বাংলাদেশে এবার ঈদের খুশি তো মানুষের না, করোনা ভাইরাসের। কারণ আর কোন দেশের মানুষ এত আন্তরিকভাবে তাদের বংশ বৃদ্ধি করার জন্য এভাবে নিজেদের বুক পেতে দেয়নি। ঈদের কোলাকুলি এবার করোনারা করবে, মানুষ না।

জাহিদুর রহমানঃ আচ্ছা, একটা কফিনে কয়টা পেরেক মারা যায়?

আমরা কফিনের প্রথম পেরেকটা মারলাম কোভিড-১৯ কে সাধারণ সর্দি কাশি হিসেবে প্রচার করে। অথচ ফোকাস সরিয়ে দিতে ট্রল করলাম তাদের নিয়ে যারা এটির ভয়াবহতা বোঝাতে চাইছিলেন।

আমরা কফিনের দ্বিতীয় পেরেকটা মারলাম প্যানডেমিক সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছাড়াই নিজেদের সম্পূর্ণ প্রস্তুত ঘোষণা দিয়ে। অথচ ফোকাস সরিয়ে দিতে ট্রল করলাম তাদের নিয়ে যারা সত্যিকারের প্রস্তুতি নিতে বলছিলেন।

আমরা কফিনের তৃতীয় পেরেকটা মারলাম ইতালি ফেরত প্রবাসীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারাইন্টাইন না করতে পেরে। অথচ ফোকাস সরিয়ে দিতে ট্রল করলাম গুটিকয়েক প্রবাসীদের ক্রোধ প্রকাশ করা নিয়ে।

আমরা কফিনের চতুর্থ পেরেকটা মারলাম গণপরিবহন বন্ধ না করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা দিয়ে। অথচ ফোকাস সরিয়ে দিতে ট্রল করলাম ট্রেন, বাস, লঞ্চ স্টেশনে ভিড় করা মানুষদের নিয়ে।

আমরা কফিনের পঞ্চম পেরেকটা মারলাম কোন রকম প্রস্তুতি না নিয়েই গার্মেন্টসগুলো খুলে দিয়ে। অথচ ফোকাস সরিয়ে দিতে ট্রল করলাম শত শত কিলোমিটার পথ হেঁটে আসা পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে।

আমরা কফিনের ষষ্ঠ পেরেকটা মারলাম সারা দেশের মার্কেটগুলো খুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে। অথচ ফোকাস সরিয়ে দিতে ট্রল করলাম সেই মার্কেটগুলোতে ঈদের কেনাকাটা করতে যাওয়া মানুষদের নিয়ে।

আমরা কফিনের সপ্তম পেরেকটা মারলাম ঈদের আগে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ঢাকা ছাড়ার অনুমতি দিয়ে। অথচ ফোকাস সরিয়ে দিতে ট্রল করলাম ফেরির শরীর ধরে ঝুলে থাকা মানুষদের নিয়ে।

এর পরের পেরেকটা মারা হবে হয়ত মসজিদগুলোতে ঈদের নামায পড়ার অনুমতি দিয়ে। অথচ সৌদি আরবের মত দেশেও ২৭ তারিখ পর্যন্ত কারফিউ জারি থাকবে। আমাদের সদা প্রস্তুত জাতি, সহমত ভাই সমৃদ্ধ জাতি। বিশাল মাপের ভুল কিংবা অন্যায়গুলিকে বৈধতা দেয়ার জন্য সব সময়ই এক পাল শুয়োর প্রস্তুত থাকে। আমাদের মগজ শুকিয়ে গেলেও চর্বি জমে কলিজা বড়, উঁচু ভুঁড়ি, পাছা মোটা, কফিনটাও তাই বড়সড়।

আরো অনেক পেরেক গাঁথার জায়গা এখনও বাকি আছে। ঈদের পর যখন ১০ হাজার টেস্ট করে অর্ধেক পজিটিভ পাওয়া যাবে, প্রতিদিন একশোর বেশি মানুষ মারা যাবে, তখন হয়ত আমরা আবার নব উদ্যোমে পেরেক মারা শুরু করব। হাজার হাজার প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, এম্বুল্যান্স যাত্রী বোঝাই হয়ে এসি ছেড়ে ডেথ চেম্বার বানিয়ে ছুটছে, ট্রাক পিকাপগুলোতে গাদাগাদি করে ধারণ সংখ্যার কয়েকগুন মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে ছুটছে, রিকশা-বাইক একজনের জায়গায় তিনজন নিয়ে ছুটছে।

দেশের আশি ভাগ রোগি ঢাকা বিভাগে, তাদের আবার অধিকাংশই ঢাকা শহরে। সেই শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ শরীর ভর্তি করোনা ভাইরাস নিয়ে এভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। রাজনীতিবিদ, সংসদ, আমলা, শিল্পপতি, উপরের তলার কেউ কিন্তু রেহাই পাচ্ছেন না। বাংলাদেশে এবার ঈদের খুশি তো মানুষের না, করোনা ভাইরাসের। কারণ আর কোন দেশের মানুষ এত আন্তরিকভাবে তাদের বংশ বৃদ্ধি করার জন্য এভাবে নিজেদের বুক পেতে দেয়নি। ঈদের কোলাকুলি এবার করোনারা করবে, মানুষ না।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা