রঙ ফর্সাকারী পণ্যের অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন বন্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করছে ভারত সরকার। এ ধরণের বিজ্ঞাপন প্রচার করলে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ রুপি জরিমানা হবে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানটির।

'সুন্দর মানে কি শুধুই ফর্সা! সুন্দর কালো হয়, শ্যামলা হয়, ফর্সা হয়'- এমন কথা কেবল মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর বিজ্ঞাপনেই মানায়। বাস্তবতাটা যে কতটা রূঢ়, তা বুঝতে হলে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না, আমাদের আশেপাশের মেয়েদের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। নিজেদের ফর্সা করার চেষ্টায় প্রতিনিয়ত তারা বিভিন্ন পণ্যের শরণাপন্ন হোন, সেই সাথে মেকআপের অতিরঞ্জন তো আছেই৷ তাদের কাছে সুন্দর মানে কেবলই ফর্সা। ফর্সা হবার তাড়নায় বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের ক্রিম থেকে শুরু করে নাইট ক্রিম, হাতে বানানো ক্রিম ব্যবহার করে প্রতারিত হয়েছেন- এমন নারীর সংখ্যাও কম না।

গায়ের রঙ কোনো বিষয় না, মনের রঙই আসল- এই কথা আমাদের সমাজে ততক্ষণ পর্যন্ত সত্য, যতক্ষণ না নিজেদের পরিবারে কোনো ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হয়। মুখে 'গায়ের রঙ কোনো বিষয় না' বলা অনেককে দেখেছি বিয়ের বাজারে পাত্রী দেখার সময় ঠিকই রঙ 'ময়লা', না 'পরিষ্কার' সে হিসাব কষতে। গায়ের রঙ যে মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থের উপর নির্ভর করে, 'ময়লা' বলে যে গায়ের কোনো রঙ নেই, সে কথা তারা ভুলে যান নিজেদের ক্ষেত্রে। আবার এমনও অনেকে আছেন, যারা গায়ের রঙ নিয়ে বঞ্চনা সহ্য করেছেন জীবনের অনেকটা সময়, কিন্তু তারাই আবার শ্বাশুড়ি হয়ে পুত্রবধুর খোঁজে সেই ফর্সা মেয়েই চান!

বিয়ের বাজারে এই 'ময়লা-পরিষ্কারের' অসুস্থ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতেই বেশিরভাগ মেয়েরা রঙ ফর্সাকারী এইসব পণ্য ব্যবহার করে থাকেন। অথচ তারা জানেনও না নিজেদের কত বড় ক্ষতি তারা ডেকে নিয়ে আসছেন।

শরীরের অভ্যন্তরে মেলানোসাইট কোষ থেকে উৎপন্ন হওয়া মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থ যার শরীরে যত বেশী, তার গায়ের রঙ তত বাদামী বা কালো হয়। রঙ ফর্সাকারী এসব পণ্যে এন্টিঅক্সিডেন্ট গ্লুটাথিওন ও হাইড্রোকুইনোন নামক পদার্থ থাকে, যা মেলানোসাইট কোষের ক্ষতি করে মেলানিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে গায়ের রঙ সাময়িকভাবে ফর্সা দেখা যায়। সেসব পণ্য ব্যবহার বন্ধ করে দিলে পুনরায় মেলানিন বেড়ে গিয়ে আগের রঙ হয়ে যায়। কিন্তু গ্লুটাথিওন ও হাইড্রোকুইনোন শরীরের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। ত্বকের লোমকূপ বন্ধ করে দিয়ে বিভিন্ন চর্মরোগ থেকে শুরু করে স্থায়ীভাবে ত্বকের ক্ষতি হয় এর প্রভাবে। এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে!

রং ফর্সাকারী পণ্য ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হতে পারেন

আমার পরিচিত এক আপু বিয়ের আগে গায়ের রঙ ফর্সা করার উদ্দেশ্যে হাতে বানানো নাইট ক্রিম ব্যবহার করেন। সে ক্রিম এক সপ্তাহ ব্যবহার করে ফর্সা তো দূর, চেহারার স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য হারিয়ে ফেলে উলটো পুড়ে যায় তার ত্বক। সেই জ্বলে যাওয়া ত্বকের পেছনে চিকিৎসাবাবদ হাজার পঞ্চাশেক টাকা খরচ করেও তিনি পুরোনো চেহারা ফেরত পাননি আর। সেই আপু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ''বিয়ের বাজারে 'সুপাত্রী' হতে গিয়ে আজ আমার এই অবস্থা। আমার শত্রুও যেন এইসব ক্রিম ব্যবহার না করে।'' এই আপুর মতোন অসংখ্য ভিক্টিম আছেন আমাদের চারপাশে, কেউ দোষ স্বীকার করেন, কেউ বা চক্ষুলজ্জার কারণে স্বীকার করেন না।

এসব পণ্যের বাজারও ভীষণ রমরমা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, সারা বিশ্বে গায়ের রঙ ফর্সা করা এই ক্রিমের বাজার ২০১৭ সালে ছিল প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার, ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যা ৮৯০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।

যদিও এ ধরণের পণ্য মোকাবেলার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাতে কঠিন কঠিন আইন রয়েছে, তবুও কিছু দেশে এসব পণ্য ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এসব পণ্যের যে জয়জয়কার, সারা বিশ্বে আর কোথাও তা নেই। দক্ষিণ এশিয়ার ৬১% নারী রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার করে থাকেন। এবং এ সংখ্যাটি ক্রমেই বাড়ছে।

যেখানে রঙ ফর্সাকারী পণ্যের এত এত চাহিদা, সেখানে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত নিয়েছে দারুণ এক সিদ্ধান্ত। রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন বন্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করছে দেশটির সরকার। এ ধরণের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করলে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ রুপি জরিমানা হবে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানটির।

নিঃসন্দেহে দারুণ উদ্যোগ এটি, সাধুবাদ জানানোর মতোই। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও এই আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান, সময় থাকতে এইসব পণ্যের প্রচারে আইন প্রণয়ন করুন। শুধু বাংলাদেশ কেন! ভারত শুরু করেছে, দক্ষিণ এশিয়ার বাকী দেশগুলোরও উচিত এই আইন চালু করা। বাংলাদেশের সরকার কি এমন সিদ্ধান্ত নেবে? 

প্রচারেই যেহেতু প্রসার, তাই প্রচার ঘটাতে না পারলে প্রসারও একদিন কমে আসবে- এটাই প্রত্যাশা। বৈষম্য দূরীকরণে এটাই হোক শুরুর সূত্র। রঙ ফর্সাকারী ক্রিম দিয়ে ফর্সা হবার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় না নেমে নিজেদের স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে মেয়েরা, সুস্থ সমাজে সুস্থভাবে বেঁচে থাকবে-  এটাই তো আমাদের কাম্য। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা