১৯৬১ সালের এই দিনে ১১ জন বাঙালি শহীদ হয়েছিলেন আসাম পুলিশের গুলিতে। বাংলা ভাষাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যার মর্যাদার জন্য মানুষ রক্ত দিয়েছে। তাও একবার নয়। তিন তিন-বার, দুইটি পৃথক দেশে, আলাদা সময়ে...

আজ ১৯ মে। ভাষা শহিদ দিবস। ১৯৬১ সালের এই দিনে ১১ জন বাঙালি শহীদ হয়েছিলেন আসাম পুলিশের গুলিতে। সরকার অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করতে চাইলে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে, যেহেতু ঐ অঞ্চলের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল বাংলাভাষী। 

বাংলা ভাষাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যার মর্যাদার জন্য মানুষ রক্ত দিয়েছে। তাও একবার নয়। তিন তিন-বার, দুইটি পৃথক দেশে, আলাদা সময়ে। এজন্যই বাংলা ভাষা আর বাংলা ভাষাভাষীদের দায় রয়েছে পৃথিবীর সমস্ত মর্যাদা হারাতে যাওয়া-বিলুপ্তপ্রায় ভাষাকে সম্মানিত করার। এজন্যই ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। 

এই পৃথিবীর ৫ জন মানুষও যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষা আর ভাষার মানুষের মর্যাদা রক্ষার অনুপ্রেরণা 'বাংলা ভাষা'। বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী ভাষা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা কিংবা জেনভা ক্যাম্পের বিহারীদের 'উর্দু' ভাষার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। কারণ আমরা ভাষার মর্যাদার ব্যাপারটি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছি রক্ত দিয়ে।

বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল আসামের মানুষও

২১শে ফেব্রুয়ারি উর্দু বনাম বাংলার যুদ্ধ ছিল না। বরং শাসকের চাপিয়ে দেয়া নীতির বিরুদ্ধে একটি ভাষা 'বাংলার' মর্যাদা আন্দোলন ছিল। শাসক চাইলে আরবী, ইংরেজিও চাপিয়ে দিতে চাইতো। খাজা নাজিমুদ্দিনরা চেয়েছিলও আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রচলন করতে, উর্দু রাষ্ট্রভাষা বিতর্কের আগে।

তাই ২১শে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে 'উর্দু বনাম বাংলা' এই ঘৃণা চর্চা খুবই বাজে চর্চা। উর্দু, হিন্দি এই পৃথিবীর অন্যসব ভাষার মতোই মানুষের মুখের ভাষা।

গতকাল ক্রিকেটার তামিম ইকবাল লাইভে ভারতীয় বিরাট কোহলির সাথে হিন্দিতে কথা বলার কারণে অনেকেই গালাগাল দিচ্ছেন। তামিমের ফ্যামিলি হিস্ট্রি বিবেচনায় এনে তাকে বিহারীর বাচ্চা গালাগালও দিলেন এক শ্রদ্ধেয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক বড়ভাই। আমরা অনেকে প্রতিবাদ করলেও উনি সন্তুষ্ট হলেন না। 

অথচ উনি যেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন, সেই মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ক্রিকেটার শহিদ মুশতাক নিজেই উর্দুভাষী বিহারী ছিলেন। পাকিস্তান বাহিনী তাকে হত্যা করে ফেলে রেখেছিল, ২৫ মার্চ রাতে। কারণ তিনি শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আর উনার প্রতিষ্ঠিত আজাদ বয়েজ ক্লাবে একসাথে আড্ডা দিতেন।
শহিদ মুশতাকের লাশ স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করে, আরেক ক্রিকেটার শহিদ জুয়েল মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। ক্র‍্যাক প্লাটুনের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহিদ হয়েছিলেন।

ভাষা শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত আসামের শিলচর

১৯৭০ সালে গোলাম আযম দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচন করে। গোলাম আযমকে হারিয়ে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ জহির উদ্দীন। তিনি নিজেও বাংলাভাষী ছিলেন না। ছিলেন উর্দুভাষী।

এজন্যই ভাষা-প্রশ্নে বিদ্বেষ কেবল অহেতুক বাজে বিদ্ধেষ ছাড়া আর কিছু নয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯মে -তে বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে যে রক্ত ঝড়েছিল, পৃথিবীর সব ভাষাই সেই মর্যাদায় মহিমান্বিত হওয়ার দাবী রাখে। আফ্রিকার জুলু, এমাজনের নৃ-গোষ্ঠীর দুর্বোধ্য ভাষা থেকে শুরু করে আমাদের পাহাড়ের তঞ্চংগ্যা ভাষাও এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা  দিবসের হিস্যা পায়।

২১ শে ফেব্রুয়ারির চেতনা তাই বাংলার শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের চেতনা নয়। পৃথিবীর সকল প্রান্তে সকল ভাষার মর্যাদাপূর্ণ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা