এভাবে কি চলতে পারে একটা ই-কমার্সের সিস্টেম? প্রশ্ন তো আসতেই পারে, এ কেমন সিস্টেম?

ই-কমার্সের দুনিয়ায় ইভ্যালি অল্প সময়েই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে৷ প্রথমত তাদের অবিশ্বাস্য অফার পলিসির কারণে এই আলোচনা। অনলাইন থেকে কেউ বাইক কিনবে, চোখ ধাঁধানো স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিনবে, তাও এত বেশি সংখ্যায়, এটি ছিল ধারণারও অতীত। কিন্তু ইভ্যালিতে এই পণ্যগুলোই বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। কারণ, অদ্ভুত অবিশ্বাস্য অফার। ক্যাশব্যাক, সাইক্লোন, থান্ডারর্স্টোম টাইপের নামগুলোর একেকটা অফারে বিশাল ছাড়ে পণ্যগুলো বিক্রয় হচ্ছে।

এরকম অফারে কিছু কিনতে পারা গ্রাহকের সন্তুষ্টই থাকার কথা। কেউ যদি ২ লাখ টাকা দামের একটি বাইক ১ লাখ ২০/৩০ হাজারে কিনতে পারে, তাহলে কেন তার মনে কষ্ট থাকবে, বিরুপ প্রতিক্রিয়া থাকবে? ৫০ হাজার টাকার ল্যাপটপ যদি ৩০ হাজার টাকায় কেউ পায় তার তো আনন্দে আত্মহারা হবার কথা। কিন্তু তবুও কেন ইভ্যালির বিরুদ্ধেই এত নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে?

প্রথমত কারণটি হলো, তাদের এডভান্স ক্যাশ টাকা নেয়ার পলিসির কারণে। এই পলিসি নতুন ই-কমার্স সাইটের জন্যে কৌশলগত কারণে ভাল এ কারণে যে, অর্ডার রিজেকশনের হার শুণ্যের কোঠায় থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, ক্যাশ অন ডেলিভারি সিস্টেমের কারণে প্রচুর পণ্য প্রস্তুত করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাবার পর গ্রাহক সেটি ক্যান্সেল করে দেন। অর্ডারটি গ্রহণ করেন না। কিন্তু ইভ্যালির ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। কারণ, অগ্রিম টাকা দিয়ে দেয়ার পর একজন গ্রাহক যখন পণ্য পান, তখন তিনি অর্ডার ফিরিয়ে দেয়ার বদলে বরং আগে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এই ভেবে যে তার টাকা মার যায় নি অন্তত। তাছাড়া, ইভ্যালি যে ধরণের পণ্য বিক্রি করে আলোচনায় এবং যে পরিমাণ ছাড় থাকে তাদের অফারকৃত পণ্যে তাতে তারা অগ্রিম টাকা না নিয়েও পারবে না। কারণ, যে পণ্যের উপর অফার সেটিতে তারা তখনই অফার দিতে পারেন যখন পণ্যটি লার্জ ভলিউম বিক্রি নিশ্চিত হয়। এতে করে সেলারদের কাছ থেকে তারা এক্সট্রা ডিসকাউন্ট পান অর্ডার ভলিউমের জন্যে। তাই এই অর্ডারগুলো এডভান্স টাকা নিয়ে নিশ্চিত করে ফেলাটাই তাদের পলিসি।

কিন্তু, এবার সমস্যা হয় ডেলিভারিতে গিয়ে। কখন তাদের ধারণার চাইতেও বেশি অর্ডার পান তারা। কখনো বোধহয় তাদের সেলাররা পণ্য হাতে না রেখেই অফারে সম্মত হন। ফলে অর্ডারের পণ্য ডেলিভারির জন্যে প্রস্তুত করতে তাদের অনেক সময় লেগে যায়। ধরুন "খ" নামক একটি স্টার্টআপ যারা অরগানিক পণ্যের ব্যবসা করে, তারাও যদি স্টকের বাইরে গিয়ে অর্ডার নেয়, সেই অরগানিক পণ্য প্রস্তুতে তাদের অনেক বেশি সময় লাগবে এটাই স্বাভাবিক না? কিন্তু ইভ্যালি এবং সেলারের ভুল এসেসমেন্টের জন্যে গ্রাহক কেন ভোগান্তিতে পড়বে? প্রশ্ন এটাই। কেবল অফারে নিচ্ছে এই অজুহাতে গ্রাহক দিনের পর দিন অপেক্ষা করবে, এটাই কি যুক্তি? ইভ্যালির কিছু অন্ধ ফলোয়ার এই যুক্তি দেন অবশ্য। কিন্তু, যিনি নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পণ্য হাতে পান না, তিনিই জানেন কষ্ট কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী!

এবারে ধরুন, বাইক কোম্পানির কথা। এমনও দেখা যায়, আগের ক্যাম্পেইনের অর্ডার ডেলিভারি দেয়ার এখনো অনেকটা বাকি এবং বলা হয় স্টক আনএভেইলেবল, তাই ডেলিভারি দিতে পারছে না কোম্পানি। এরকম কেইসেও পরে নতুন আরেকটা ক্যাম্পেইন ছাড়া হয় সেইম ব্র‍্যান্ডের বাইকে৷ তাহলে তাহলে নতুন অফারের স্টক কি করে নিশ্চিত করলেন তারা? নাকি স্টক ছাড়াই অফার ছাড়েন? বোধহয় তা-ই। তারা আগে অর্ডার নেন, টাকা নেন। তারপর ধীরেসুস্থে বাইক ৫০/১০০ ইউনিট করে সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ডেলিভারি দিতে শুরু করেন। যাদের ভাগ্য খারাপ এবং শেষের দিকে সিরিয়াল তারা জানেনও না তাদের বাইক কবে আসবে। এই দুশ্চিন্তায় কাস্টমারকে রাখা কোন ধরণের পলিসি? তার উপর বাইকের পেপার পাওয়ার ঝক্কিও কম না। এক মাস পেরিয়ে গেলেও শোরুম থেকে পেপার পাওয়ার আপডেট পাওয়া যায় না অনেক ক্ষেত্রেই। কোনো কোনো ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি তো গ্রাহককে 'ভিক্ষুক'ও ভাবেন কিনা কে জানে। মুখ ফসকে বলে ফেলেন, 'অফারে নিসেন, এমন তো হবেই...!'

অফারে নিলেই এমন হতে হবে? তাহলে আর লোক দেখানো এত কমিটমেন্টের দরকার কি। এত পলিসির দরকার কি?

তার উপর আতঙ্কের নাম "অর্ডার ক্যান্সেল"। এক মাস টাকা দিয়ে বসে থাকার পর কেউ যদি শুনেন, তার অর্ডার ডেলিভারি পাবেন না, সেটা সেলার বা ইভ্যালি ক্যান্সেল করে দিয়েছে - কেমন লাগবে তখন? ইভ্যালি এক্ষেত্রে রিফান্ড করে দেয় সত্য, কিন্তু সেটা গ্রাহক বিকাশে পাবেন কিনা সেটি নিয়েও আরেক দফা সময়ক্ষেপণ হয়।

ইভ্যালির পলিসি এক্ষেত্রে অনেকটায় বর্ষার সিজনে বন্যাপ্লাবিত এলাকায় নেতাদের লোক দেখানো তৎপরতার মতো। একটু বাঁধ ঠেকানোর চেষ্টা, একটি রিলিফের মাল দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা আমরা খুব তৎপর আছি। ইভ্যালি যখন অজস্র নেগেটিভ প্রতিক্রিয়ায় অতিষ্ট হয়ে যায়, তখন সিইও মোহাম্মদ রাসেল একটা পোস্ট দিয়ে এই তৎপরতা দেখান। তিনি সাত দিনের সময় চান, ডেলিভারি ক্লিয়ার করার জন্যে। ঘোষণা দেন সব ক্যান্সেল অর্ডার রিফান্ড হবে। ঘোষণা আসে, অত পার্সেন্ট এক্সট্রা দেয়া হবে ক্ষতিগ্রস্থের জন্যে। কিন্তু নেগেটিভ প্রতিক্রিয়ার বন্যা ঠেকানো যায় না।

নেগেটিভ প্রতিক্রিয়ার পরিমাণ বেশি হলে হঠাৎ তৎপরতা দেখান ইভ্যালি সিইও

ইভ্যালির অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ যেটাকে 'ফেস' বানিয়ে ইভ্যালি নিজেদের ক্যাম্পেইনগুলোর প্রচারণা চালায়, সেখানে কেবলই ইভ্যালির পক্ষের রিভিউ। সেই গ্রুপটা এ যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের এক অন্যরকম উদাহরণ। যেখানে কোনো সমস্যার, কোনো ইস্যুর কথা প্রকাশ করতে দেয়া হয় না। সেখানে কোনো নেগেটিভ রিভিউ প্রকাশ তো হয়ই না, গ্রাহকের কোনো রকমের কোনো সমস্যাও প্রকাশ হয় না৷ গ্রাহক চিন্তায় মাথার চুল ছেঁড়ে। হতাশ হয়ে তখন গ্রাহক নানা চিন্তা করে। কেউ ফেসবুকের অন্য জনপ্রিয় গ্রুপে তখন প্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ করে৷

রাসেল সাহেব সেখানেও তার ক্যারিশমা দেখান। কাস্টমার কেয়ারে হাজার বার ফোন দিয়ে কেউ রেস্পন্স পায় না, সিইওকে মেসেজ দিয়ে উত্তর পায় না, ফেসবুক পেজে নক দিয়ে কেউ যখন জবাব পায় না তখন তারা অন্য গ্রুপে যান। সেখানে লেখালেখি হলে রাসেল সাহেব তাৎক্ষনিকভাবে কমেন্ট লিখেন, "মাস্ট বি সলভড" টাইপ। কিন্তু তিনিও তো মানুষ। কয়টা নেগেটিভ প্রতিক্রিয়ারই বা রিপ্লাই দিতে পারেন! তাই তিনি এবারে গ্রুপের এডমিনদের ধরেন, তাদের অনুরোধ জানান, সমস্যাগুলো আগে যেন তার কাছে পাচার করা হয়।

সম্প্রতি ভয়েস অফ রাইটস গ্রুপে তিনি এমন একটি ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি বলেন, প্রতিদিন ১০০ হাজার সমস্যার সমাধান করে ইভ্যালি। সেখান থেকে কিছু সমস্যা হয়তো মিস হয়ে যেতে পারে। তাই এডমিনরা যেন আগে সমস্যার পোস্টগুলো আগে যেন রাসেল সাহেবের কাছে পাঠান। সেখানে তিনি শেষে ইভ্যালির অফিসিয়াল গ্রুপের লিংক দিয়ে বলেন, ইভ্যালি সম্পর্কে জানতে লোকে যেন এই গ্রুপে ঢুঁ মারে।

ইভ্যালি অভিযোগ
ভয়েস অফ রাইটস গ্রুপে দেওয়া সেই পোস্ট

এভাবে কি তিনি নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন? ইভ্যালির অফিসিয়াল গ্রুপে গেলে কেউ প্রতিকার পাবেন এমন তো না। তাহলে সেই গ্রুপের লিংক দিয়ে তিনি কি প্রমাণ করতে চান? কেবল পজেটিভ রিভিউ দেখিয়ে তিনি ইভ্যালির ভাবমূর্তি কতটা উজ্জ্বল, তা দেখানোর আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন? তিনি বলছেন, সমস্যা যেন তার কাছে পাঠানো হয়। কেন এতো বড় একটা ই-কমার্স যার মান্থলি টার্নওভার ২০ মিলিয়ন ডলার, তার গ্রাহকের নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া তার কাছেই পাঠাতে হবে? এগুলো হ্যান্ডেল করার মতো কেউ নেই আর?

কাস্টমার কেয়ারকে তিনি যেমন নির্দেশনা দেন, তেমনই তো তারা বলে। ফেসবুক পেজের ক্ষেত্রেও একই। তিনি নিজেও প্রবলেমের রিপ্লাই দেন কদাচিৎ। তাহলে এ ধরণের আবেদন গ্রুপে গ্রুপে বলার অর্থ কী? তিনি কি গ্রাহককে নিয়ন্ত্রণ করতে চান নাকি গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া বলার প্ল্যাটফর্মগুলোকেও একের পর এক বন্ধ করে দিতে চান? কেবল পজেটিভ রিভিউ দেখিয়েই তিনি কিভাবে আড়াল করতে পারবেন মানুষের হাজারো নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া? যেখানে তার যেকোনো অফ টপিকের পোস্টেও মানুষ হামলে পড়ে তাদের সমস্যা নিয়ে। তিনি এই ব্যর্থতা এড়াবেন কি করে? শুধু গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেই?

এই নিয়ন্ত্রিত কর্তৃত্ববাদী ই-কমার্স প্যাটার্নের কারণেই সম্ভবত ইভ্যালির বিরুদ্ধে এত নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া। কারণ, গ্রাহক যাবে কোথায়? এডভান্স টাকা দিয়ে মাস কাভার হয়ে যায়, পণ্য পাওয়া হয় না হাতে। ঠিক হাতে পাওয়ার আগেও তিনি জানেন না, আদৌ তিনি পাবেন নাকি হুট করে ক্যান্সেল করে দেয়া হবে তার প্রোডাক্ট। গ্রাহক জানেন না কোথায় গেলে তার সমস্যার প্রতিকার মিলবে। গ্রাহক হণ্যি হয়ে যখন দিগ্বিদিক তার সমস্যার কথা জানাতে চায়, সেখানেও কর্তৃত্ববাদী আচরণ দেখতে পায়। তার বলার জায়গাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়।

এভাবে কি চলতে পারে একটা ই-কমার্সের সিস্টেম? প্রশ্ন তো আসতেই পারে, এ কেমন সিস্টেম?

আরও পড়ুন-

* ইভ্যালিসহ অন্যান্য ই-কমার্স থেকে সময়মতো পণ্য না পেলে ভোক্তা অধিকারে মামলা করবেন যেভাবে! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা