সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে তারা হয়ত স্রেফ 'প্রতিবন্ধী'। কিন্তু, সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা শহরের বুকে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের ক্যাফে। যে ক্যাফের সব কিছু চালায় তারাই, রান্না থেকে শুরু করে খাবার সার্ভ, সব কিছু এই দলটাই পরিচালনা করে। তাদের ক্যাফের নামটিও ভীষণ সুন্দর। ক্যাফের নাম তারা দিয়েছেন 'অ্যাই ক্যান ফ্লাই'।

আই ক্যান ফ্লাই, অর্থাৎ- আমি উড়তে পারি। সত্যিই তো তারাও উড়তে পারেন, তারই প্রমাণ এই ক্যাফে। যারা ভাবেন, তুমি শারিরীকভাবে অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা, তোমার এই এই দুর্বলতা, অক্ষমতা, তুমি পারবে না- তাদের মানসিক সংকীর্ণতা ভেঙ্গে দেয়ার মতো এক জবাবই যেন স্পেশাল চাইল্ডদের এই ক্যাফে।

'অ্যাই ক্যান ফ্লাই' ক্যাফেটির দেখা পাবেন আপনি কলকাতায় গেলে। দক্ষিণ কলকাতার ম্যাডক্স স্কয়ারের কাছে এই ক্যাফের অবস্থান। ক্যাফের ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই আপনার মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। উজ্জ্বল আলোর রোশনাইয়ে ক্যাফে আলোকিত। এখানে দেয়াল জুড়ে আঁকিবুঁকি। নিজেকে প্রকাশের চেষ্টা। ভেতরটাকে দেখানোর পাল্লা। ক্যাফের দেয়াল সংলগ্ন ঝুলন্ত বাগান, গাছে গাছে সবুজে মেতেছে ক্যাফের ভেতরটা।

ক্যাফের ভেতরে লোকের আড্ডা জমে উঠেছে। ভীষণ ব্যস্ততা, খাবারের অর্ডার পড়ছে। সেই খাবার আবার প্রস্তুত করে কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দেয়ার তাড়াহুড়ো। সব কিছুই এখানে করছেন স্পেশাল চাইল্ডের দলটি। নিখুঁত তাদের কাজ আর কাজের প্রতি ভালবাসা, নিজেদের প্রমাণের তাড়না। নিজেদের সামর্থ্য প্রকাশের কী অসাধারণ প্রচেষ্টা মানুষগুলোর।

উজ্জ্বল আলোর রোশনাইয়ে ক্যাফে আলোকিত

এই ক্যাফের আইডিয়াটি এসেছে মিনু বুধিয়ার মাথায়। তার ছোট কন্যা প্রাচী, যিনি স্পেশাল চাইল্ড। মিনু বুঝতে পেরেছিলেন, কন্যা স্পেশাল চাইল্ড হওয়ায় সমাজে তাকে এবং পরিবারকে কত রকমের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। মিনু সবসময়ই দুশ্চিন্তা করতেন এই ভেবে যে, সমাজ একজন স্পেশাল চাইল্ডকে যেভাবে ট্রিট করে তাতে তিনি যখন থাকবেন না, তখন কে দেখবে তার মেয়েকে। এটা বোধহয় সব স্পেশাল চাইল্ডের অভিভাবকদের ভাবনায় কাজ করতে থাকে সারাক্ষণ।

তাই, তিনি ভাবলেন এমন কিছু হোক, যেন তার সন্তান নিজেই নিজের অস্তিত্ব তৈরি করে শিখে নেয়, নিজের পরিচয়ে স্বাধীন সত্তায় বেড়ে ওঠে। মিনু তৈরি করেছিলেন 'অ্যাই ক্যান ফ্লাই' ফাউন্ডেশন। যেখানে তিনি স্পেশাল চাইল্ডদের বিভিন্ন স্কিলে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকে বাস্তব জগতের জন্যে তৈরি করতেন।

মিনু বলেন, "সেই  প্রশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমরা শুরু করি ক্যাফে আই ক্যান ফ্লাই। এখানে আমার যে ছেলেমেয়েরা কাজ করছে, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের কাজে দক্ষ, হয়তো আর পাঁচটা ‘স্বাভাবিক’ মানুষের চেয়ে বেশিই দক্ষ।"

অ্যাই ক্যান ফ্লাই ক্যাফেতে চল্লিশজন কাস্টমারের বসার জায়গা আছে। পরিবেশের বর্ণনা তো আগেই শুনেছেন৷ অসাধারণ ভাইভ গোটা ক্যাফে জুড়ে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আছে ওয়াইফাই সুবিধা সহ প্রচলিত ক্যাফেতে যা থাকে সব সুযোগ সুবিধা। লোকে এখানে কৌতুহল নিয়ে আসলেয়াও পরে ঠিকই প্রেমে পড়ে যায় এই ক্যাফের। তাই কলকাতার গর্ব হয়ে উঠেছে এই ব্যতিক্রমী ভাবনার এবং অনুপ্রেরণা যোগানো ক্যাফেটি।

ক্যাফের খাবার সার্ভ থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজ পরিচালনা করে স্পেশাল চাইল্ড

মিনু গর্বিত এই স্পেশাল ছেলেমেয়েদের নিয়ে। তিনি বলেন, "আমাদের ক্যাফেতে প্রথমে অনেকেই আসেন কৌতূহল থেকে। কেউ কেউ হয়তো সহানুভূতির কারণেও আসেন। কিন্তু সেটা কেবল প্রথম বারের জন্যই। কারণ এখানকার খাবার, পরিবেশ, আমাদের কর্মীদের আচরণ এতই ভাল, যে তার পর থেকে মানুষ ভাল জায়গায় আসার মতো করেই আমাদের ক্যাফেতে আসেন। সময় কাটান। ফিরে গিয়ে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়দের আমাদের কথা বলেন। এটাই আমাদের সাফল্য। আমরা আর পাঁচটা ক্যাফের মতোই একটা ভাল ক্যাফে গড়ে তুলতে পেরেছি এই ছেলেমেয়েদের দিয়েই। কোনও আপস করতে হয়নি কাজের বা খাবারের গুণমান নিয়ে। আমরাও পারি।’"

অনেকেই ভাবে, স্পেশাল চাইল্ড যাদেরকে কেউ কেউ আবার 'প্রতিবন্ধী' বলে একটু খাটো চোখে দেখবার চেষ্টা করে, তারা ভাবে এরা জীবনে কিছুই করতে পারবে না নিজে নিজে। এই স্পেশাল চাইল্ডদের অন্যের করুণা ছাড়া বেঁচে বর্তে থাকার উপায় নেই।

কিন্তু, 'অ্যাই ক্যান ফ্লাই' ক্যাফের একদল স্পেশাল চাইল্ড দেখিয়ে দিয়েছে, তারাও সঠিক সমর্থন, প্রশিক্ষণ, সাহস পেলে কারো চেয়ে কম যায় না৷ বরং, তারাও অন্য অনেকের চেয়ে বেশি ভালবাসা নিয়ে কোনো কাজে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। তারা উড়তে পারে ডানা মেলে...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা