এসব উদাহরণগুলো হয়তো আমাদের মনে আশার আলো দেখাবে। এই ঘোর অমানিশার ভিড়েও চলুন না আশায় বুক বাঁধি। আমাদের তো আশাতেই বসতি! 

করোনা ক্রান্তিকালটা শেষ হলেই আমরা দেখবো অনেক ছোটখাট কোম্পানি হয়তো মুখ থুবড়ে পড়েছে। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো টেক স্টার্টাপগুলোর জন্য ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, অনেকে হয়তো না পেরে একদম বসে পড়বে।

কিন্তু অনেকে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, তেমনি নতুন নতুন বিজনেস অপরচুনিটিও তৈরী হবে। যেমনটা হয়েছিলো ৭১ পরবর্তী সময়ে। একটা যুদ্ধবিধস্ত জাতির জন্য নতুন করে শুরু করাটা একটা মহামারী আক্রান্ত জাতির চাইতে কঠিন। কারণ, মহামারী শুধু মানুষ মারে, কিন্তু একটা যুদ্ধ শুধু দেশের মানুষ নয়, অবকাঠামো, রাস্তা-ঘাট-দালান-কোঠা-ফ্যাক্টরি সব ধ্বংস করে দেয়। সুতরাং, সেখানে চ্যালেঞ্জ আরো অনেক বেশি এবং আরো অনেক কঠিন। 

খেয়াল করে দেখবেন, ৭১ এর পর দেশে যতগুলো কোম্পানি গড়ে উঠেছে, পরবর্তীতে এরা গ্রুপ অব ইন্ডাসট্রিজে পরিণত হয়েছে। এদের শুরুটা কিন্তু ছিল খুব ছোট পরিসরে। আস্তে আস্তে মহিরুহ হয়েছে। যেমন: বসুন্ধরা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, আনন্দগ্রুপ, প্রাণ-আর এফএল এদের সবার গোড়াপত্তন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরে। এসিআই গ্রুপ চালু হয় যুদ্ধের মাত্র ২ বছর আগে। মানে তারা যুদ্ধের চড়াই উৎরাই পার করেই আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। 

বাংলাদেশের সবচাইতে বড় পার্টিকেল বোর্ড বানানোর কোম্পানি যুদ্ধের কয়েক বছর আগে তাদের যাত্রা শুরু করে। আজ তাদের কোম্পানিগুলোতে প্রায় ৭৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়। সেই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা যুদ্ধের পর কিছু ব্রিলিয়ান্ট মুভ নিয়েছিলেন। সে সময় পরাজিত পাকিস্থানী বাহিনী অনেক কিছু ফেলে যায় এদেশে, সেগুলো সরকার নিলামে তুলে, অনেকের মত তিনিও কিনে নেন। এর ভেতর কিছু পাকিস্থানী ফ্যাক্টরিও ছিলো।

মজার ব্যাপার হলো, ফ্যাক্টরি কেনার আগে তিনি খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারলেন যে, ফ্যাক্টরির ভেতরে অনেক পুকুর আছে, এবং সেগুলোর নীচে সেই আমলের প্রায় কয়েক লাখ টাকার গাছ চুবিয়ে রাখা হয়েছে। এই কারণেই তিনি নিলামে সর্বোচ্চ দাম হেঁকে ফ্যাক্টরিগুলো কিনে নেন। মানুষ মনে করলো, তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, জমি কেনা বাদ দিয়ে পুকুরওয়ালা ফ্যাক্টরি কিনছে কেন? তাও আবার এত দাম দিয়ে? সবাই ভাবলো মাছ চাষ করবেন বুঝি। 

কিন্তু তিনি আসলে ফ্যাক্টরিগুলো কিনছিলেন পারটেক্স বানাবার কাজে। অনেকেই হয়তো জানেন, গাছ কেটে মাস খানেক পানিতে চুবিয়ে রাখতে হয়, তারপর সেটা দিয়ে পারটেক্স হয়। শুনেছিলাম প্রায় ১ বছরের পারটেক্স বানাবার কাচাঁমাল সে সময় ফ্যাক্টরিগুলোর পুকুরের নীচে মজুদ করে রাখা ছিল। সেগুলো ব্যবহার করে পারটেক্স বোর্ড বানিয়েই তিনি নিলামের টাকার কয়েকগুন লাভ করেছিলেন।

আমাদের মিরপুরের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কথাও ধরা যায়। আমার ইউনিভার্সিটির খুব প্রিয় একজন স্যারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তিনি। তো সেই ব্যবসায়ীর এক সময় ভয়ানক দুর্দিন ছিল, এক বেলা চুল জ্বললে আরেক বেলা জ্বলতো না, আধা পেটা এক পেটা খেয়ে দিন কাটাতে হতো। তো মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েকজন ল্যান্ড সার্ভেয়ার আসলো তাদের এলাকায়। তিনি তখনো জানতেন না এদের কাজ কি। তো তাদের সাথে কথা বলে তার মাথায় একটা আইডিয়া আসলো।

তিনি ল্যান্ড সার্ভেয়ার হায়ার করে এলাকার সবগুলো জমি চেক করালেন, কোন জমির নীচে পানির স্তর কত মিটার পর থেকে শুরু হয়েছে, সেটা দেখাই তার সার্ভে করার উদ্দেশ্য! তো যে সব জমির পুরুত্ব সবচাইতে বেশী, সে সব জমিগুলো তিনি বিভিন্ন জাগা থেকে টাকা পয়সা ম্যানেজ করে সস্তায় কিনতে শুরু করলেন, দেখা গেলো জমিগুলোর তেমন বাজার মূল্য নেই, মানুষজন বল্ল ওগুলা না কিনে আমারটা কিনেন, এর চাইতে সস্তায় দিবো। কিন্তু তিনি রাজী হলেন না। কেন তিনি এসব জমি কিনছেন, কেউই বুঝলো না। তিনিও কারো সাথে শেয়ার করেন নি।

পরবর্তীতে তিনি একটা ইটের ভাটা চালু করলেন, এবং সেই জমিগুলোর মাটি তার ইটের ভাটায় ব্যবহার করা শুরু করলেন। তিনি তখন হিসাব করেছিলেন, প্রতি বছর যে পরিমান মাটি তার ভাটায় দরকার হয়, সেটার ক্রয়মূল্য একটা জমির ক্রয়মূল্যের চাইতে বেশী। সুতরাং, মাটি কেনার চাইতে জমি কেনা তার জন্য বেশী লাভজনক ছিলো।

এসব উদাহরণগুলো হয়তো আমাদের মনে আশার আলো দেখাবে। হয়তো এই ক্রান্তিকালটা কেটে গেলে অনেক নতুন ধরনের ব্যবসার সুযোগ আসবে, যে সব আগে কখনই ছিল না। আবার পুরনো অনেক ব্যবসাও নতুন করে লাইম লাইটে আসতে পারে। সেটা নিয়ে আলাদা করে লেখার ইচ্ছে আছে একদিন। এই ঘোর অমানিশার ভিড়েও চলুন না আশায় বুক বাঁধি। আমাদের তো আশাতেই বসতি! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা