দিল্লি বিধানসভার ৭০টা আসনের মধ্যে ৬২টাই জিতেছে আম আদমি পার্টি, মাত্র আট বছর আগে যে দলটার জন্ম হয়েছিল! আইআইটি থেকে পাশ করা সাবেক সরকারী কর্মকর্তা অরবিন্দ কেজরিওয়াল আরও একবার ভারতের তাবৎ রাজনীতিবিদদের ঘোল খাইয়ে ছাড়লেন!

দুইশোর বেশি সাংসদকে নিয়ে এসেছিল বিজেপি, সত্তরজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দাপিয়ে বেড়িয়েছেন দিল্লির পথে প্রান্তরে, অমিত শাহ র‍্যালি করেছেন অলিগলিতে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল আর তার আম আদমি পার্টি যে ‘কাম কি বাত’ কিংবা পাঁচ বছরের রেজাল্ট কার্ড নিয়ে প্রচারণায় নেমেছিলেন, সেটাকে সাম্প্রদায়িকতার আবরণে মুড়ে দিতে দিন দুয়েকের বেশি সময় লাগেনি বিজেপির। দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের মোটিভটাই বদলে দিয়েছিল দলটা, পাঁচটা মৌলিক চাহিদা ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় ইস্যু তারা বানিয়ে ফেললো শাহীনবাগের আন্দোলনকে!

কিন্ত দিনশেষে দিল্লির জনতা জানিয়ে দিলো, ওসব ভণ্ডামিতে ভরা প্রচারণায় কান দেয়ার দিন এই মুহূর্তে নেই, পাকিস্তান বিরোধিতা কিংবা ‘হিন্দুত্ব’ রক্ষার চেয়ে এই সময়ে ফ্রি বিদ্যুৎ, পানি, বাস সার্ভিস আর ভঙ্গুর অর্থনীতির মেরুদণ্ড সোজা করাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দিল্লি বিধানসভার সত্তরটা আসনের মধ্যে বাষট্টিটাই বাগিয়ে নিয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল বার্তা দিলেন, তার মাথার ওপর থেকে ‘ডন অফ দিল্লি’ তকমাটা হঠিয়ে নেয়াটা মুখের কথা নয়।

কংগ্রেসের সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে টানা আন্দোলনের মাঝে জন্ম হয়েছিল আম আদমি পার্টির, জন্ম হয়েছিল অরবিন্দ কেজরিওয়াল নামের এক নেতার, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিটাকে যিনি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করেন। আট বছর আগে যাদের নামগন্ধও ছিল না, সেই দলটাই কিনা সাত বছরের মধ্যে টানা তৃতীয়বার দিল্লির মসনদে বসলো, তাও প্রতিপক্ষকে একদম দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে! আট মাস আগের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপির আধিপত্যের সামনে যারা উড়ে গিয়েছিল, তারাই রাজ্য নির্বাচনে ফিরে এলো বিপুল তাণ্ডবে!

জানুয়ারীর মাঝামাঝি থেকেই দিল্লি ইলেকশনের প্রচার-প্রচারণার খোঁজ রাখছিলাম, তখনও মনে হচ্ছিলো, আম আদমিরা এবারও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পাবে। প্রচারণার কোথাও ছিল না কংগ্রেস, বিজেপিরও তথৈবচ অবস্থা। কেজরিওয়াল আর তার ডেপুটি মনীশ সিসোদিয়া তখন নিজেদের কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছেন, পাঁচ বছরে তারা দিল্লিকে কিভাবে বদলে দিয়েছেন সেসব বলে ভোট চাইছেন, নিয়ে এসেছেন পাঁচ বছরের রেজাল্ট কার্ড। তারা বলছেন, আমরা যদি কাজ করে থাকি তাহলেই আমাদের ভোট দিন।

নির্বাচনী পথসভায় কেজরিওয়াল

কেজরিওয়াল কাজ করেছেন, পাঁচ বছর সময়কালে তার দল দিল্লির জন্যে যতোটা করেছে, ভারতের স্বাধীনতার পরে ৬৫ বছরেও এত কাজ হয়নি। দিল্লির সরকারী স্কুলগুলোকে ঝাঁ চকচকে বানিয়েছেন তারা, বিনা বেতনের স্কুলে এখন আধুনিক সুইমিং পুল আছে, এয়ার কন্ডিশনড লাইব্রেরী আর রেস্টরুম শোভা পাচ্ছে প্রায় প্রতিটা স্কুলে। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি করে দেয়া হয়েছে, পরিবার প্রতি ২০০০০ লিটার করে পানি ফ্রি, মহিলাদের জন্যে পাবলিক বাসে লাগে না কোন ভাড়া। দিল্লির আনাচে কানাচে লেড় লাখ সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে নিরাপত্তার জন্যে, আরও দেড় লাখ লাগানোর কাজ চলছে। এরপরেও আম আদমি পার্টি ভোট পাবে না কেন?

জানুয়ারীর শেষ নাগাদ মঞ্চে আবির্ভূত হলেন অমিত শাহ, সর্বভারতীয় বিজেপির প্রধান কর্তা। গত কয়েকটা রাজ্যসভা নির্বাচনে তার দল শুধু হেরেছেই, এক হরিয়ানাতেই মান বেঁচেছিল কোনমতে। মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান হাতছাড়া হয়েছে, মহারাষ্ট্রেও শিবসেনা তাদের ছেড়ে গেছে, সরকারের পতন হয়েছে সেখানেও। সবশেষ ঝাড়খণ্ডেও একটা লোকাল পার্টি তাদের ‘শিক্ষা’ দিয়েছে। কাজেই মরণ কামড় দেয়ার জন্যে দিল্লিকেই বেছে নিয়েছিলেন অমিত শাহ, দিল্লি জিততে না পারলে যে মান থাকবে না!

দুইশোর বেশি সাংসদকে তিনি উড়িয়ে এনেছেন দিল্লিতে, এসেছে বিজেপির নিয়ন্ত্রিত এগারোটি রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীরা। সত্তরজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে সকাল-সন্ধ্যা প্রচারণায় লাগিয়ে দিয়েছিল বিজেপি, বার্তা ছিল একটাই- মানুষকে বোঝাও, কনভিন্স করো। হিন্দুত্বের ট্রাম্পকার্ড খেলো, ভেদাভেদ তৈরী করো, হিন্দুদের দলে টানো, যারা এখনও মনস্থির করতে পারেনি কাকে ভোট দেবে, তাদের ভোট নিশ্চিত করো।

ক্ষমতার জন্যে রাজনীতিবিদেরা যে কতটা নিচে নামতে পারে, সেটার একটা আদর্শ উদাহরণ হয়ে থাকবে এই দিল্লি ইলেকশন। একের পর এক নোংরামি হয়েছে, বেশিরভাগটাই ধর্ম নিয়ে, আর তার সবটাই করেছে বিজেপি। শাহীনবাগের আন্দোলনকে বিশাল ইস্যু বানিয়ে ছেড়েছে, ভোটের ন্যারেটিভটাকেই পালটে দেয়ার চেষ্টা করেছে তারা, ভোটের পার্সেন্টেজ ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেই কাজে তারা খানিকটা হলেও সফল। অরবিন্দ কেজরিওয়ালও বাধ্য হয়ে নিজেকে ‘সাচ্চা’ হিন্দু হিসেবে প্রমাণ দেয়ার মিশনে নেমেছেন, টিভি ইন্টারভিউতে হনুমান চল্লিশা পড়ে শুনিয়েছেন, ভোট শেষ হতেই ক্যামেরা নিয়ে ছুটেছেন হনুমান মন্দিরে। ধর্মের প্রতি তার এমন ভক্তি জনসম্মুখে এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

২০১৫ বিধানসভা নির্বাচনেও ভূমিধ্বস বিজয় পেয়েছিল আম আদমি

একটা সময়ে তো মনে হচ্ছিলো, আম আদমি পার্টি বুঝি কোণঠাসাই হয়ে পড়ছে বিজেপির উগ্রপন্থী প্রচারণার সামনে। কারণও আছে, খাজনার আওয়াজের চেয়ে বাজনার আওয়াজ বরাবরই বেশি হয়, বিজেপিও সেটাই করেছে। তাতে কেজরিওয়ালও একটু একটু করে খেই হারাচ্ছিলেন, তবে প্রশান্ত কিশোর নামের এক মাস্টারমাইন্ড ছিলেন কেজরিওয়ালের পেছনে, রাশটা হাতছাড়া হতে দেননি তিনি। আর তাই বিজেপির পাতা ফাঁদে পা দিতে গিয়েও নিরাপদে ফিরে এসেছে আম আদমি পার্টি।

বিজেপিকে নিজেদের গ্রাউন্ডে এসে খেলতে বাধ্য করেছেন কেজরিওয়াল-প্রশান্ত কিশোর জুটি, বিজেপির গ্রাউন্ডে গিয়ে খেলার ঝুঁকি নিতে চাননি। গত ছয় মাস ধরে একবারও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে টার্গেট করেননি কেজরিওয়াল, মোদিকে নিশাণা বানিয়ে আক্রমণ করেননি, কারণ তিনি বুঝেছেন, তাতে আখেরে নিজেদের ক্ষতি। ভারতে এখনও মোদির যে জনপ্রিয়তা, তাতে তার দিকে আঙুল তুলে কথা বলার মানেই হচ্ছে খাল কেটে কুমির টেনে আনা। সেই কাজ থেকে দূরে ছিলেন কেজরিওয়াল আর তার দল। মিডিয়া ফ্রেন্ডলি হয়ে চ্যানেলে চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। সেসবের পজিটিভ ইমপ্যাক্টটা যে ভোটের অঙ্কে পড়েছে, তা তো পরিস্কার।

পাঁচ বছর শাসন করার পরেও একটা দল নিজেদের তুমুল জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, এমন দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। অরবিন্দ কেজরিওয়াল আর আম আদমি পার্টি এই অসম্ভব উদাহরণটাই তৈরী করে দেখালেন, দিল্লির কোণে কোণে তাদের কাজের প্রশংসা, সেই কাজের প্রতিদান ব্যালটের মাধ্যমেই দিয়েছে দিল্লির জনতা। আর অমিত শাহকে বার্তা দিয়েছে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প প্রতিটা জায়গায়, প্রতিটা নির্বাচনে খাটাতে চাইলে সেটা বরং বুমেরাং হয়েই ফিরে আসবে…


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা