯৯ জন, এদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৪৩৩ জনই। মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। গত ৪৮ ঘন্টায় নতুন কোন আক্রান্ত নেই, এটাকে বড়সড় সাফল্য হিসেবেই দেখছে ওয়ার্ল্ডোমিটার। 

করোনার বিপক্ষে এই লড়াইয়ে জেসিন্ডা বরাবরই নিজের চারপাশে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ লোকজনকে রেখেছেন, সরাসরি নেতৃত্ব দেয়ার বাহাদুরিতে তিনি যাননি, প্রতিটা জায়গাতে প্রশিক্ষিত এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থাপনা, বিদেশফেরতদের বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখা, ঝুঁকিতে থাকা সব মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসাদের লোকজনকে শনাক্ত করা- এসব ব্যবস্থার কারণেই নিউজিল্যান্ডে করোনা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। 

জেসিন্ডা আরদার্ন

ধাপে ধাপে লকডাউনের সময়সীমা না বাড়িয়ে জেসিন্ডার সরকার একেবারে এক মাসের লকডাউন পালনের অনুরোধ জানিয়েছে জনগণের কাছে। হ্যাঁ, অনুরোধ, আদেশ নয়। টেলিভিশন চ্যানেলের গুরুগম্ভীর ভাষণ নয়, এক সন্ধ্যেয় ঘরোয়া জামা পরে জেসিন্দা হাজির হয়েছেন ফেসবুক লাইভে, পরনে তখন মলিন একটা গাউন। এসেই বলেছেন, বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছেন, কিছু কথা বলতে চান জনগণের উদ্দেশ্যে- এই যে সিম্পলিসিটিটা, এটা আর কোন রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে?

ফেসবুক লাইভের সেই বক্তব্যে জেসিন্ডা বলেছেন, ‘নিজেকে একটি বাবলের মধ্যে রাখুন। পরিবারের সদস্য, অফিস সহকর্মী কিংবা যাদের ছাড়া আপনার চলবেই না তাদেরকে সেই বাবলের ভেতরে রেখে অন্য সব মানুষ থেকে দূরে থাকুন। এমন আচরণ করুন যেন আপনি ইতোমধ্যেই কোভিড-১৯’এ আক্রান্ত। তাই হাতেগোনা মানুষ ছাড়া বাবলের বাইরের কারো সঙ্গে মিশবেন না। বাবলের বাইরে গেলে আপনি বাকিদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটাবেন। তাই প্রিয়জনদের সুরক্ষার জন্য ঘরে থাকুন।’

গত এক মাসে কয়েক দফায় ফেসবুক লাইভে এসেছেন জেসিন্ডা, দুঃখ প্রকাশ করেছেন অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতির জন্য। সবাইকে বুঝয়েছেন, এই যুদ্ধটা কারো একার নয়, এখানে সবাইকে লড়তে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে, দৃঢ় গলায় জেসিন্ডা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসকে সমূলে ধ্বংস করাই তার লক্ষ্য- ‘ভাইরাসের সংক্রমণ কমানো নয়, আমাদের লক্ষ্য শূন্যে নিয়ে আসা। করোনাভাইরাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা। এই কাজে আমরা সবাই সবাইকে সাহায্য করি আসুন। নিজ নিজ অবস্থানে থাকুন প্লিজ। এখন সবকিছু বন্ধ। অন্য কোথাও যেতে গিয়ে যদি রাস্তার মাঝখানে গাড়ি নষ্ট হয়, তাহলে সারানোর লোক পাবেন না। তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে একা একা বিপদ হতে পারে।’

একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বোঝার জন্যে তার পূর্বসূরি, বা তার বিরোধীরা কি বলছে- সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকায় যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য ধুয়ে দিয়েছেন বারাক ওবামা। অথচ নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক কিন্ত জেসিন্ডার প্রশংসায় পঞ্চমুখ! হেলেন বলছিলেন, ‘মানুষ বিশ্বাস করে, ও (জেসিন্ডা) কারো কাছে কোনোকিছু প্রচার করতে চাইছে না। তারা জানে, সবাই এখন এক ধরনের বিপদের মধ্যে আছে। আর বিপদের সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিউজিল্যান্ডবাসীর পাশে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জনগণের সম্পূর্ণ আস্থা আছে। জেসিন্ডা মানুষ হিসেবে প্রচণ্ড সহানুভূতিশীল, আর এজন্যই সব শ্রেণির মানুষ তার ওপর ভরসা রাখতে পারে।’ 

ঘরে পরার গাউন আর সোয়েটার গায়ে দিয়েই ফেসবুক লাইভে হাজির হচ্ছেন জেসিন্ডা

জেসিন্ডার সহানুভূতিশীল আচরণ অবশ্য আমরা আগেও দেখেছি। দুই বছর আগে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে জঙ্গী হামলার সময়ও এই ভদ্রমহিলা ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। থাকাটাই স্বাভাবিক, যেভাবে আন্তরিকতা আর দরদ দিয়ে তিনি আক্রান্ত মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, পুরো জাতিকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছিলেন, সেটা এক কথায় অনবদ্য। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি খ্রিস্টান ওই আততায়ীকে 'জঙ্গী' বলে সম্বোধন করেছিলেন, আক্রান্ত মুসলমানদের বলেছিলেন তারা তার 'ভাই'।

হামলার পরে নিউজিল্যান্ডের আতঙ্কগ্রস্ত মুসলিম কমিউনিটিকে নিজে গিয়ে স্বান্তনা দিয়ে এসেছেন তিনি, তাদের আশ্বাস দিয়েছেন, একজন নেটিভ শ্বেতাঙ্গের চেয়ে মোটেও আলাদাভাবে তাদেরকে দেখা হবে না। নিহতদের স্মরণে আয়োজিত শোকসভায় হাজির হয়েছেন মাথায় কাপড় দিয়ে, বুঝিয়ে দিয়েছেন, মুসলমানদের সঙ্গেই আছেন তিনি এবং পুরো দেশ। প্রধানমন্ত্রীর খোলস ভেঙে তিনি সাধারণের কাতারে নেমে এসে জড়িয়ে ধরছেন ক্ষতিগ্রস্থদের, একদিকে তাদের স্বান্তনা দিচ্ছেন, আবার পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, অপরাধী শাস্তি পাবেই। কোমলতা আর কঠোরতার অসাধারণ এই মিশ্রণটাই জেসিন্ডাকে অনন্য করে তুলেছে। সেই অনন্যসাধারণ জেসিন্ডার কাছে হার মেনেছে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতাও।

জেসিন্ডার বয়স মাত্র ৩৯ বছর, খুব বেশি অভিজ্ঞ নন তিনি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিক থেকেও হয়তো অনেক পিছিয়ে থাকবেন বিশ্বনেতাদের চেয়ে। কিন্ত মানুষের প্রতি মমতা আর ভালোবাসার বিশাল এক ভাণ্ডার বুকের ভেতর বয়ে নিয়ে চলেন জেসিন্ডা, সেজন্যেই তিনি সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার তাড়না অনুভব করেন, যাতে তার বা সরকারের ভুলে একটা প্রাণও ঝরে না যায়। আর সেকারণেই ৩৯ বছরের সাধারণ একজন নারী জেসিন্ডা আরদার্নকে আটলান্টিক ম্যাগাজিন 'পৃথিবীর সবচেয়ে উপযোগী নেতা'র খেতাব দেয়, যে খেতাব ট্রাম্প-পুতিনরাও পান না!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা