সিডর তছনছ করে দিয়েছিলো বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল। প্রাণ হারিয়েছিলো দুই হাজারের বেশি মানুষ। এবার সেই ভয়ঙ্কর সিডরকে ছাড়িয়ে সুপার সাইক্লোন আম্পান এগিয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে...

২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘুর্নিঝড় সিডর তছনছ করে দিয়েছিলো বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূল। প্রাণ হারিয়েছিলো দুই হাজারের বেশি মানুষ। এবার সেই ভয়ঙ্কর সিডরকে ছাড়িয়ে সুপার সাইক্লোন আম্পান এগিয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে। এরই মধ্যে এই ঘূর্ণিঝড় সিডরের চেয়েও বেশি শক্তি সঞ্চয় করেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ‘আম্পান’ প্রলয়ঙ্করী ‘অতি ঘূর্ণিঝড়’ হয়ে বুধবার সকাল থেকে বিকাল বা সন্ধ্যায় বাংলাদেশ এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব উপকূলজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। উল্লেখ্য, কোনো ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটারের বেশি হলে সেটাকে সুপার সাইক্লোন বলা হয়ে থাকে।

অতি প্রবল শক্তিশালী তথা এক্সট্রিম সিভিয়ার সাইক্লোন থেকে সুপার সাইক্লোনে উন্নীত হয়েছে এটি। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কেন্দ্রের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ২২৩ কিলোমিটার। যা বিকেল পর্যন্ত ছিল ২১০ কিলোমিটারেরও কম। এ ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের এখন যে বেগ তা সিডরের চেয়েও বেশি। ফলে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

আম্পানের স্যাটেলাইট ইমেজ

বঙ্গোপসাগরের রেকর্ডেড ইতিহাসের দ্বিতীয় সুপার সাইক্লোন এই আম্পান। আগের সুপার সাইক্লোনটি ছিলো ১৯৯৯ সালের উড়িষ্যা সাইক্লোন। সেই ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৬ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। প্রাণহানীর হিসাবে এটিকে বিশ্ব ইতিহাসের পঞ্চমতম মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। সিডোরের মতো আম্পানের উৎপত্তি বঙ্গোপসাগরের একই এলাকায়, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে।

এই পর্যন্ত আম্পানের গতিপথ বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আম্পান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে উপকূলে আঘাত হানলেও, এর বিস্তৃতি থাকবে বাংলাদেশের হাতিয়া পর্যন্ত। এই ঘুর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশের উপকূলে হতে পারে পাঁচ থেকে দশ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস।    

ঘূর্ণিঝড়ে দুই ধরণের ক্ষতি হয়। একটা হচ্ছে প্রাণহানি। আরেকটা হচ্ছে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশুর ক্ষতি। বাংলাদেশে এখন প্রাণহানির সংখ্যা কমে গেছে। ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোনে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা গেছে। ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায়। প্রায় একই ধরণের ছিলো ২০০৭ সালের সিডর। সেখানে মানুষের মৃত্যু হার তুলনামূলক কম ছিলো। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ৩ হাজার ৪০৬ জন মারা গিয়েছিল।  এরপরে বাংলাদেশে আরো বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। ২০০৯ সালের ২৫শে মে আইলার আঘাতে মারা যায় ১৯০জন। ২০১৩ সালে মহাসেনে মারা যায় ১৮ জন।

অন্যদিকে আম্পানে বাতাসের গতিবেগ বেশি থাকলে বাড়ি-ঘর এবং গাছপালা পড়ে যাবে এবং এতেও ক্ষতি হতে পরিমাণ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালি, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় দূর্গত এলাকাগুলোতে নেয়া হয়েছে আম্পানের পূর্বপ্রস্তুতি। বন্দররগুলোর কাজ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আম্পান প্রস্তুতি 

বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে মাছ শিকার করতে যাওয়া তিন হাজার জেলেকে উপকূলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ঘুর্ণিঝড় আম্পান পরবর্তী জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তাসহ যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিন স্তরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। জরুরি উদ্ধারে প্রস্তুত নৌবাহিনীর ২৫টি জাহাজ। এছাড়া রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে কাপ্তাই নৌঘাটি বানৌজা শহীদ মোয়াজ্জম হতে বোট নিয়োজিত থাকবে।

আঘাত হানার পর ঘূর্ণিঝড় আম্পান হিমালয়ের উচ্চ পর্বতশ্রেণীতে গিয়ে আরো ঘণীভূত হবে। এতে পূর্ব হিমালয় পর্বতমালায় প্রবল বর্ষণের সৃষ্টি করবে। যে কারণে উত্তর-পূর্ব ভারত, ভুটান এবং উত্তর বাংলাদেশ জুড়ে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসেও এমনটাই বলা হচ্ছে।  

এক যুগ আগে সিডর তান্ডব চালিয়েছিলো সুন্দরবনের উপর দিয়ে। যা রক্ষা করেছিলো উপকূলের বিস্তৃত এলাকা। বুলবুলের ক্ষেত্রেও ঢাল হয়েছিলো সুন্দরবন। এবারও এই ঘুর্ণিঝড় বয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের উপর দিয়ে। বারবার আমাদের বাঁচিয়ে দেয়া এই সুন্দরবন নিজেই আমাদের কাছে কতটুক নিরাপদ সেই প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়। আপাতত নিরাপদ থাকুক বাংলাদেশ। কামনা প্রার্থনা এই একটাই।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা