অনেকে তাকে আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবি ভাবে। অথচ এই মানুষটাই আওয়ামী লীগের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, ক্লাস ফাইভের পিএসসি পরীক্ষার বিরোধিতা করেছেন। আওয়ামী লীগ যখন হেফাজতকে কাছে টেনে নিয়েছে, তিনি সেটার সমালোচনা করেছেন...

ঘটনাটা এক বা দুই বছর আগের। বাংলা একাডেমিতে বইমেলার উদ্বোধন করতে আসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে তার জন্যে লাল গালিচা বিছানো হয়েছে, গাড়ি থেকে নেমে সেই লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে মঞ্চ পর্যন্ত যাবেন প্রধানমন্ত্রী। গাড়ি থেকে নামতেই শেখ হাসিনার চোখ পড়লো ড. আনিসুজ্জামানের ওপর, বাংলা একাডেমির সভাপতি তিনি, প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে নিতে এসেছেন। 

শেখ হাসিনা সরে দাঁড়ালেন লাল গালিচা থেকে, তার পরিবর্তে সেই গালিচার ওপর দিয়ে হাঁটতে বললেন আনিসুজ্জামানকেই। কারন দেশবরেণ্য এই শিক্ষক তারও শিক্ষক ছিলেন একটা সময়, শিক্ষকের সম্মান তো সবার ওপরে! সেদিন আরও কয়েকটা ছবি তুলেছিলেন আলোকচিত্রীরা, তার একটায় দেখা যাচ্ছে ড. আনিসুজ্জামানের গায়ের চাদর ঠিক করে দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। একজন শিক্ষক কতটা সম্মানিত হলে প্রধানমন্ত্রী তাকে লাল গালিচা ছেড়ে দিতে পারেন, জনসম্মুখে দাঁড়িয়ে তার চাদর ঠিক করে দিতে পারেন? 

শুধু শেখ হাসিনা নয়, বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত তরুণ বয়সের আনিসুজ্জামানকে সম্মান দিতেন। এমনিতে বঙ্গবন্ধু সবাইকে 'তুই' বলে ডাকতেন, একটা আন্তরিকতা মিশে থাকতো সেই ডাকে। কিন্ত আনিসুজ্জামানকে কখনও 'তুই' সম্বোধনে ডাকেননি জাতির পিতা, শিক্ষকের সম্মান দিয়ে বয়সে ছোট আনিসুজ্জামানকে 'তুমি' সম্বোধন করেছেন বরাবর। স্বাধীনতার পরে আনিসুজ্জামানকে শিক্ষাসচিবের দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সেটা বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন- 'আমার কাজ ক্লাসরুমে, এই আমলাতন্ত্রের চক্করে আমি পড়তে পারব না...' 

বাংলা একাডেমির সেই অনুষ্ঠানে

২০২০ সালটা যেন সব হারানোর বছর হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে আমাদের সামনে। একে একে চলে যাচ্ছেন আমাদের অভিভাবকেরা, আমাদের সুপারহিরোরা। জনপ্রশাসনের সাবেক কর্তা এবং পিএসসির চেয়ারম্যান সা'দত হুসেইন মারা গেলেন, দু'দিন বাদেই তার পথ ধরে অন্য ভূবনে পাড়ি জমালেন প্রবীণ শিক্ষক ও প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী। এবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন আনিসুজ্জামান স্যারও। এত প্রয়াণের ব্যথা আমরা কি করে সইব? 

দল-মত-নির্বিশেষে সবার সম্মান তিনি পেয়েছেন (জামাতীদের হিসেব বাদ)। জন্ম নিয়েছিলেন ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জন্মে যে কয়টি বড় রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে, সবগুলোতেই তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০১২ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির সভাপতি ছিলেন। 

বাংলাদেশে যেটা হয়, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে শিক্ষকেরা হয় নীল বা সাদা দলে বিভক্ত হয়ে যান, সরাসরি রাজনীতিতে চলে আসেন, নইলে কোন দিকে না গিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন। আনিসুজ্জামান সেই অল্প ক'জন মানুষের একজন, যিনি বরাবরই সোচ্চার ছিলেন নানা আন্দোলন-সংগ্রামে, যখন যে সঅরকার ক্ষমতায় থেকেছে, সেই সরকারের অবিচারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, ভুলের সমালোচনা করেছেন। জাহানারা ইমাম যখন যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে গণআদালত করেছেন, সেখানে সক্রিয় মুখ ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান। 

ত্বকী হত্যার বিচারের দাবীতে সোচ্চার ছিলেন আনিসুজ্জামান

তিনি ধর্মান্ধতার বিপক্ষে মুখ খুলেছেন, কথা বলেছেন বারবার। বলেছেন, ধর্ম পালনের অধিকার যেমন আছে, তেমনই কেউ ধর্ম পালন করতে না চাইলে তাকে সেই অধিকারও দিতে হবে। ব্লগার হত্যাকান্ডের সময় বাকীরা যখন বালিতে মুখ গুঁজে রেখেছিল, ভয়ে কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এসেছে সবার, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকেও যখন হত্যাকারীদের বাদ দিয়ে বরং পরোক্ষভাবে ব্লগারদের ধর্ম নিয়ে লেখালেখির ওপরেই দোষ চাপানোর চেষ্টা হয়েছে- তখনও আনিসুজ্জামান মৌলবাদের বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন। 

অনেকে তাকে আওয়ামী লীগপন্থী বুদ্ধিজীবি মনে করে। অথচ এই মানুষটাই আওয়ামী লীগের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। ক্লাস ফাইভের পিএসসি পরীক্ষা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর কেমন চাপ সৃষ্টি করছে, সেটা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। আওয়ামী লীগ যখন হেফাজতকে কাছে টেনে নিয়েছে, তিনি সেটার সমালোচনা করেছেন। নারায়ণগঞ্জে ত্বকীকে হত্যা করা হলো, অভিযোগের আঙুল উঠলো সরকারদলীয় এক সাংসদের বিরুদ্ধে, তিনি তখন নারায়ণগঞ্জে গিয়ে ত্বকী হত্যার বিচার চেয়েছেন বলিষ্ঠ গলায়। বলেছেন, রাষ্ট্র যদি ত্বকীর হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে না পারে, সেটা হবে রাষ্ট্রের সীমাহীন ব্যর্থতা। 

ড. আনিসুজ্জামান একটা মহাসমুদ্রের নাম, বিশাল কলেবরের একটা উপন্যাস তিনি। ছোট্ট একটা লেখায় তাকে ধারণ করা সম্ভব নয়, তাকে শ্রদ্ধা জানানোটাও অসম্ভব। তার বিদায়ে আমরা সত্যিকারের একজন অভিভাবককে হারালাম, শিক্ষক তো অনেক হয়, কিন্ত আলোর দিশারি হয়ে জাতির পথপ্রদর্শক ক'জন হতে পারেন? আনিসুজ্জামান স্যার সেটা পেরেছিলেন... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা