একটা জাহাজে ঘুরতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আটকে পড়েছে। ব্রিটিশ সরকার ওই জাহাজে আঁটকে পড়া সকল ব্রিটিশ নাগরিক, প্রায় ৮০ জনের মতো সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এক বাংলাদেশির অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তিনি কোনো রকম চিকিৎসায় আর সাড়া দিচ্ছেন না। তার সাথে থাকা অন্য এক বাংলাদেশি সহকর্মীরও করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছে। এরা দুই জনই সিঙ্গাপুরে থাকে।

গত প্রায় দশ দিন ধরে আমি নিয়মিত এক ব্রিটিশ দম্পত্তির ভিডিও দেখছিলাম। এরা গিয়েছিল জাপানে ঘুরতে জাহাজে করে। সেই জাহাজে অনেকের করোনা ভাইরাস ধরা পড়ার পর পুরো জাহাজটিকে জাপানী কর্তৃপক্ষ আঁটকে দেয় এবং জাহাজে থাকা অন্য সব যাত্রীদের কোয়ারিনটিনে রাখা হয় ১৪ দিনের জন্য। অর্থাৎ সবাই সবার কাছ থেকে আলাদা। এই দুই দম্পত্তি জাহাজের ছোট্ট কেবিনে আঁটকে ছিলেন গত ১২ দিন। প্রতিদিন ভিডিও করে ইউটিউবে তাদের আপডেট দিতেন। পুরো পৃথিবীর মানুষ সেটা দেখছিল।

জাহাজের পরিবেশ খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায় দুই দিন আগে এই দম্পত্তি ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেন- তাদের যেন ইংল্যান্ডে ফেরত নিয়ে সেখানে আইসোলেশনে রাখা হয়। ভিডিওটা প্রচার হবার পর ব্রিটিশ সরকার নড়ে-চড়ে বসে। আমি বেশ ব্যস্ত সময় পার করছি গত কয়েক দিন ধরে। লেখালেখি থেকে শুরু করে অন্য কোনো কিছু করারই সময় পাচ্ছি না। এরপরও গত ১০ দিন গভীর আবেগী এই ব্রিটিশ দম্পত্তির ভিডিও নিয়মিত দেখেছি স্রেফ জানার জন্য- এরা আছে কেমন!

একটা জাহাজে ঘুরতে গিয়ে এভাবে আঁটকে পড়ছে- খারাপ লাগছিলো খুব। ব্রিটিশ সরকার আজ ওই জাহাজে আঁটকে পড়া সকল ব্রিটিশ নাগরিক, প্রায় ৮০ জনের মতো সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্রিটিশ দম্পতি 

আজ প্রায় দুই ঘণ্টা আগে ওই দম্পত্তি তাদের শেষ ভিডিওটি আপলোড করে জানিয়েছে- আজই তাদের শরীরে করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছে। তাই তাদের আর নিজ দেশে যাওয়া হচ্ছে না। তাদেরকে এখন নিয়ে যাওয়া হবে একটা হোস্টেলে, সেখান থেকে হাসপাতালে।

ষাটোর্ধ এই দম্পত্তি'র ভিডিও আমি গত দশ দিন ধরে দেখেছি। আজ এই ভিডিও দেখার পর প্রচণ্ড খারাপ লাগছে। অথচ এই দম্পত্তি কত শক্ত থেকে কিনা বলছে- আমরা আমাদের কাজটা করে গিয়েছি। জাহাজের পরিস্থিতি পুরো পৃথিবীকে জানিয়েছি। ব্রিটিশ সরকারও আমাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের কেবিনের বাইরে এই ১২ দিনে কারো সাথে মেলামেশা করিনি। কিছু করিনি। এরপরও করোনা ভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়লো। আর হয়তো ভিডিও আপলোড করা হবে না। বিদায়।

ভাবছিলাম- এই দুই দম্পত্তি কি বেঁচে নিজ দেশে ফেরত যেতে পারবে? শুনেছি বয়স্ক মানুষদের শরীরে করোনা ভাইরাস ধরা পড়লে বেঁচে থাকা কঠিন। ওই বাংলাদেশির বয়স অবশ্য ৩৫ এর মতো হবে। এরপরও তো তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

আমি জানি না কেন; তবে যে কোন কারণেই হোক পৃথিবীর সকল জায়গায় থাকা অসহায় মানুষদের প্রতি আমার সব সময় অন্য ধরনের আবেগ কাজ করে। ছোট বেলা থেকে নিজের জন্মগত অপূর্ণতার কারণে যে ঘৃণা এবং গ্লানি নিয়ে আমাকে বড় হতে হয়েছে; সেই অভিজ্ঞতাগুলো হয়তো আমাকে শিখিয়েছে- সবাই মানুষ। অসহায় মানুষদের কষ্টে দুঃখ পেতে হবে; সম্ভব হলে তাদের সাহায্য করতে হবে।

আমি আপনাদের হলফ করে বলতে পারি, আমি আমার এই পুরো জীবনে কখনো কোনো মানুষকে ঘৃণা করিনি। কারো সাথে কখনো উঁচু গলায় কথা পর্যন্ত বলিনি। এমনকি কেউ যদি আমাকে অপছন্দ করে কিংবা ঘৃণাও করে; আমি তার সাথেও হাসি মুখে কথা বলি এবং কোনোদিন উল্টো তাকে ঘৃণা করতে যাইনি। নিজের অপূর্ণতাকে জয় করার জন্য আমার মা ছোটবেলা থেকে আমাকে একটা বিষয়ই শিখিয়েছেন- কাউকে ঘৃণা করবে না। তারা তোমাকে ঘৃণা করলেও না! তুমি সবাইকে ভালবাসবে। দেখবে তাহলে একটা না একটা সময় তারাও তোমাকে আর ঘৃণা করবে না।

যা হোক, জাপানে আঁটকে পড়া এই দম্পত্তির ভিডিও ঘুম থেকে উঠে দেখা মাত্রই চোখটা ভিজে গিয়েছে। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম এদের অসহায়ত্ব। এই পরিস্থিতিতে তাদের তো আর কিছুই করার নাই। ভাইরাস যুক্ত কাউকে তো আর ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। এরা হয়ত ভাবছে- আর কোনোদিন কি নিজ দেশে ফেরত যেতে পারব না? দেখতে পারব না নিজ প্রিয়জনদের? তাদের সন্তান-প্রিয়জনরাও ওদের কাছে আসতে পারবে না! কী কঠিন, কী কষ্টের হতে পারে সেই অনুভূতি, সেটা মনে করেই আমার খারাপ লাগছে।

গত পরশু রাতে ইউনিভার্সিটি'র সহকর্মীদের সাথে পার্টিতে যাবার কথা। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল এই শহরের নামকরা এক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যাবো সবাই মিলে। হঠাৎ সবাই বলছে- চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যাওয়া ঠিক হবে না। কেউই শেষমেশ যেতে রাজি হলো না, কেবল আমি ছাড়া। আমি বললাম- এইভাবে আমরা যদি যাওয়া বন্ধ করে দেই, তাহলে এই মানুষগুলো চাকরী হারাবে। রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাবে। তাহলে এরা খাবে কী? এরা কোথায় যাবে? ওদের তো করোনা ভাইরাস হয়নি। সরকারও তো রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেয়নি। তোমরা কেন যাবে না? কেউ কিছু বলল না। তবে তারা সবাই জোড় গলায় বলল- আমরা যাবো না! আমি ভাবছিলাম- এটাই হয়ত বাস্তবতা। কেউ বিপদে পড়লে, অসহায় অবস্থায় এসে দাঁড়ালে কেউ আর কাউকে চিনতে চায় না।

চায়না কি জানত যে তারা এমন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতে এসে দাঁড়াবে? এক মাস আগেও কি তারা এটা বুঝতে পেরেছে? প্রবল পরাক্রমশালী দেশ চীনে এখন কোনো মানুষ ঘুরতে যাবে না। আগামী দুই বছরে কেউ চীনে যাবে কিনা সন্দেহ। এর মানে ওদের পর্যটন শিল্প কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে। বিশ্ব জুড়ে থাকা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট গুলোতে মানুষ যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চাইনিজ মানুষদের দেখলে মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে করোনা ভাইরাসের ভয়ে!

একটা পরাক্রমশালী দেশ মুহূর্তে কীভাবে অসহায় হয়ে গেল। সবাই এখন তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইছে। এই যে ব্রিটিশ দম্পত্তি জাহাজে করে ঘুরতে বের হয়েছিলো, তারা কি জানত তাদের ভাগ্যে এমন কিছু অপেক্ষা করছে? কিংবা সিঙ্গাপুরে থাকা ওই বাংলাদেশি?

অথচ আমরা মানুষরা একটু টাকা হয়েছে গেলে, একটা ভালো চাকরী পেয়ে গেলে; পরিচিত মানুষদের ভুলে যাই। বন্ধু-বান্ধবদের স্বীকার করি না! আমার পরিচিত এমন মানুষও আছে, যার বন্ধু বিসিএস ক্যাডারে চাকরী পাবার পর তাকে আর চিনতে পারে না। কোনো মেসেজের উত্তর দেয় না। এমনকি ফেসবুক থেকেও নাকি ব্লক করে দিয়েছে! কারণ সে বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে চাকরী করে! অথচ তারা এক সাথেই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এক জন পেয়েছে, আরেক জন পায় নাই।

আমি এমন লোককেও চিনি, যে কিনা বড় পদে চাকরী পেয়ে ঢাকা শহরের বড় বড় ক্লাবে পার্টি করে বেড়ায়; অথচ গ্রামে থাকা বাবা-মাকে অস্বীকার করে ক্ষ্যাত বলে! আমি বিদেশেও এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা বাংলাদেশ থেকে এসে একটু ভালো চাকরী পেয়ে কিংবা একটা ব্যবসা করে একটু টাকা-পয়সার মালিক হয়ে নিজেদের বিশাল বড় কিছু মনে করে, আশপাশের অন্য মানুষদের আর মানুষই মনে করে না।

আমার খুব অবাক লাগে। আচ্ছা এরা কি কেউ জানে- কখন কার পরিস্থিতে এই চীনের মতো কিংবা ব্রিটিশ ওই দম্পত্তির মতো হবে? কতো ছোট আমাদের জীবন। এরপরও আমরা আমাদের আশপাশে থাকা মানুষজনদের, প্রিয়জনদের কখনো কখনো ভুলে যাই কিংবা অস্বীকার করি স্রেফ নিজেদের টাকা পয়সা বেশি কিংবা ভালো অবস্থানের কারণে।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা