“আমার মেয়েটা খুন হয়ে ঘরে পড়ে রইল, মামলা হলো। আমি ১৬ বছর ধরে আদালতে আদালতে ঘুরলাম। তারপর জানলাম, সর্বোচ্চ আদালতে তারা খালাস পেয়েছে। তাহলে বুশরাকে খুন করল কে? আমার তো মনে হয়, বুশরা নামে কখনো কেউ ছিলই না…”

উচ্চ আদালত থেকে আপিল বিভাগ যেদিন বুশরার খুনের প্রধান দুই আসামীকে খালাস দিলো, সেদিন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন বুশরার মা লায়লা ইসলাম। নিজের কষ্ট চেপে রেখে মিডিয়াকে বলেছিলেন, 'এখন তো মনে হচ্ছে বুশরা নামে কেউ ছিলোই না কখনও, এই নামের কোন মেয়েকে আমি জন্ম দেইনি, তাকে খুনও করা হয়নি।' 

আইনজীবীরা তাকে জানিয়েছিলেন, আপিলের এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করার সুযোগ আছে। লায়লা বেগম সেই সুযোগটা নিয়েছিলেন কিনা, সেটা আমরা জানিনা। আমি হলে নিতাম না। ষোলোটা বছর ধরে নিজের মেয়ের ধর্ষক আর হত্যাকারীদের বিচারের আশায় লড়ে যাওয়া একজন ভদ্রমহিলা দেখেছেন আইনের ফাঁক গলে একে একে বেরিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এতগুলো বছর ধরে কোর্ট-কাছারির ঘানি টানার পরে যখন প্রধান দুই অভিযুক্তকেও দায়মুক্ত হয়ে যেতে দেখলেন তিনি, তখন বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে তার বিশ্বাস উঠে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। 

ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিল মেয়ে, নাম রাখা হয়েছিল রুশদানিয়া ইসলাম বুশরা। বাবা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, মা গৃহিনী। তাদের একমাত্র সন্তান বুশরা, তাই আদরের কমতি ছিল না কোথাও। সহপাঠীদের অনেকেই যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে, সংসারজীবন শুরু করেছে, বুশরা তখন পড়াশোনায় ব্যস্ত, ক্যারিয়ার নিয়ে ভীষণ সচেতন ছিল মেয়েটা, ঢাকার সিটি কলেজে অনার্সের ছাত্রী ছিল সে। পশ্চিম চৌধুরীপাড়ায় ছিল বুশরাদের বাসা। সেখানেই ২০০০ সালের ১লা জুলাই রাতে খুন হন বুশরা, ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় তাকে। বেডরুম থেকেই উদ্ধার করা হয় বুশরার লাশ। রক্তাক্ত দেহটা পড়ে ছিল বিছানায়, হাত পা ছিল বাঁধা, রুমের জানালার গ্রিলগুলো কাটা। হত্যাকাণ্ডের সময় বুশরার বাবা ছিলেন আমেরিকায়, বাসায় থাকা কেউ সকালের আগে টের পাননি ঘটনাটা।

রুশদানিয়া ইসলাম বুশরা

জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ ছিল এম এ কাদের নামের এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে, সে আবার সম্পর্কে বুশরার মামা হয়। একই বাসায় থাকতো তারা, কাদের তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন, প্রভাব খাটিয়ে বুশরাদের উৎখাত করতে চেয়েছিলেন হাজীপাড়ার বাসা থেকে। সেটা সম্ভব না হওয়াতেই তার আক্রোশটা গিয়ে পড়ে বুশরার ওপরে, বুশরার পরিবারকে শিক্ষা দিতেই নিরীহ এই তরুনীকে বলি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল খুনীরা।

পরদিনই মামলা হলো, তখনও কাদেরের নাম সামনে আসেনি। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে জায়গাজমি নিয়ে বিরোধের কথা, সন্দেহ গিয়ে পড়ে কাদেরের ওপর। শুরুতে গড়িমসি করলেও, পরে মিডিয়ায় বারবার ফলো-আপ প্রকাশিত হওয়ায় বাধ্য হয়ে কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নিয়ে যায় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ড শেষে আসামীর তালিকায় যুক্ত হয় কাদের, তার স্ত্রী রুনু কাদের, কাদেরের শ্যালক শেখ শওকত আহমেদ ও শেখ কবির আহমেদের নাম। 

এরপরের গল্পটা শুনতে ভালো লাগবে না। মেয়ের হত্যাকান্ডের পরে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বুশরার বাবা, চাকরির বয়সও শেষ হয়ে গেছে ততদিনে। বুশরা নিহত হবার বছর তিনেক পরে তিনিও চলে গেলেন আচমকা, লায়লা ইসলামকে একা করে দিয়ে। এরপরেও লড়াইটা থামাননি লায়লা, মেয়ের হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্যে বছরের পর বছর ধরে মামলা চালিয়ে গেছেন তিনি, হুমকি-ধামকিতে পিছপা হননি, অনেকদিন পরপর তারিখ পড়েছে, তিনি ছুটে গেছেন আদালতে, মেয়ের হত্যাকান্ডের বিচারে যেন কমতি না থাকে কোথাও! আর আমাদের বিচারব্যবস্থা লায়লা ইসলামকে উপহার দিয়েছে একের পর এক হতাশা।

বুশরা হত্যাকান্ডের অভিযুক্ত সবাই খালাস পেয়েছেন একে একে

২০০৩ সালের ৩০শে জুন নিম্ন আদালত কাদেরসহ তিন আসামীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন, কাদেরের স্ত্রী রুনুকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, বাকী দুইজন খালাস পান। সেখান থেকে মামলা যায় হাইকোর্টে। হাইকোর্টের আপিল বিভাগ কাদেরের ফাঁসি ও রুনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখে, অপরাধ প্রমাণীত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেয়া হয় কাদেরের দুই শ্যালক শওকত ও কবীরকে।

এই রায়ের বিপক্ষে আপিল করে দুইপক্ষই, মামলা গেল সুপ্রীম কোর্টে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে। বুশরা হত্যাকাণ্ডের ষোলো বছর পরে, ২০১৬ সালে এসে প্রধান বিচারপতি (তৎকালীন) সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রায় দিলো, সেই রায়ে খালাস দেয়া হলো ফাঁসির সাজা পাওয়া কাদের এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পাওয়া রুনু- দুজনকেই। লায়লা বেগম চোখভর্তি জল নিয়ে দেখলেন, তার সামনে দিয়ে কাঠগড়া থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যাচ্ছে তার মেয়ের হত্যাকারীরা।

রামপুরার হাজীপাড়ায় বুশরাদের বাসাটা এখন ভেঙেচুড়ে গেছে, দেয়ালে ধরেছে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা। রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না, একপলক দেখেই বোঝাই যায়। সেই ফাটল ধরা দেয়ালে বুশরার ছবি টানানো, ফ্রেমে বাঁধা ছবি থেকে মেয়েটা তাকিয়ে হাসছে। বুশরা নেই, কিন্ত অমলিন হাসিটা রয়ে গেছে। সেই ছবির দিকে তাকিয়েই দিন কাটে লায়লা ইসলামের। কথাবার্তা খুব একটা বলেন না কারো সাথে, স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকারেই কাটিয়ে দিচ্ছেন জীবনের বাকী দিনগুলো।

মেয়ের ছবিকে সঙ্গী করেই বেঁচে আছেন লায়লা ইসলাম

আশেপাশের প্রতিবেশীরা সবাই জানে, খালাম্মা (লায়লা ইসলাম) বেঁচে আছেন তার মেয়ের স্মৃতি নিয়ে, আর কোন সম্বল নেই মানুষটার। কারো প্রতি তার কোন আক্ষেপ নেই, শুধু বুশরার কথা উঠলেই তিনি আপনমনে বলেন, "আমার মেয়েটা খুন হয়ে ঘরে পড়ে রইল, মামলা হলো। আমি ১৬ বছর ধরে আদালতে আদালতে ঘুরলাম। জজকোর্ট, হাইকোর্ট সাজা দিলেন। তারপর জানলাম, সর্বোচ্চ আদালতে তারা খালাস পেয়েছে। তাহলে বুশরাকে খুন করল কে? আমি কী বলব? বুশরা কি কখনো ছিল? আমার তো মনে হয়, বুশরা নামে কখনো কেউ ছিলই না..." 

বুশরার কথা সবাই ভুলে গেছে, রাষ্ট্র তাকে মনে রাখেনি, মিডিয়ার কাছে বুশরা এখন আর 'হট নিউজ' আইটেম নয়। বুশরার মায়ের চোখের জল আমাদের ভাবায় না, একজন মাকে আমরা তার সন্তান হত্যার বিচার এনে দিতে পারিনি, এই আক্ষেপটা আমাদের পোড়ায় না। নুসরাতের হত্যা মামলার দেয়া রায় নিয়ে আমরা উচ্ছ্বসিত হই, আমাদের মনে পড়ে না বুশরার কথা, আমাদের মাথায় আসে না, কোর্ট-কাছারীর পাক ঘুরতে ঘুরতে নুসরাতের মামলার অবস্থাও কোন একদিন বুশরার মতো হতে পারে কিনা...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা