মেয়েরা যে সেই সময় একটা গানের দলই করে ফেলবে, যেখানে কেউ দাঁড়াবে ইলেকট্রনিক গিটার নিয়ে, কেউ বাজাবে কি বোর্ড, কেউ ধুম ধাম করে বাজাতে থাকবে ড্রাম সেট-সে কথা কজনই ভাবতে পেরেছিলো! 

বাংলাদেশের ব্যান্ড ইতিহাসে একটি হারিয়ে যেতে বসা নাম “ব্লু বার্ডস”। অনেকেই নিশ্চিতভাবেই প্রথমবারের মতোই শুনছেন এই ব্যান্ডটির কথা। প্রথমবারের মতো আরো একটি তথ্য শুনে হয়তো চমকেও যেতে পারেন। এটিই বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড যেখানে সব সদস্যই ছিলেন নারী! চট্টগ্রামের লালখান বাজার। এইদিকের মতিঝর্ণা নামক এলাকা থেকে উত্থান হয়েছিলো দেশের প্রথম নারী ব্যান্ড দলটির। আমরা যারা “নাইনটিজ কিড” বা তার ও আগে জন্ম নিয়েছিলাম-নব্বুই দশকে বাংলাদেশের কালজয়ী গান শুনেই আমাদের শৈশব কেটেছিলো।

ওপেন এয়ার কনসার্টের সেই যুগে...


বাংলা ব্যান্ডের তখন স্বর্নালী সময়। সবগুলো ব্যান্ড তাদের সেরা কাজগুলো প্রডিউস করতে শুরু করেছিলো তখনই। ওয়ারফেজ, মাইলস, সোলস, ফিডব্যাক, আর্ক, ডিফারেন্ট টাচ, এলআরবি, ফিলিংস, রেনেসাঁ, প্রমিথিউস সহ আরো অনেক ব্যান্ডই আশি নব্বুই দশকে ব্যান্ড সংগীত দিয়ে তরুণদের মাতিয়ে রেখেছে। এমনই এক সময়েই “ব্লু বার্ডস” নামক ব্যান্ডটির জন্ম।  ১৯৯০ সালে।

সে বছর ১১ নভেম্বর দিনটি শুধু ব্যান্ডটির জন্য নয়, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের জন্যেই এক বিশেষ দিন। সেদিন জন্ম নেয় দেশের প্রথম ব্যান্ড,যাদের ভোকাল থেকে ড্রামার পর্যন্ত প্রতিটি পারফর্মারই নারী।“ব্লু বার্ডস”নব্বুই দশকে দেশের ব্যান্ড সংগীতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ওই সময়কার প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত,তার চেয়ে বড় কথা এভাবে চিন্তা করা যে শুধু নারীরাই একটা গোটা ব্যান্ড দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ,নজরুল, ফোক ঘরানার গান করতেন অনেক মেয়েরা ওই সময়ে। এর বাইরে যে মেয়েরা একটা গানের দলই করে ফেলবে, যেখানে কেউ দাঁড়াবে ইলেকট্রনিক গিটার নিয়ে, কেউ বাজাবে কি বোর্ড, কেউ ধুম ধাম করে বাজাতে থাকবে ড্রাম সেট-সে কথা কজনই ভাবতে পেরেছিলো! বিশিষ্ট সঙ্গীতানুরাগী জ্যাকব ডায়াস এর অবশ্য ভূমিকা ছিলো ব্যান্ডটি গড়ে তোলার পেছনে। তার উৎসাহ আর অনুপ্রেরণার কথা না বললেই নয়। তিনি দলটির সদস্যদের অনুপ্রেরণা দিতেন, গান নিয়ে কথা বলতেন। সাহস দিতেন সবাইকে, চাইলেও তোমরাও পারবে।

ব্লু বার্ডস- সাহসী কন্যার দল


ব্লু বার্ডস পেরেছিলো। একত্রিত হয়ে একটি দল হিসেবে ব্যান্ড হয়ে উঠতে পেরেছিলো। চট্ট্রগ্রামে তখন নতুন নতুন বিজয় মেলার প্রচলন হয়। নব্বুই সালে সেই বিজয় মেলাতেই প্রথমবারের মতো মঞ্চে উঠে “ব্লু বার্ডস”। ব্যান্ড হিসেবে তারা সেই প্রথম পারফর্ম করে বিজয় মেলার মঞ্চে। 

শুরুর দিকে শ্রোতাদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে ব্লু বার্ডস। নজর কেড়েছে অনেক সঙ্গীতপ্রেমীদের। বেশ আলোচিত হয় নব্বুই এর দশকে ব্যান্ডটি। ১৯৯৬ সালে বিবিসি তাদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছিলো। ফলে, দেশ তো বটেই, দেশের বাইরেও ব্যান্ডটির নাম ছড়িয়ে গিয়েছিলো। ব্যান্ডটিতে বিভিন্ন সময়ে অনেক সদস্যই এসেছে, অনেকে চলেও গেছে।

কয়েকজন সদস্যের পরিচয় বলি- ঝুমড়ি চৌধুরী (ভোকাল এবং কী-বোর্ড), পলি সেন (ড্রামার), লিপি (কী-বোর্ড), টিনা ডি কস্টা (বেইজ গিটার), সোমা (লিড গিটার), আনজুমান আরা (ভোকাল এবং কী-বোর্ড), মুক্তা (ভোকাল), সীমা (ভোকাল), রুবা হোসাইন (ভোকাল), এনিটা (ভোকাল), বেলী (ড্রামার)। কফি হাউজের ভেঙ্গে যাওয়া আড্ডা’র মতো ব্যান্ডটির পুরানো অনেক সদস্যই এখন নেই। কেউ কর্মব্যস্ততায় দূরে চলে গেছেন। কেউ অন্য কোথাও নিজের ক্যারিয়ার খুঁজে নিয়েছেন। কেউ হারিয়ে গিয়েছেন সময়ের গর্ভে। পপি নামে ব্যান্ডটিতে একজন সদস্য ছিলেন।

তিনি এখন দেশেই আর নেই, আছেন বাহরাইনে। সীমা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গিয়েছেন অনেক দিন হলো। শিখা আর নমিতা নামের দুই সদস্য পাড়ি জমিয়েছেন ইতালিতে। রুবা হোসাইন লন্ডনে “ফ্যামিলি টাইজ” নামে নিজেরই একটা ব্যান্ড গড়ে তুলেছেন। বেলী ব্যান্ড ছেড়ে এখন চলচ্চিত্রের আইটেম সং গান। এছাড়া পুরানো অনেক সদস্যই বিয়ে করে দূরে চলে গেছেন। অনেকেই সময় দিতে পারেন না। 

প্রথমদিকের শিল্পীদের অদম্য আগ্রহ আর সাধনা ব্লু বার্ডসকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলো। পপ-রক জনরার এই ব্যান্ডটির প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র এলবামটি বের হয় ১৯৯৫ সালে। এলবামটির নাম “সৈকতে একদিন”। ১৪ টি ট্র্যাক নিয় এই এলবামটি তারা প্রকাশ করেন। যদিও অনলাইনে এই গানগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্যাসেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার কারণে এই গানগুলোর ডিজিটালভার্শন হয়নি।

ব্লু বার্ডসের এলব্যাম 


তবে নারীদের এই প্রথম ও ঐতিহাসিক এই ব্যান্ডটির গানগুলো সংরক্ষণ করা উচিৎ। পাশাপাশি গানগুলো নতুন প্রজন্ম যেনো শুনতে পারে সেই ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সহজ সাবলীল লিরিক ও গায়কীর এই ব্যান্ডটি তাদের গানসহ হারিয়ে যেতে বসেছে এটা মেনে নেয়া কঠিন। শুরুর দিকের সেই জৌলুস আজ আর নেই। নেই তেমন আলোচনাও।

তবুও এত কিছুর পরেও, আশ্চর্য কথা হচ্ছে এই ব্যান্ডটি এখনো টিকে আছে কোনোভাবে। সৈকতে একদিন এলবামের টাইটেল ট্র্যাক শুনে মনটা উদাস হয়ে আছে। মনে হচ্ছে নির্জন সন্ধ্যায় গান শুনতে শুনতে চলে গিয়েছি নব্বুই এর দশকে-

“সৈকতে একদিন নির্জন সন্ধ্যায় ঝিনুক কুড়াতে গিয়ে হাতে হাত,চোখে চোখ রেখে বলেছিলে পৃথিবীটা কত সুন্দর...”


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা